BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

ক্যালাইডোস্কোপ

Bartalipi, বার্তালিপি, ক্যালাইডোস্কোপ

                      ॥ ২২ ॥


                       পর্বান্তর  



টালমাটাল পায়ে চলছে দিনগুলো । পরীক্ষা শেষে , ক্লাসহীন কলেজে কেউ যায় না। ফলে, বন্ধুদের সাথে, রোজ দেখা হবার , ক্লাসের ফাঁকে আড্ডায় মশগুল হবার, উঠল বাই তো চল সিনেমায় যাই,-- সব থেমে গেছে। প্রথম পরীক্ষার অভিঘাতে, যারা মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে, পাঠ্যসূচির বাইরে বই আর একটি অত্যাসন্ন বিপ্লবের স্বপ্নে উড়ছিল, ভালো রেজাল্ট না মন যেদিকে যায় , সেই পথের পথিক হবে, এই দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয়ে, চেন টানা ট্রেনের মত, থমকে দাঁড়িয়ে আছে। সমস্যাটা দিপুরই হয়েছে বেশী । সে তো আর আজন্ম শিলচরে লালিত নয়; তার অতীত পড়ে আছে বদরপুরে। সেখানেও যে তার প্রাণের দোসর ছিল, বাবলুর সাথেও চিঠির সংযোগ ক্ষীণ হয়ে গেছে। বিকেলে স্যারের বাড়ি ট্যুইশন থাকে। দত্ত স্যার কেমন যেন কেঠো স্বভাবের। ফিজিক্স , কেমিস্ট্রি দু'টোই পড়ান, তিনি যদিও মূলতঃ কেমিস্ট্রির অধ্যাপক । মাস ফুরোলেই একটা ডায়েরি খুলে বেতন নিয়ে, নামের পাশে  'পেইড' লিখে রাখেন। রফিক থাকত হোস্টেলে। আর্থিক অবস্থা তেমন স্বচ্ছল নয়। বাড়ি করিমগঞ্জের কোনো এক গ্রামে। পরপর দু'মাস স্যারের বেতন দিতে পারেনি। সেজন্য সে মরমে মরে থাকত, বেতন দেবার দিনে। কারণ, প্রথম দিনই বলে দিয়েছিলেন, কড়ার করে , যে পরের মাসের ঠিক এই তারিখে পঞ্চাশ টাকা যেন বাড়ি থেকে আনতে কেউ ভোলে না। সেদিন দিতে না পারলে , সাতদিন সময় পাবে , স্যারের বেতন দেবার জন্য। সঙ্গে এও বলেছিলেন , দুই সাবজেক্ট পঞ্চাশ টাকায় কেউ পড়াবে না। দু'মাস সাতদিন পর, স্যার রফিককে বলেদিলেন, রফিক, ফ্রম নেক্সট ডে, উইদাউট মানি ডোন্ট কাম। পুরো সময়টা রফিক মাথা নিচু করে লিখে গেল। দিপুর হাতে যদি একশো টাকা থাকত, তবে রফিককে দিয়ে দিত। আর তার তো হাত খরচ বাবদ দৈনিক বরাদ্দ মাত্র দেড় টাকা। রিক্সা ভাড়া আসা যাওয়া এক টাকা, চা- বিস্কুট হয়ে যেতো পঞ্চাশ পয়সায়। সারথির সাইকেলের সামনের রডে বসে চলে এলে বেঁচে যেত এক টাকা। কখনো খিদে পেলে, নূতন পট্টিতে ঢোকার মুখে বড়ুয়ার দোকানে পিঁয়াজি, আলুর চপ বা ঘুগনি খেয়ে নেয়। ঘুগনিটা বড়ুয়া বানায় অতি সুস্বাদু। নারকোলের টুকরো, বাদাম থাকে ওতে। আর বানায় মাংসের ঘুগনি। সেটার দাম বেশী , -বারোআনা । এক প্লেট ঘুগনিতে বরাত জোরে চার-পাঁচ টুকরো মাংস মুখে পড়ে। তবু সন্ধ্যে হলেই এপাড়া ওপাড়া থেকে সবাই ভীড় করে বড়ুয়ার দোকানে। কেউ আসে টিফিন বাটি নিয়ে, বাড়ি নিয়ে যাবে বলে। মহিলারাও আসেন। বড়ুয়ার দোকানে বসে খাবার ব্যবস্থা নেই। আসলে দোকানটি অস্থায়ী; একটি হোলসেল কো-অপারেটিভের বারান্দায়। দিনের বেলা বড়ুয়া কো-অপারেটিভের চাল, ডাল, তেল, চিনি, কেরোসিন মাপে। বিকেলে বন্ধ হয়ে যায় । তখন বড়ুয়া বারান্দায় দোকান খুলে বসে। কো-অপারেটিভের সামান্য বেতনে সংসার চলে না। এই উদ্বৃত্ত আয়টুকু তার না হলেই নয়। বড়ুয়ার কথা শুনে দিপু বুঝতে পারত, ওরা আদতে চিটাগাঙ্গের মানুষ। বদরপুরে  এমন অনেক মানুষ ও দেখেছে। বুদ্ধ কলোনিতেও একজন ড্রাইভার ছিলেন, ও বড়ুয়া কাকু ডাকত। একই রকম ভাষায় কথা বলতেন। বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন, বদরপুরের যত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষ আছেন, সবাই আসেন ওদের কলোনিতে ঢোকার মুখের বৌদ্ধ মন্দিরে। সেই ছোট্টবেলা থেকেই , কিছু না বুঝেই দিপু শিখে গিয়েছিল ক’টা লাইন, ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি। সংঘং শরণং গচ্ছামি। ধম্মং শরণং গচ্ছামি’। আসলে এই ধ্বনি মাধুর্য হয়তো তার শিশুমনকে আকৃষ্ট করত। বদরপুরের সব বড়ুয়া পদবীর লোকেরা ছিল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী । বুদ্ধদেবের শান্ত , সৌম্য মূর্তির সামনে বসে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা ধ্যান করতেন। ঘুগনি বিক্রেতা এই বড়ুয়াও হয়তো বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। কিন্তু শিলচরে তো কোনও বৌদ্ধ মন্দির চোখে পড়েনি। হয়তো এখানে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা কম বলেই বৌদ্ধ মন্দির গড়ে ওঠেনি। তবে তারা বুদ্ধ পূর্ণিমায় প্রার্থনার জন্য কোথায় যায়? সংখ্যায় কমে  গেলে, ভাষা কিম্বা ধর্ম ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। দেশ হারানোর সাথে সাথে চট্টগ্রামের মানুষও বাঙালী অধ্যুষিত এলাকায় এসে, বাংলায় কথা বলে, হিন্দু পূজা-অর্চনায় আংশ নেয়। 

