BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Sunday, 28 Feb 2021  রবিবার, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

ক্যালাইডোস্কোপ

Bartalipi, বার্তালিপি, ক্যালাইডোস্কোপ

                       ।।২০।।

                      একটি দিন


পরীক্ষার পর একটি সপ্তাহ বদরপুরে কাটিয়ে এল দিপু। এই প্রথম টের পায়,বদরপুরে থাকতে তার ভালো লাগে না। বাবা চলে যান ডিউটিতে। একবার ট্রেন নিয়ে গেলে ফিরতে চার-পাঁচ দিন। ফেরার একদিন পরই আবার পাঁচ দিনের যাত্রা। দিনগুলো একা কাটে মায়ের। একা নিজের জন্য রান্না করেন না। আলু বা ডিম সেদ্ধ করে নেন।  কোনো কোনো রাতে চিড়ে ধুয়ে তেল, নুন, আদা কুচি দিয়ে মেখে খেয়ে নেন। দিপু কড়া নেড়ে ডাকে, মা। মা'র হাসিমুখটা বুকের ভিতরে  একটা ক্যামেরা ছবি তুলে রাখে। সে আসে সকালের ট্রেনে। ন'টায় পৌঁছে যায়। কয়লার ইঞ্জিন থেকে ভেসে আসা কয়লার কুঁচি কখনো চোখে ঢুকে যায়। ভীষণ যন্ত্রণা হয় তখন। চোখ কচলে নিলে তো আরো যন্ত্রণা বেড়ে যায়। হয় চোখে জল ছিটে দিতে হয়, নয়তো সহযাত্রী কেউ চোখে ফুঁ দিলে, বেরিয়ে যায় কয়লার   কুঁচি। দিপু তাই ইঞ্জিনের মুখ যেদিকে থাকে, তার উল্টো সীটে বসে। ট্রেনে তো সকলেই জানালার পাশের আসনেই বসতে চায়। কিন্তু জানালা তো মাত্র দুটো। বাকী দুটো আসা-যাওয়ার পথের পাশে। এই সব ট্রেনে ভীড় হয় খুব। শিলচর থেকে ট্রেন যত এগোতে থাকে, প্রতিটি স্টেশনে হুড়মুড় করে লোক ওঠে। কম্পার্টমেন্টে আসা-যাওয়ার পথটা ভরে যায়। ওদিকের জানালাটাও ঢেকে যায়। টি টি পারতপক্ষে আসে না। বেশ কিছু লোক বিনা  টিকিটের যাত্রী। হঠাৎ কখনো বিশেষ টিম আসে। প্রতি কম্পার্টমেন্টে হানা দিয়ে, বিনা টিকিটের যাত্রীদের জরিমানা করে। নিত্যদিনের অফিস যাত্রীরা টিকিট কাটে। জরুরী অবস্থার সময় কিন্তু সকলেই টিকিট কাটত। ট্রেন ঘড়ির কাঁটা মেনে চলত। এখন কেউ কেউ বলে, জরুরী অবস্থাই ঠিক ছিল। ভারতীয়রা রাজা-প্রজা পরম্পরায় মজ্জাগত ভাবে অভ্যস্থ বলেই বোধহয় সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রশক্তির প্রতি অবনত থাকতে , অনুগত থাকতে পছন্দ করে। 

সাতদিন সে একা একা ফেলে যাওয়া স্মৃতিগুলো কুড়িয়ে বেরিয়েছে। খুঁজে খুঁজে স্কুলের সহপাঠীদের বের করেছে। হিল কলোনি, ওয়্যারলেস কলোনি, কালীবাড়ি চত্বর ঘুরে বেরিয়েছে। স্কুল জীবনের শেষভাগে, বাবলুর সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল সবচেয়ে গাঢ়। বাবলু এখন গৌহাটি। ওর বাবাও বদলি হয়ে মালিগাও চলে গেছেন। স্কুলটা দেখতে গিয়ে কেমন যেন পরপর মনে হল। স্কুল থেকে ফেরার পথে বাবলুদের বাংলোর পথে নেমে গেল। ওদের পাড়ায় একটি মেয়ে ছিল, ইন্দ্রাণী, ওদের সহপাঠী। সবচেয়ে সুন্দরী, ওদের ক্লাসে। দেখলেই সেই বয়সে বুকে ঢেউ উঠত। বারবার আড় চোখে ইন্দ্রাণীদের বাড়ির দিকে তাকাচ্ছিল। যদি একবার দেখা যায়। দুপুরে ঘরে ফিরে দেখে বাবা এসেছেন। মা বাজার করে এনেছেন। পাঁঠার মাংস, মাগুর মাছের ঝোল। দেখতে দেখতে কেটে গেল সাতদিন। ট্যুইশন শুরু হয়ে যাবে স্যারের। দুপুরের ট্রেনে ফিরল । মা ট্রেনে তুলে দিতে এলেন। এই প্রথম সে মাকে একা রেখে চলে যাচ্ছে, ট্রেনে করে। জানালা দিয়ে দেখে, মা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছেন, যতক্ষণ দেখা যায় ট্রেন। মনটা খারাপ হয়ে গেল। নিজেকে স্বার্থপর লাগছিল। সেই মন খারাপ কেটে গেছে কখন যে টেরই পায়নি। এই ট্রেনটা ধর্ম নগর থেকে আসে। সব স্টেশনে দাঁড়ায় না। শিলচর এসে গেল। বিকেল হয়ে গেছে। স্টেশন থেকে বেরিয়ে, সে দাদুর বাড়ি যায়নি। এই স্বাধীনতাগুলো স্কুল জীবনে তার ছিল না। সে সেন্ট্রাল রোড হয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রেমতলা চলে আসে। এখানে মতিলাল বলে একটা দোকান আছে। ওর ক্লাসের কেউ কেউ আসে। সারথি ওকে নিয়ে একদিন এসেছিল চা খেতে। মহিমালয় বলে আরেকটা চায়ের দোকান আছে। ওটা নাকি বড় বড় কবি-সাহিত্যিকদের আড্ডাখানা। কলেজের অধ্যাপকরাও আসেন। তাই ঢোকার সাহস হয়নি। সে প্রেমতলার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। একা। 

