BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

ক্যালাইডোস্কোপ

Bartalipi, বার্তালিপি, ক্যালাইডোস্কোপ

                  ।।২৪।।

 

              আড়ালের কথা

 


ভাইয়া ঘুম থেকে উঠে পড়েন ছ'টা নাগাদ। বিছানায় শুয়ে শুয়ে গাইতে থাকেন কৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম। ছোটবেলা ভাইয়ার পাশে শুয়ে শুনত এই শতনাম। শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল দিপুর। ভাইয়া ওকে একটা শতনামের চটি বইও কিনে দিয়েছিলেন। মা'র জন্য লক্ষ্মীর পাঁচালী, বিপদনাশিনীর পাঁচালী এনে দিয়েছিলেন। একটা ছিল খনার বচন আর দিপুর জন্য গোপাল ভাঁড়ের গল্প, হাঁদাভোদা, বাটুল দি গ্রেট কিনে রাখতেন। একটু বড় হবার পর দিপুর জন্য শুকতারা কিনে রাখতেন। কারণ, দিপুকে গল্পের বই দিলে, সে আর বাইরে বেরোত না।  দিপুকে নিয়ে জন্মলগ্ন থেকেই দাদু্র দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না। মেয়ে বাঁচবে,নাকি নাতি বাঁচবে,-কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেননি সিভিল সার্জন,যিনি নিজে সীজারিয়ান অপারেশন করে দিপুকে পৃথিবীর আলো-হাওয়ায় তুলে এনেছিলেন, মাতৃগর্ভ ছিন্ন করে। সেই দুশ্চিন্তা এখনো কাটেনি। ভাইয়ার শতনাম গাওয়া শুনে, দিপু ফুল বাগানের ভেতর দিয়ে ঢুকে ,ভাইয়ার ঘরের জানালার সামনে দাঁড়ায়। ভাইয়া আমি সারথির বাসায় যাচ্ছি ,-- বলেই ছুট লাগায়। 

