BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

ক্যালাইডোস্কোপ

Bartalipi, বার্তালিপি, ক্যালাইডোস্কোপ

                            ।। ১৭ ।।

         শত্রু-মিত্র স্ট্র্যাটেজি এবং হয়ে ওঠা 


    বুদ্ধ বরাবরই লাজুক, মুখচোরা। ক্লাসেও সে মাঝের সারিতে বসে, ভিড়ে মিশে থাকে। আলাদা করে তাকে কারো চোখেই পড়ে না। তবে যদি কেঊ নজর করে, তবে চশমার আড়ালে , তার উজ্জ্বল এক জোড়া চোখ, তাকে আকর্ষণ করবেই। দিপু অবশ্য তেমন নয়। সে দিব্যি কথাবার্তা বলতে পারে। এস এফ আই-এর দু’একটা মিটিং –এও সে হাজির হয়েছে সারথির সাথে। কোনো প্রশ্ন থাকলে , সারথি নিজে করে না। দিপুকে বলে প্রশ্নটা করতে। কোনো সঙ্কোচ বা জড়তা নেই প্রশ্ন তুলতে, যদিও প্রশ্নগুলো মুলত সারথির। আধা সামন্তবাদ-আধা পুঁজিবাদ কি করে একই সাথে থাকতে পারে, এই হল সারথির প্রশ্ন।কারণ, সামন্তবাদকে উৎখাত করেই তো পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটে।  কিন্তু দাঁড়িয়ে প্রশ্নটা করতে হল দিপুকে। মিটিং হচ্ছে নাজিরপট্টি পার্টি অফিসে। সবাই ঘুরে দেখছে দিপুকে। অরূপদা বুঝিয়ে দিল, যে বইপড়া বিদ্যায় , বাস্তবকে বাইরে থেকে বোঝা যায় না। ভারতের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক পরিস্থিতি, ইউরোপের সাথে মিলবে  না। এখানে জাতপাত, বর্ণবাদ,-সবই  আছে। এসব তো সামন্তবাদেরই চিহ্ন। তাহলে কি করে  বলবে যে সামন্তবাদ পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। একটা সময় দিপু বুঝতে পারে, বাকিরা অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছে। ওর নিজেরও এতসব কঠিন বিষয় মাথায় ঢুকছে না। অরূপদার সবচেয়ে বড় গুণ, সে শ্রোতার নাড়ির স্পন্দন বুঝতে পারে। সেও বুঝেছে অধিকাংশ ছেলেদের অন্যমনস্কতা। দিপুকে বলল, তুমি একটা বই নিয়ে যেয়ো আজ । সেটা পড়লে তোমার বিষয়গুলো বুঝতে সুবিধে হবে। অরূপদা যে বইটা দিয়েছিল, সেটা কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো। 

    মিটিং – ফেরত  পথে , সারথি অনর্গল বলে যাচ্ছে, রাশিয়ার বিপ্লবের কথা। দিপু অবাক হয়ে ভাবে, সে এতসব জানল কি করে !  দিপুদের রেল কোয়ার্টারে ‘সোভিয়েত দেশ’ নামে একটা পত্রিকা আসে ডাকে। পোস্টম্যান  প্রতি মাসে দিয়ে যায়। কাগজ খুব দামি। কত সুন্দর সব ছবি থাকে। লিওনিদ ব্রেজনেভ নামটা সেই সুবাদেই জানা। পড়ার মত বিশেষ কিছু থাকত না। শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত দেশ-এর পাতা দিয়ে নিয়ের মলাট হত, স্কুলে পড়ার সময়। আমাদের দেশের মত গরিব কেউ নেই। শ্রমিক – কৃষক সবার মুখেই হাসি। গোলগাল ফর্সা রমণীরা ঝুড়ি বোঝাই ফলে নিয়ে যাচ্ছে। স্কুলের বাচ্চারা কি সুন্দর ইউনিফর্ম পরে স্কুলে যাচ্ছে। কমসোমল-এর প্যারেড হচ্ছে। হাসপাতালে বিনা খরচে চিকিৎসা হচ্ছে। অবশ্য তাদের রেলওয়ে হাসপাতালেও বিনা খরচে চিকিৎসা হয়। তবে রাশিয়ার হাসপাতালের মত তাদের রেল – হাসপাতাল এত সুন্দর নয়।  ট্র্যাক্টর দিয়ে গম চাষ হচ্ছে। ওদের রুটি গুলো বেশ মোটা। সোভিয়েত দেশ পড়ে, দিপু এটা বুঝতে পেরেছিল, রাশিয়ায় সব মানুষের মাথার উপর ছাদ আছে, আর আছে খাবার ও পোশাকের সংস্থান ; সেটা দেয় সরকার। স্কুলের বইয়ে পড়েছিল , মানুষের ন্যূনতম চাহিদা হল, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান। এদেশে তো লক্ষ লক্ষ লোকের  মাথার উপর ছাদ নেই, রোজগার নেই, পোশাক নেই।  সারথি বলে, এটা সম্ভব হয়েছে বিপ্লবের জন্যই দেশটা এত সুন্দর। আর সেজন্যই লেনিনের নেতৃত্বে বিপ্লব হয়েছিল। রাশিয়ার বিপ্লবের জন্যই,  গোটা পৃথিবীর খেটে খাওয়া মানুষের চোখ খুলে গেছে।  সারথি রাশিয়া সম্পর্কে এত কিছু জানে বলে দিপু মনে মনে সংকোচিত বোধ করে। সে স্থির করে, তাকেও পড়তে হবে। জানতে হবে মার্ক্সবাদের অন্ধিসন্ধি।  লেনিনকেও বিপ্লবের স্বার্থে বিভিন্ন দলের সাথে হাত মেলাতে হয়েছিল। সেটা হচ্ছে স্ট্র্যাটেজি এদেশেও কম্যুনিস্টদের নানা রকম স্ট্র্যাটেজির মধ্য দিয়ে চলতে হবে। যতদিন না, বিপ্লবের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। লেনিন পেটি বুর্জোয়াদের সাথে শ্রমিক শ্রেণিকে নিয়ে আন্দোলনের ছক কষেছিলেন। 

