BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

ক্যালাইডোস্কোপ

Bartalipi, বার্তালিপি, ক্যালাইডোস্কোপ

                   ॥ ২১ ॥ 

            কয়েকটি স্বপ্নের দিন

কাকুরা চলে গেলেন । কলকাতা একদিন কাটিয়ে , পরদিন আমেরিকার প্লেন ধরবেন। সারথি কুম্ভীরগ্রাম গেল ওদের সাথে। আবার হয়তো তিন-চার বছর পর আসবেন। তখন মিসমি হয়তো আসবে না। তার কলেজের ছুটি এবং কাকুর আসার অবকাশ , দুই যদি মিলে যায় , তবেই মিসমির আসার সম্ভাবনা থাকবে । না হলে কাকু - কাকী আসবেন। বয়ঃসন্ধির পর এই প্রথম মিসমির সাথে সারথির দেখা হল। শেষবার মিসমি যখন এসেছিল, সারথি ছিল ফাইভের ছাত্র। মিসমি বয়স ওর তিন বছরের বড়। তখন ওর মধ্যে একটা দিদিগিরির ভাব ছিল। সারথিকে খুব একটা পাত্তা দিত না; এখন যেরকম বন্ধুর মত সম্পর্ক হয়ে গেছে, তখন সেরকম ছিল ন‍া। এখন কেউ ওদের দেখলে ভাববে,ওরা  খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু । রাতের খাবার মিসমি আটটার মধ্যে সেরে নেয়। এটা ওর অভ্যেস। বাধ্য হয়ে সারথিকেও খেতে বসতে হত মিসমির সাথে। খাবার পর মিসমি হাঁটতে বেরোয়। এটাও একটা অভ্যাস। রাতের হাঁটায় স‍ারথির অসুবিধে নেই। বরং এটা তার কাছে ভীষণ উপভোগ্য। জাহাজ গুদামের সামনে যে জাহাজ ভিড়ত এসে, ছোটবেলার সেই স্মৃতি মিসমি ভোলেনি। এখন আর জাহাজ আসে না। ফিরে যাবার আগের রাতটা পূর্ণিমা না হলেও, আকাশে চাঁদ ছিল। বসন্তের ফুরফুরে বাতাস ভেসে আসছে বরাকের বুক বেয়ে। মিসমির গায়ে সেই চিরাচরিত টি-শার্ট আর হালকা রঙ চটা জিন্স। ওর পাশ দিয়ে হাঁটলে বা পাশে দাঁড়ালে, একটা সুবাস পাওয়া যায়। অনাত্মীয় কোনো মেয়ের পাশে, এত কাছে এসে দাঁড়ায়নি বা পাশাপাশি হাঁটেওনি সারথি, এর আগে কোনোদিন। এই সুবাস কোনো পারফিউমের নয়। মিসমি স্নো-পাউডার-পারফিউম মাখে না কখনো। মৃগনাভির গন্ধের কথা শুনেছে। বইয়ে পড়েছে। ঘাই হরিণীর কথাও পড়ছে কবিতায়। সেসব তো পড়েনি মিসমি। সে বাংলা পড়তেই জানে না। তার মুখের কথায় অবাঙালিদের মত একটা টান থাকে। ইংরেজি বললে, বুঝতে পারে ; এটা হলিউড সিনেমা দেখার ফলে হয়েছে। প্রথম দিকে সে একশন দেখার জন্য হলিউড সিনেমা দেখতে যেতো। কাউবয় সিনেমা সেজন্য তার প্রিয় ছিল। কাকু তার ইংরেজি গানের প্রীতির কথা জেনে, প্রায়ই নতুন কারো এ্যালবাম বেরোলে, আমেরিকা থেকে পাঠাতেন। ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের এ্যালবামও পাঠাতেন। সঙ্গে থাকত দীর্ঘ চিঠি; তাতে সিম্ফনি,সোনাটার ফারাক, বাখ-মোজার্ট- বিঠোভেন-এর সঙ্গীত সম্পর্কে বিস্তৃত নোট থাকত। কান্ট্রি মিউজিকের একটা এ্যালবাম পাঠিয়ে জানতে চেয়েছিলেন, কেমন লাগল জানাতে। সারথি ডাকঘর থেকে এক সাথে অনেকগুলো এরোগ্রাম কিনে রাখত। কাকুর চিঠি এলেই, সঙ্গে সঙ্গে উত্তর পাঠাত। আর এখন তো কাকুই বাড়ীতে টেলিফোন বসিয়ে দিয়েছেন। ফোন কাকুই করেন। মিসমি অবশ্য হাই- হ্যালো ছাড়া কারো সাথেই খুব একটা কথা বলত না। এ বাড়ীতে সবাই ওকে ভাবত অহংকারী মেয়ে। এখন সারথি বোঝে , ছোটবেলার সেই মিসমি এদেশে এসে পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে পারত না, যাকে বলে কালচার‍্যাল গ্যাপ।