             সারথির দরজার পাশে কলিং বেল টিপতে যাবে, তখনই শোনে মাসীমার গলা,--দিপু এসেছিস ? সারথি তো ঘুমে। দিপু বলে, এখন না এলে তো ওকে পাব না। মাসীমার হাতে একটা আঁকশি; সাজি ভরে ফুল তুলছেন বাগান থেকে। দেখো, ঘুম থেকে যদি ওঠাতে পার। আর জিজ্ঞেস করো, ওর কী হয়েছে। ঠিকমতো খায় না। পড়ে না। সারাদিন ঘরেও থাকে না। কোথায় যে যায়, কিছু বলে না। তোমরাও আসো না। মাসীমার গলার স্বরে, অসহায় বেদনার রেশ, দিপুর কাছে গোপন থাকে না। বন্ধু হলে, বন্ধুর সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দের খবর রাখতে হয়,- মাসীমার এই কথাটি দিপুর মর্মে বিঁধে যায়। সব মা-বাবাই কি তবে, ছেলের বন্ধুদের কাছে এরকম প্রত্যাশা রাখেন? সত্যিই তো, দিপু আজ যেমন এসেছে, তেমন করে আগে তো আসেনি! সারথি  বাড়ী নেই শুনে  দিব্যি চলে গেছে। সে কোথায় যায়, কী করে সারাদিন, খবর নেবার আন্তরিক চেষ্টাই ছিল না তার। অপরাধীর মত দাঁড়ায় এসে সারথির বন্ধ দরজার সামনে। কয়েকবার, দরজায় টোকা দেবার পর , সারথি ঘুম জড়ানো চোখে দরজা খুলে দেয়। ওর চোখে তখন অতল ঘুমের সাগর। দরজার মুখে দিপুকে দেখে অবাক হয়ে যায়। আয়, বস। আমি মুখ ধুয়ে আসি। ঘরে ঢুকে দিপু অবাক হয়ে যায়। চারদিকে বই এলোমেলো পড়ে আছে মেঝেতে। বিছানার পায়ের দিকে নোংরা পোশাক। কয়েকটা মেঝেতে বইয়ের স্তুপের উপর। আর এস্ট্রে উপচে পড়া  সিগারেটের পোড়া টুকরো, সমস্ত মেঝেময় এলোমেলো ছুঁড়ে ফেলা পোড়া দেশলাই কাঠি, পোড়া সিগারেটের টুকরো এবং বোঝা যায় যে এই ঘরে অনেক দিন ঝাড়ু পড়েনি, যা আগে হতো না। আর এই ঘরের বাসিন্দা, এক মাস আগের তুলনায় মানসিকভাবে অনেকটাই বদলে গেছে। মেঝেতে উবু হয়ে বসে বইগুলো ঘাঁটছিল। আচমকাই পাশের আলনার কোণে চোখ পড়ে দিপুর; আলনাতেও ডাঁই করে রাখা শার্ট প্যান্টের আড়াল থেকে ঝুলছে হালকা আকাশী রঙের অন্তর্বাস, যা এদিকে দেখা যায় না। যৌনতার বোধ হবার পর অন্তর্বাস বস্তুটা কেন মহিলাদের লাগে এবং কেন সেটা লোকচক্ষুর আড়ালে শুকোতে দেওয়া হয়,সেটা দিপুর বোধবুদ্ধিতে অনুভব করতে পেরেছিল। মা'কেও দেখত, ও ক্লাস ফাইভ-সিক্সে ওঠার পর ব্লাউজের নিচে শুকোতে দিতেন। সেও তখন আলাদা শুতো। মা-বাবার সাথে ছোটবেলার মত ঘুমোতে স্থান সংকুলান হত না। দিপু সারথির উৎসাহে বাইবেল পড়েছিল। সারথি স্কুল জীবন থেকেই, প্রতি রোববার কোর্টের উল্টো দিকে প্রেসবিটারিয়ান চার্চে যায়। চার্চ থেকে ওকে একটা বাইবেল দিয়েছিল,আর জায়গাটা বেশ মনোরম, শান্ত। গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকলেই , মন প্রসন্ন হয়ে যায়। বাইবেলে দিপু পড়েছিল, আদম আর ইভের কাহিনী। জ্ঞানবৃক্ষের ফল খাবার পর কিভাবে তাদের মনে, ভালো-মন্দ বোধের সাথে লজ্জার চেতনাও এসেছিল।নগ্নতার বোধ, লজ্জার চেতনা একদিন দিপুরও এসেছিল। গলার স্বর পাল্টে যাচ্ছে, নাকের নীচে হালকা গোঁফের আভাস, শরীরের কিছু অঙ্গে রোমের আভাস। তখন থেকে সে , বাবার মত, গামছা পরে প্যান্ট বদলাত, স্নানে যেত। মেয়েদের দিকে তাকালে এমন একটা অনুভূতি হত, যা আগে আর কখনো হয়নি। আলনার অন্তর্বাস দেখে অবাক হয় দিপু। কীকরে যেন তার মনে পড়ে যায়, ‘অমৃত’ সাপ্তাহিকের ধারাবাহিক উপন্যাস, ‘সোনার হরিণ চাই’ ; ওতে মিষ্টি নামের একটা মেয়ের চরিত্র ছিল। কল্পনায় সে নিজেও মিষ্টির প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। এই হালকা