    কথায় কথায় কখন যে পথ ফুরিয়ে গেছে, ওর টেরই পায়নি। কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো বইটা দিপুই নিয়ে যায়। পড়া শেষ হলে, সারথিকে দেবে। বাড়ী ঢুকতেই দেখে, দাদু চিন্তিত মুখে গলির মুখে দাঁড়িয়ে। ও জানে, দাদু কিছু বলবেন না। মামা বাড়ীতে ও বড় মামা থেকে শুরু করে সবার চোখের মণি। জন্মের সময় সঙ্কটাপন্ন অবস্থা থেকে বাঁচিয়ে এনেছেন বড় মামা। সিভিল হাসপাতালে, দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা পড়ে থাকতেন বড় মামা। জন্মের পর দু’তিন বছর বয়স অবধি দিপু   আর্যপট্টির মামা বাড়িতেই ছিল। মা’র হয়েছিল সিজারিয়ান অপারেশন। সঙ্গে রক্তাল্পতা। মা পারতেন না ওকে কোলে নিতে। আর এটাও কাকতালীয় ব্যপার যে, দিপুর জন্মের পরই বড় মামার ব্যবসা রমরমিয়ে বাড়তে থাকে। ফলে এই বড় ভাগ্নের জন্য মামার অপরিসীম স্নেহ দিপু অনুভব করত। ও যা খেতে ভালোবাসে, মামা সব নিয়ে আসতেন। দাদু শুধু বললেন, এত দেরী করো কেন ভাই ? ভাই ছাড়া দাদু ওকে ডাকতেন না। সেজন্য, দিপুও ছোটো থেকে দাদুকে ডাকে ভাইয়া। দিপু মনে মনে অপরাধী বোধ করে। এতটা দেরী করা ওর উচিৎ হয়নি। ও মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, স্যারের টিউশন না থাকলে, সাতটার মধ্যেই বাড়ী ফিরে আসবে। হাতের বইটা ভাইয়ার নজর এড়ায়নি। সাধারণ কৌতূহল থেকে জিজ্ঞেস করেন, কি বই ? দিপু সরল মনে বইটা দেখায়। বই হাতে নিয়ে ভাইয়াকে গম্ভীর হয়ে যেতে দেখে। মুখে অবশ্য কিছু বলেননি। তবে সেটা বেশিদিন গোপন থাকেনি। কারণ, ক্রমেই তার বইয়ের টেবিলে, পড়ার বইয়ের পাশে নানা রকম মার্ক্সবাদী বই দেখা যেতে লাগল। ভাইয়ার দুশ্চিন্তা বাড়তে লাগল। মাকে বললেন, তোমার ছেলে লেখাপড়া ছেড়ে , জ্যোতি বসুর দলে নাম লিখিয়েছে। জ্যোতি বসু বড়লোকের ছেলে। ওকে যা মানায়, সেটা তোমাকে মানায় না। তোমাকে মন দিয়ে পড়ে, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। তোমার বাবা কত কষ্ট করে রোজগার করেন। দিপু মনে মনে হাসে। কষ্ট লাঘব করার জন্যই তো বিপ্লব করতে হবে। আবার এটা ভেবেও অবাক হয় দিপু, ভাইয়ার দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দুই ভাইয়ের এক জন সিপিএম করেন, অন্য ভাই করেন সিপিআই। দিপু একদিন ভাইয়াকে তার বন্ধুদের প্রসঙ্গ তোলে। দাদুর সেই একই উত্তর, ওদের ঠাকুরদার এক কালের জমিদারী ছিল। কমিউনিস্টরা তো কোনোদিনই ক্ষমতায় আসবে না। তাই এসব পার্টি করে লাভ নেই। মন দিয়ে পড়াটাই উচিৎ। দিপু অনুভব করে, ও আজ জীবনের এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখান থেকে একটা পথ চলে গেছে, সুখী গৃহকোণের দিকে। অন্য পথটা বন্ধুর,  অনিশ্চিত। সে স্থির করে, মন দিয়ে লেখাপড়াটাই করবে। পার্টি করা নিয়ে বাড়ীর এই  সংঘাত থেকে উত্তরণের পথ কি, সেটা সে জানতে পারল প্রায় এক বছর পর। তখন তার জীবনে এলো আরেকটা বাঁক।  ( ক্রমশ)