BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Sunday, 28 Feb 2021  রবিবার, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

পেট্রোপণ্যের আকাশছোঁয়া মূল্য ও সরকারি শুল্কনীতি

Bartalipi, বার্তালিপি, পেট্রোপণ্যের আকাশছোঁয়া মূল্য ও সরকারি শুল্কনীতি

রাহুল রায়


শিলচর পেট্রোল পাম্পের মিটারে লিটার প্রতি পেট্রোলের দাম ‘নার্ভাস ৯০’ স্পর্শ করার পথে । এই দৃশ্য নতুন বা অভিনব নয়। বিগত কয়েক মাস থেকেই সে আশির ঘরে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে । দেশজুড়েই সে প্রতিদিন নিত্য নতুন মাইল ফলক তৈরি করছে । রাজস্থানে কয়েকদিন আগেই সে একবার শতরান করে এসেছে । করোনা পর্বে সরকারি তহবিলের খরা কাটাতে পেট্রোপণ্যের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করার পর থেকে মিটার আর পেছনে ফিরে দেখে নি । সে প্রায় অবিরত ভাবে শুধু উর্ধ্বগামীই হয়েছে । মধ্যে মধ্যে থমকে দাঁড়ালেও তার উর্ধ্বগামীর ধারাবাহিকতা মোটের ওপর বজায় রাখতে পেরেছে । তার গতি দেশবাসীর মাথায় চিন্তার ভাঁজ ফেলছে । কারণ পেট্রোপণ্যের সঙ্গে যে শুধু গাড়ি বা দ্বি-চক্রযান ব্যবহারকারীর সম্পর্ক থাকে তা কিন্ত নয়, পেট্রোপণ্যের মূল্যের সঙ্গে দেশের প্রতিটি মানুষের স্বার্থ জড়িয়ে থাকে । পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি মানে গাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি । স্বাভাবিক ভাবেই সেই বর্ধিত ভাড়া যারা নিজের গাড়ি বা বাইক চালান না তাদের ঘাড়েই এসে পড়ছে । এখানেই শেষ নয়, পেট্রোপণ্যের দাম বাড়লে নিত্য ব্যবহৃত জিনিষের পরিবহন খরচও বাড়ছে । সেই বর্ধিত পরিবহন খরচের ভার কিন্তু ধনী গরিব নির্বিশেষে সবার ওপর এসে পড়ছে । সংক্ষেপে বললে পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে মূদ্রাস্ফীতির সম্পর্ক নিবিড় । পেট্রোপণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষের দাম বাড়ছে অথচ আয় থেকে যাচ্ছে একই জায়গায় । নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষের নীচে তার আয়ের যে অংশ আগে ব্যবহৃত হতো এখন তার থেকে অনেকটাই বেশি ব্যবহার হচ্ছে, স্বাভাবিক ভাবেই বাজারের অন্যান্য সামগ্রী কেনার জন্য তার ক্রয় ক্ষমতা কমে আসছে । মানুষের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পেলে স্বাভাবিক ভাবেই বাজারে বিক্রি কমে যায় অর্থাৎ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন ব্যবসায়ীরা । পেট্রোপণ্যের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে প্রতিটি মানুষের স্বার্থ। তাই সেখানে বর্ধিত পেট্রোপণ্যের মূল্য মানে বিলাসী গাড়ী চালকের মাথাব্যথা ধরে নেওয়াটা নিখাদ বোকামী ভিন্ন আর কিছুই না ।
এদিকে পেট্রোপণ্য তথা প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের পক্ষে থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান জানুয়ারী মাসের ১৯ তারিখ দেশবাসীকে অভয় দান করার উদ্দেশ্যে বলেছেন যে এই দর স্থায়ী হবে না । তাঁর কথায় সৌদি আরবে তেলের উৎপাদন স্বাভাবিক হলেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দর কমবে । ভারত যেহেতু তার প্রয়োজনের প্রায় ৮৫ শতাংশ তেলই আমদানী করে, তাই স্বাভাবিক ভাবেই অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক দর কমলে তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ভারতেও তখন তেলের দর কমবে । মন্ত্রী মহোদয় সুন্দর ভাবেই অর্থনীতির একটি অতি পরিচিত যোগান ও মূল্যের সম্পর্ক তুলে ধরে আগামী দিনে পেট্রোপণ্যের দাম কমে আসবে বলে মন্তব্য করেছেন । কিন্তু বাস্তব পরিচিত্রটা কি এরকমই ? মন্ত্রী মহাশয়ের কথায় সাধারণ মানুষ কি নিশ্চিন্ত হতে পারেন ? আমাদের দেশের পেট্রোপণ্যের মূল্য কি শুধু আন্তর্জাতিক মূল্যের ওপরই নির্ভরশীল ? প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয় ভারতে গ্রাহকরা পেট্রোলের যে দাম দেন তার মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশই আন্তর্জাতিক দরের ওপর নির্ভর করে । প্রদেয় মূল্যের অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ পেট্রোলের ক্ষেত্রে ৬৩ শতাংশ ও ডিজেলের ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশই আমাদের দেশের সরকারের নির্ধারিত নীতির ওপর নির্ভর করে । এই ব্যাপারে ধারণা পরিষ্কার রাখতে তেলের দাম কীভাবে নির্ধারিত সেটা জানা দরকারি । বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত পেট্রোলের দাম প্রতি ব্যারল ৫০ ডলার । ভারতে আসার পর প্রক্রিয়াজাত হওয়ার পর প্রতি লিটারের দাম হয় ৩০.