          হাঁটতে হাঁটতে ওরা বি সি গুপ্ত রোড হয়ে নেমে যায় নদীর দিকে। এরকম রাতে সচরাচর কেউ নদীর দিকে যায় না। তবে সারথির বাড়ীর সাথে বৈকুণ্ঠ গুপ্তর বাড়ীর সম্পর্ক সেই সিলেট থেকে। ওখানে একটি গাছের তলায় ওরা দাঁড়ায়। চাঁদের আলোয় চিকচিক করছে বরাকের জল। আবছায়ার মত দেখা যাচ্ছে, ওপারে গাছপালা, বাড়ীতে জ্বলছে আলো। বহুদূরে একটা নৌকা ভেসে যাচ্ছে। তার গলুইয়ে জ্বলছে লন্ঠন। আর ভেসে যাচ্ছে বাঁশ। এটা দেখে মিসমি খুব অবাক হয়। কারণ, অনেক গুলো বাঁশকে একত্রে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে নদীর স্রোতে বেয়ে। দুটো লোক আবার এর উপর রান্না করছে। এমন দৃশ্য মিসমি কোনো সিনেমাতেও দেখেনি। ওর চোখেমুখে বিস্ময়, আর কত প্রশ্ন ; কেন এমন করে লোক দুটো যাচ্ছে, ওরা কি নৌকায় যেতে পারে না, ওদের কি ভয়-ডর নেই ? যদি ডুবে যায় মাঝ নদীতে ? সারথি বুঝিয়ে দেয়। একে বলে বাঁশের বোঙ্গা। ইজ ইট এ টাইপ অফ বোট ? বিক্রির জন্য বাঁশ এভাবে নিয়ে যাওয়াটা তার কল্পনাতীত। সে আফসোস করে, এমন একটা দৃশ্য ক্যামেরা-বন্দী করা গেল না বলে। দেশে ফিরে বন্ধুদের দেখাতে পারত। সে এই দৃশ্যটি চিরকালের মত তার মনের মধ্যে এঁকে রাখে। সারথি ওকে বলে, সব দৃশ্য যে সবাইকে দেখাতে হবে, এর তো কোনো মানে নেই। কিছু ছবি, কিছু অনুভূতি শুধু নিজের জন্য গোপনে মনের ভিতরে রেখে দিতে হয়। মিসমি বলে, সে এগেইন। আই কান্ট গেট ইউ। সারথিকে কথাগুলো ইংরেজি তর্জমা করে বলে দিতে হয়। কি বুঝল কে জানে। সারথি দেখে, ওর মুখে রহস্যময় হাসি । এমন আবছা চাঁদের আলোয়, এমনিতেই তো চারপাশের অনেক কিছুই রহস্যময় মনে হয়। সেখানে ছিপছিপে গড়নের এই মেয়েটিকে, যে কিনা তার হলিউডি সিনেমায় দেখা, স্বপ্নের নারীদের মত দেখতে অনেকটা,  তার হাসি, তার চাউনি, তার গ্রীবা ও কন্ঠার হাড় ছুঁয়ে ভেসে ওঠা তিল, তার পাশে দাঁড়ালে, ভেসে আসা  মৃগনাভি গন্ধ, যা বিবশ করে স্নায়ু ও চেতনা, আর ডুবে যেতে চায় আলো-অন্ধকারে, আর ডুবে যেতে যেতে , একসময় , অজস্র রঙিন আলোর ফুটকি। আর তখনই একটা হাত খড়কুটোর মতো আরেকটা হাতকে আঁকড়ে ধরে ভেসে উঠতে চায়। মিসমির ক্ষীণ, সরু লম্বাটে হাতটা কী উষ্ণ! সাক্ষী রইল চাঁদ আর নদী। আর ওদের পাশের প্রাচীন শিমূল গাছটা, যাতে সদ্য কুঁড়ি এসেছে। এই কুঁড়ি যখন ফুটে উঠবে, মিসমি তখন আমেরিকা চলে গেছে। এখন ওখানে স্প্রিং । নানা রকম ফুল ফুটবে। মিসমি সেসব ফুলের ছবি পাঠাবে। শিমূল গাছের মগডালে বসা একটা প্যাঁচা কর্কশ ভাবে ডেকে উঠল। ভয়ে আঁতকে ওঠে মিসমি। নদীর ওপারের জেগে থাকা গাছপালা দেখল, দুটি ছায়া একসাথে মিশে গেল গাছের আড়ালে। 