সারথির কাকু খুব আমোদপ্রিয় মানুষ। সারাদিন জমিয়ে রেখেছেন বাড়িখানা। এই একটামাত্র মানুষের জন্য এত বড় নিঝুম বাড়িটা আনন্দে ঝলমল করছে। সারথির দিদির নাম মিনি। ওদেশেই জন্ম থেকে আছে বলে, ওর বাংলা উচ্চারণ একটু কানে লাগে। কাকু তাঁর বন্ধুদের ডেকে এনে মজলিশ বসাচ্ছেন। কৃতি মানুষের সঙ্গে আড্ডা দিতে সকলেই পছন্দ করে। কাকু ভালো শাস্ত্রীয় সঙ্গীত গাইতে পারেন। একদিন তাঁর পুরনো দিনের গায়ক বন্ধুদের ডেকে বসালেন গানের আসর। মিনি এই গানগুলো পছন্দ করে না। ঘুম থেকে ওঠার পর, ওর সারাদিন কেটে যায় সারথির ঘরে। মিনি ভীষণ ফর্সা। ছিপছিপে গড়ন। জিনস আর টি শার্ট ছাড়া অন্য কোনও পোশাক সে পরতে চায় না। সারথির তক্তপোষে দু'জন দু'মাথায় বালিশ মাথায় দিয়ে, আধশোয়া হয়ে সারাদিন আড্ডা দিয়ে কাটায়। সারথি স্কুল জীবন থেকেই, হলিউড সিনেমা দেখে। কাউবয় সিনেমা তার খুব প্রিয় । ক্লিন্ট ইস্টউড তার প্রিয় নায়ক। এরমধ্যেই সে দেখে ফেলেছে দ্য গুড, দ্য ব্যাড অ্যান্ড দ্য আগলি। মিনি দারুণ উত্তেজিত। তারও প্রিয় নায়ক ক্লিন্ট ইস্টউড। দেখা গেল এলভিস প্রেসলি ওদের দুজনেরই প্রিয়। কাকু নিজে সঙ্গীত প্রিয় মানুষ। তাই যা নতুন রেকর্ড বেরোয় তিনি পার্সেল করে সারথির জন্য পাঠিয়ে দেন আমেরিকা থেকে। সেজন্য তিনি একটি রেকর্ড প্লেয়ার এনেছিলেন শিলচরের বাড়ির জন্য। বিকেল হলেই মিনিকে নিয়ে ঘুরতে যেতে হয়। আজ ঠিক হল, ওরা কিছুটা পথ রিকশা করে ঘুরে, নতুন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ দেখতে যাবে। রাঙ্গিরখাড়ি থেকে অটোরিকশা নেবে। প্রেমতলায় সাধনা ঔষধালয়ের সামনে থাকতেই দেখতে পায়, দিপু একা দাঁড়িয়ে আছে। তার একটু খারাপ লাগে। কিন্তু মিনির সাথে এই মুহূর্তগুলোতে সে কাউকে ভাগ দিতে চায় না।স্বার্থপরেরে মত মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়। মাহিমালয়ের সমানে আসতেই দেখে, মিঠুন আর বুদ্ধ আসছে । এবারও সে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। যদিও ওদের সাথে তেমন ঘনিষ্ঠতা নেই। তবু, সে গোপন করতে চায় , আজ বিকেলের ভ্রমণ। 

বুদ্ধর আজকের দিনটি স্মরণীয়।মিঠুনের বাড়িতে সকালে গিয়েছিল। গল্প করতে করতে দুপুর গড়িয়ে গেল। মিঠুনের মা বললেন, দুপুরে খেয়ে যাও।অপ্রত্যাশিত এই আমন্ত্রণে সে পুলকিত হয়ে ওঠে। তার মনপ্রাণ জুড়ে দেবব্রত বিশ্বাস গাইতে থাকেন ‘ গায়ে আমার পুলক লাগে, চোখে ঘনায় ঘোর’। রবীন্দ্রনাথ যেন তার এই দিনটির জন্যই গানটি রাচনা করেছিলেন। ফুলও এসে বলল, খেয়ে যাও না। মুখ ভেংচে বলে বেশী দেমাক। 

বিকেলে চা খাবার জন্য বুদ্ধ আর মিঠুন পাব্লিক স্কুল রোড থেকে হাঁটতে হাঁটতে চলে এল প্রেমতলা। বুদ্ধ এখানে আগে এসেছে। তাই মিঠুনকে  নিয়ে সে ঢুকে পড়ে মতিলাল-এ। তার সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে রোমাঞ্চ ছেয়ে আছে মেঘের মত। 

একাকী দিপু, সেই বিকেলে, বুদ্ধ ও মিঠুনকে দেখে, একটু আগে সারথিকেও রিকশা করে যেতে দেখে। শুধু কেউই তাকে দেখছে না। প্রবল অভিমানে, সে আকাশের দিকে তাকায়। একটা পাখি উড়ে গেল। আর পাখিটাকে দৃষ্টিপথে অনুসরণ করতে গিয়ে, আবিষ্কার করে, প্রেমতলা থেকে বড়াইল পাহাড় দেখা যায়। তার ইচ্ছে করছিল, পথের সকলকে ডেকে ডেকে বলে, ওই দেখুন বড়াইল পাহাড়।( ক্রমশ)