৬ টাকা । এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে কেন্দ্রীয় শুল্কের ৩২.৯৮ টাকা, রাজ্যিক শুক্লের ১৯.৯৯ টাকা , ৩.৬৭ টাকা যাচ্ছে ডিলারের হাতে । একজন গ্রাহকের প্রতি লিটার পেট্রোলের জন্য গুনতে হচ্ছে ৮৯ টাকা । এবার একটু পিছিয়ে যাওয়া যাক । ২০১৯ সনের শুরুতে প্রতি লিটার পেট্রোলের ওপর কেন্দ্র সরকার শুল্ক ১৯.৯৮ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৩২.৯৮ টাকা করে দেয় , রাজ্য সরকার তা নিয়ে যায় ১১.৯ টাকা থেকে ১৯.৯ টাকায় । ডিজেলের ক্ষেত্রে আগে যেখানে কেন্দ্রীয় শুল্ক ছিল ৪.৫৮ টাকা , পরে তা হয়ে যায় ৩১.৮৩ টাকা। রাজ্যিক শুল্ক আগে ছিল ৬.৬২ টাকা, পরে তা ১১.২২ টাকা হয় । শতাংশের হিসাবে বললে পেট্রোলের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় শুল্ক ২১৭.৪২ শতাংশ ও রাজ্যিক শুল্ক সেখানে ৬৭.৩৯ শতাংশ বাড়ানো হয় । ডিজেলের ক্ষেত্রে পূর্বতন সরকার ধার্য দর থেকে কেন্দ্রীয় শুল্ক ৬০৭ শতাংশ ও রাজ্যিক শুল্ক ৬৯.৭৪ শতাংশ বাড়ানো হয় । স্বাভাবিক ভাবেই এই সুবিশাল বৃদ্ধির সম্পূর্ণ চাপ গ্রাহকদের ঘাড়ে চাপানো হয়েছে ।
প্রশ্ন দাঁড়ায় সরকার যদি শুল্ক বৃদ্ধি না করতো তাহলে আজ দেশে পেট্রোপণ্যের দাম কত হতো । প্রক্রিয়াজাত প্রতি লিটার পেট্রোলের দাম আজকের দরে অর্থাৎ ৩০.৬ টাকা ধরে পূর্বতন সরকার আরোপিত লিটার প্রতি কেন্দ্রীয় শুল্ক ১৯.৯৮ টাকা , রাজ্যিক শুল্ক ১১.৯ টাকা ও ডিলারের বরাদ্দ ৩.৬৭ টাকা যোগ করলে হাতে আসছে ৬৬ টাকার থেকে কিছু বেশি । সোজা কথায় বর্তমান সরকারের আর্থিক নীতির জন্য প্রতি লিটার তেলে ভারতবাসীকে ৩০ টাকার বেশি গুনতে হচ্ছে । এখন হয়তো অনেকেই বলবেন যে সরকার দেশের স্বার্থেই তো এই টাকা নিচ্ছে । দেশের স্বার্থে ত্যাগ করতেই হয় । গত কয়েক বছরে ভারতে পেট্রোপণ্যের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যদি কিছু বেড়ে থাকে তা হল ‘দেশদ্রোহী’ শব্দের ব্যবহার । যত্রতত্র এই অত্যন্ত অপমানজনক শব্দের ব্যবহার হচ্ছে । সরকারী নীতির বিরোধিতা করা মানেই অনেকের চোখে দেশদ্রোহী হয়ে যাওয়া । একই ভাবে পেট্রোপণ্যের দাম বৃদ্ধির নীতির বিরোধীতা করাকেও হয়তো উন্নয়ণ বিরোধী, দেশবিরোধী বলে আখ্যা দেওয়া হবে । কিন্তু বাস্তবটা হল দেশবাসীকে ছেড়ে তো আর দেশ হয় না । একই ভাবে দেশবাসীর স্বার্থের পরিপন্থী নীতিকেও দেশের স্বার্থে চালিত বলেও বেশিদিন চালানো যায় না । সরকারি নীতিকে যতই দেশের স্বার্থে বলা হোক, তার মূল্য কিন্তু দেশবাসীকে দিতে হয় । এবং যদি সেই গৃহীত নীতি দেশবাসীর স্বার্থের পরিপন্থী হয় তখন তার বিরোধীতা একান্তই কাম্য । আসা যাক মূল বিষয়ে , সরকার অনুসৃত নীতির ফলে বর্দ্ধিত এই ৩০ টাকার চাপ চক্রাকারে এসে একজন সাধারণ মানুষের পকেট থেকে কয়েক গুণ বেশি টাকা বের করে নিচ্ছে । করোনার আঘাত থেকে এখনও দেশের বাজার তথা দেশবাসী সম্পূর্ণ ভাবে বেরিয়ে আসতে পারেননি । বাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না । বেকারত্ব এখনও আকাশছোঁয়া । দারিদ্র, বেকারত্ব সমস্যায় জর্জরিত এই দেশের প্রতিটি মানুষকে পেট্রোপণ্যের মূল্য বিষয়ক এই সরকারী নীতির চাপ নিতে হচ্ছে । ভুলে গেলে চলবে না যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষ যে শুধু উচ্চ বা উচ্চ মধ্যবিত্তের মানুষের লাগে তা তো না, একই বাজার থেকে প্রতিটি বর্গের মানুষকে সেই জিনিষগুলো কিনতে হয় । বাজারের চিরাচরিত নিয়ম মেনেই মূল্যবৃদ্ধির কোপটা সবার ওপরেই এসে পড়ে ।