আকাশী অন্তর্বাস দেখে, কেন তার মিষ্টির  কথা মনে পড়ল ? ইন্দ্রাণী আর শিল্পীর কথা মনে পড়ল। কলেজের সহপাঠী কোনো মেয়ের কথা তো মনে পড়ল না! কলেজে সহপাঠী মেয়েরা এমনিতেই সবার সাথে মেশে না। প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস শুরু হবার আগে ওরা সার বেঁধে ল্যাবের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। স্যার এলে, তবেই ওরা ক্লাসে ঢোকে। এইসব সাতপাঁচ ভাবছে, এমন সময় ঝড়ের গতিতে ঢোকে সারথি। চোখে তার তখনো ঘুমের আবেশ মেঘের মত ভেসে আছে। অনেক রোগা হয়ে গেছে। চোখের চারপাশে শ্রান্তির বাদামী বৃত্ত। চল দিপু,- বলে হাতে দরজার তালাচাবি তুলে নেয়। কোথায় ভেবেছিল, সারথির সাথে একটু আড্ডা দেবে, তার সুলুক-সন্ধান  নেবে, তা আর হল না। মাসীমা পেছন থেকে বললেন, কি রে চা না খেয়ে কোথায় যাচ্ছিস? আমি তো তোদের জন্য চা আর মুড়ি ভাজা করছিলাম। সারথির সংক্ষিপ্ত উত্তর, আসছি। বলেই । - দিপুকে প্রায় টেনে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে, ওপাশের বারান্দায় দাঁড়ানো মাসীমার বেদনার্ত মুখ। রাস্তায় এসেও সারথি নীরব। পকেট থেকে চারমিনারের প্যাকেট বের করে, ফস করে দেশলাই জ্বেলে একটা সিগারেট ধরায়। এটাও একটা অভিনবত্ব। আগে সারথি খুচরো কিনে সিগারেট খেতো। এখন প্যাকেট কিনছে, পকেটে দেশলাই রাখছে। যে-সারথি সারাক্ষণ সাহিত্য থেকে  রাজনীতি, রাজনীতি থেকে সিনেমা, সিনেমা থেকে গান, বিশেষ করে সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস নিয়ে ক্লান্তিহীন ভাবে উদ্দীপ্ত, অনর্গল কথা বলে যায়, বন্ধুরা তার মুগ্ধ শ্রোতা তখন, সারথির বাক-লালিত্যে ; সেই সারথি নিঃশব্দে সিগারেট টেনে নীরবে হাঁটছে। দিপুর কেমন যেন অচেনা লাগছে এই সারথিকে। ছোটমামার গন্ধ শোঁকার ভয়ে সিগারেট খাওয়া শেখা হল না দিপুর। সারথি তো আগে ক্যাপস্টেন খেতো। এখন হঠাৎ করে চারমিনারে চলে এল! চারমিনার  বেশ কড়া। বরাক ব্রিজের তলায় শিবুদার চায়ের দোকান। খুব সকালেই খোলে। বিহারী মজুররা চা আর টোস্ট বিস্কুট খায়। ওরা রাত জেগে জানিগঞ্জে   ট্রাক থেকে মাল নামায়। তারপর এদিকে চলে আসে। চা খেয়ে চলে যায় বরাক নদীর পাড়ে। হাতে থাকে লোটা। প্রাতঃকৃত্য, চান সেরে সোজা ভুঁঞা রোডের ডেরায়। সারথি এখনো নীরব। এক মনে, কিছুটা বা অন্যমনস্ক, বা অন্য কোনো গভীর চিন্তায় সে মগ্ন হয়ে আছে। চা খেয়ে দিপুকে বলে,  চল। কোথায় যাবে না বুঝেই হাঁটা দিল সারথির সাথে। সারথি জাহাজ ঘাটে এসে ঘাসের উপর বসে। দিপুও বসে। ছোটবেলা দেখেছে কত জাহাজ এসে ভিড়ত এখানে। জাহাজের ভোঁ শুনতে খুব ভালো লাগত তার। সারথির নীরবতা ভেঙে জিজ্ঞেস করে, তোর হয়েছেটা কী? দু’তিন বার জিজ্ঞেস করল। সারথি একমনে সিগারেট টানছে। দিপু সারথির কাঁধে হাত রাখে। আর সে ছেলেমানুষের মত কেঁদে ফেলে। দিপু তার পিঠে হাত বুলোতে থাকে। সারথি নীরবে কেঁদে যাচ্ছে। ডানহাতের জ্বলন্ত সিগারেট থেকে উড়ে যাচ্ছে ধোঁয়া। জ্বলে জ্বলে ছাই জমে আছে সিগারেটের ডগায়। চৈত্রে নেমে গেছে বরাকের জল। পরিষ্কার জলের তলায় চিকচক করে বালি। ঝাওয়া পাথরে বাঁধানো পাড়। কান পাতলে শোনা যায়, পাথরে জলের মৃদু স্রোতাঘাতে বেজে উঠছে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। 

    প্রকৃতির নৈঃশব্দ্য ভেঙে, সারথি দুই হাঁটুর উপর থুতনি রেখে বলে, আমি মস্ত পাপ করে ফেলেছি। ( ক্রমশ)