    দত্ত স্যারের বাড়িতেও সারথি যায় না। ওর বাড়ী গিয়েও পায়নি। ওর মা বললেন, ও বাড়ী নেই। সারাদিন কোথায় যে যায়। কিরকম ছন্নছাড়া হয়ে গেছে। নীরবে মাসীমার অভিযোগ মাথা নত করে শোনে দিপু। মাসীমা জানেন, দিপু সারথির বন্ধু। সুতরাং তাকে তাঁর উদ্বেগের কথা গুলো বলাই যায়। মাসীমা চিররুগ্ন মানুষ। প্রচণ্ড হাঁফানিতে ভোগেন এবং অত্যন্ত কৃশকায় বলেই, দীর্ঘাঙ্গী এই রমণী সামান্য বেঁকে হাঁটেন। দিপু স্থির করে, পরদিন খুব সকাল বেলা সারাথির বাড়ী আসবে, যখন সে ঘুম থেকেও ওঠেনা। আর এতদিনে, দাদুর বাড়ীর শাসনও অনেকটা শিথিল হয়ে এসেছে। ইচ্ছেমত বেরোতে হলে খুব একটা অসুবিধে হয় না। নানা ছলছুতোয় সে প্রায়ই বেরিয়ে যায়। প্রথম দিকে ছোটমামা কায়দা করে মুখের গন্ধ নিতেন, খুব কাছে বসে কথা বলতেন। বিশেষ করে বাইরে থেকে ফেরার সময় যদি বাড়ীতে থাকতেন। আসলে, গন্ধ শুঁকে বোঝার চেষ্টা করতেন, ও সিগারেট খেয়েছে কিনা। একদিন সে নিজের কানে শুনেছে, ছোটমামা ওর মাকে বলছেন, না দিদি, দিপু এখনো সিগারেট খেতে শেখেনি। অথচ মায়ের মুখেই শুনেছে, ছোটমামা স্কুলে পড়ার সময়ই সিগারেট খেতে শুরু করেছিলেন। এখন তো দিনে তিন-চার প্যাকেট ক্যাপস্টেন ছাড়া চলে না। সকালে চা খেয়ে সিগারেট ধরিয়ে একটু পায়চারি করে,  দশ-বারো বার উঠবস করে আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে পায়খানায় ঢুকে যান। সিগারেট ছাড়া পেট পরিষ্কার হয় না। সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছে। তখন ছিল খাটা পায়খানা। মেথর রোজ সকালে এসে টিন ভর্তি ময়লা ঘাড়ে করে নিয়ে একটা গাড়িতে ঢালত। রাস্তায় ফোঁটা ফোঁটা ময়লা পড়ে থাকত। সারথির বাড়ী থেকে বেরিয়ে মনটা বিষণ্ণ হয়ে গেল দিপুর। সে কাল সকালেই এসে সারথিকে পাকড়াবে। জিজ্ঞেস করবে, কী হয়েছে তোর ?