    ভাড়া করা এম্বেসেডারের পেছনের আসনে কাকিমা আর মিসমির পাশে সারথি। কাকু অনবরত কথা বলে যাচ্ছেন। সারথিকে পড়তে হবে মন দিয়ে। ভালো রেজাল্ট করতে হবে। কাকু ওকে নিয়ে যাবেন আমেরিকা। কিন্তু সেসব কিছুই ওর কানে ঢুকলেও, মনে ঢুকছে না। কাকিমাও সারথিকে খুব স্নেহ করেন। জন্মের পর , কাকিমাই ওকে কোলেপিঠে করে যত্ন করতেন। সারথির মা ওর জন্মের পর দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। ওকে চান করানো, খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো, সবই করছেন কাকিমা। মিসমি তখন ওকে কোলে নেবার জন্য বসে থাকত। সেসব সারথির মনে থাকার কথা নয়। ওই বয়সের স্মৃতি কারোরই থাকেনা। তবু সবার মুখে শুনে শুনে, ওর মনে হত, যেন সবই তার দেখা। এর কয়েক বছরের মধ্যে কাকু চলে গেলেন আমেরিকা। বিশ্ব ব্যাঙ্কের চাকরী পেয়ে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক থেকে বিশ্ব ব্যাঙ্ক, এই যাত্রাপথ, তখন এই ছোট্ট শহরে আলোড়ন তুলেছিল। কাকুর বন্ধুরা অভয় চরণ পাঠশালায় কাকুকে সম্বর্ধনা দিল। চা বাগানের ভেতরে ভেতরে সরু রাস্তা বেয়ে, গাড়ী চলছে কুম্ভিরগ্রাম এয়ারপোর্টের দিকে। আর তো মাত্র সামান্য কয়েকটি পল মাত্র। মিসমি সারাটা পথ ধরে রেখেছে, সারথির হাত। যেন একজনের শরীর থেকে রক্ত সঞ্চালিত হয়ে আরেকজনের শরীরে বাহিত হয়ে যাচ্ছে, আবার ফিরে যাচ্ছে। ওদের হাতের তালু তাই ঘেমে গেছে। বাম হাতে গাড়ীর দরজা খোলে সারথি। কাকু-কাকিমা নেমে গেছেন। ওদের যেন নামার কোনো তাড়া নেই। ড্রাইভার ল্যাগেজ তুলে নিয়ে যাচ্ছে। মিসমি সারথির হাত ধরে এগোতে থাকে ডিপার্চার লাউঞ্জের দিকে। সারথি কাকু-কাকিমাকে প্রণাম করে। কাকিমা মজা করে বলেন, এবার তোর দিদিকে প্রণাম কর। মিসমি যেন ঘন মেঘের মত হয়ে গেছে, যা শুধু সারথিরই চোখে পড়ছে। মিসমি শেষবারের মত এগিয়ে এসে, সারথিকে জড়িয়ে ধরে। এরকম দৃশ্যে যারা অভ্যস্থ নয়, তারা অবাক চোখে দেখছে। ওদের দেশের স্বাভাবিক সহবৎ যাকে বলে হাগ করা। কাকিমা হেসে বললেন, এবার দেখছি, দিদি আর ভাইয়ে খুব মিল হয়েছে। হাগ করার সময়, মিসমি কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে ফিসফিস করে বলে, ভালো থাকিস। ওরা দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। কিন্ত মিসমির অস্তিত্ব যেন তার অস্তিত্বে মিশে গেছে। হাতের চেটো তখনো ঘামে ভেজা। ঘামটা মুখে মুছে নেয়। ফের পায় সেই সুবাস, হাতের চেটোয়, যা ক্রমেই উন্মনা করে। কাকু ফেরার জন্যও রিজার্ভ করেছিলেন গাড়ীটা। কালো এম্বেসেডারের পেছনের আসনে বসে এলিয়ে দেয় গা।  

    দীপ বিকেলে এসে সারথিকে পায় না বাড়ীতে। সারথি ছাড়া তার তেমন বন্ধু কেউ নেই। অনেক দিন পর সে ডিসট্রিক্ট লাইব্রেরী যায়। কিন্তু মন বসে না পড়ায়। সাড়ে ছটা নাগাদ বেরিয়ে যায়, লাইব্রেরী থেকে। ফাল্গুনের ষোল তারিখ আজ। দুপুরে আসন্ন চৈত্রের বার্তা দিচ্ছে বাতাস। তখন হু হু করে ওঠে বুকের ভিতর। মনে পড়ে, এল টু সিক্সটি সেভেন বি কোয়ার্টারে একা একা কি করছেন মা।  ( ক্রমশ )