    বুদ্ধ সেই যে ‘সময় শরীর হৃদয়’ পড়ে, মজেছিল শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর কবিতায়,  এরপর খুঁজে খুঁজে পড়ত তাঁর কবিতা। মিঠুনের বাবা বিচিত্র মানুষ। একদিকে নক্সাল রাজনীতি করে জেল খেটেছেন, সিনেমা হলের ম্যানেজারের চাকরী করেন, রোজ সকালে মুগুর ভাঁজেন, ধুতি পাঞ্জাবী পরেন, ছ’ফুট দীর্ঘ পেটানো শরীর, ময়লা রঙ, মাথায় ঝাঁকড়া চুল, দেখতে অনেকটা অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত দেখতে, আর বন্ধুত্ব কবিদের সাথে। বিশেষ বন্ধুত্ব শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর সাথে। যত কাগজে শক্তি বাবুর কবিতা ছাপা হয়, একটা কপি তাঁকেও দেন। বুদ্ধ সেই সব নিয়ে আসে। পড়ে আবার ফেরত দেয়। তবে মাঝে মাঝে হতাশ হয়। শক্তি বাবু একই কবিতা দু’তিনটে কাগজে ছাপতে দেন। আবার কখনো কিছু তিন-চার লাইনের কয়েকটা কবিতা পারমুটেশন কম্বিনেশন করে ছেপে দেন। বুদ্ধর ক্ষোভ হয়। এতে তো পাঠকের ক্ষতি হয়। রবীন্দ্রনাথের বাইরেও যে একটা অন্যরকম কবিতার ভুবন আছে, বুদ্ধ তার সন্ধান পেলো শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর কবিতা পড়ে। তাঁর কবিতা আর ফুল,--বুদ্ধকে নিশিডাকের মত নিয়ে আসে পাব্লিক স্কুল রোডের এই বাড়ীতে। কিন্তু ফুল,--সেও কবিতার মত রহস্য হয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে। সামনেই তার ম্যাট্রিক পরীক্ষা। বুদ্ধ অংকে খুব দক্ষ, কথাটা চাউর করে দেয় মিঠুন। ফুল আবার অংকে দুর্বল। ও বলে অঙ্ক-অংক গন্ধে নাকি বমি আসে ওর। তারপরই খিলখিলিয়ে হাসতে থাকে। হাসলে ওর গজদন্ত দেখা যায়। মিঠুনের বাবাই বললেন, বুদ্ধ মেয়েটাকে কটা দিন অংকটা একটু দেখিয়ে দেবে ? অন্তত পাশটা করুক। বুদ্ধর বুকে দুন্দুভি বেজে ওঠে। কিন্তু ফুল যা খামখেয়ালি মেয়ে, ও কি শুনবে বুদ্ধর কথা ? তাছাড়া, ছাত্র পড়ানোর অভিজ্ঞতাও নেই ওর। সে কি পারবে ? একদিকে নিজের যোগ্যতা নিয়ে তুমুল সংশয়, অন্যদিকে নিয়মিত ফুলের সান্নিধ্যের ইসারা, এই দুইয়ের মধ্যে পেন্ডুলামের দুলছিল তার মন। এই দোদুল্যমানতার মধ্যেই সেই রাতে বাড়ী ফেরে বুদ্ধ।  ( ক্রমশ)