BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

মহাপুরুষ শ্রী শ্রী শঙ্করদেব

Bartalipi, বার্তালিপি, মহাপুরুষ শ্রী শ্রী শঙ্করদেব

                       ।।১৯।।

    শঙ্করদেবের মৃত্যুর পরে তার পরিবারে অনেক দুর্যোগ নেমে এসেছিল। এক বছরের মধ্যে বড় ছেলে রামানন্দের বসন্ত রোগে মৃত্যু হয়। ছোট ছেলে হরিচরণের ও মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটেছিল। মাধবদেব এনে দেওয়া ওষুধ খেয়ে বছরখানেকের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন। এদিকে মাধবদেব ধর্মাচার্য হওয়ায় মাধব দেবের প্রতি এবং  শঙ্করদেবের পরিবারের প্রতি শঙ্করদেবের সম্পর্কিত ভাই-কাকা বনগঞাগিরী, সত্যানন্দ দলৈ ইত্যাদি আরও অনেকের ঈর্ষা এবং অসূয়া বেড়ে গিয়েছিল। ঠিক তখনই ভুতের উপর দানোর মত যাদবেন্দ্র নামে একজন মানুষ পাউবাসিতে থাকা  ভক্তদের উপর অত্যাচার আরম্ভ করেছিল। এই ধরনের নানা অশান্তির জন্য কালিন্দী মা মাধবদেবকে  পাউবাসীতে  থাকার জন্য অনুরোধ করেন। মায়ের কথা ফেলতে না পেরে মাধবদেব গণককুছির আঠারো বছরের ভিটে পরিত্যাগ করে পাটবাউসী চলে আসেন। কিন্তু সেখানে  ঝামেলার অন্ত হল না  বরং বেড়ে গেল।শঙ্করদেবের দ্বিতীয় পুত্র কমললোচনের বিধবা পত্নী দেখতে বেশ সুন্দরী ছিলেন। সতানন্দ দলৈর উস্কানিতে বগরিবারী মৌজার চৌধুরী তাকে বিয়ে করতে  প্রস্তুত হল। কারও কারও মতে তাকে এমনকি ধরে নিয়ে গেল। মাধবদেব তখনই তাকে উদ্ধার করে আনেন। বিয়ের ষড়যন্ত্র এভাবে ব্যর্থ হয়ে যাওয়ায় সতানন্দ বনগঞাগিরী ইত্যাদি প্রত্যেকেই ক্ষুন্ন হয় এবং শঙ্করদেবের পুত্রবধূদের সঙ্গে মাধব দেবের নাম জড়িয়ে কুৎসা রটাতে শুরু করে। এই সমস্ত দেখেশুনে মাধবদেব অতিষ্ঠ হয়ে গুয়াকছায় বসবাস করা বোন  উর্বশীর বাড়িতে চলে যাওয়া মনস্থ  করেন। কিন্তু কালীন্দী মা  তাকে এত দূরে যেতে না দিয়ে কাছেই সুন্দরীদিয়ায় থাকার পরামর্শ দেয়। সুন্দরীদিয়ায়  খীরা মরল নামে একজন মন্ডল ছিলেন। তিনি ছিলেন বিজয়সিংহ নামের একজন রাজপুত সর্দারের বংশধর। ইনি শংকরদেবের শরণ নিয়েছিলেন। মাধবদেব প্রথমে তার বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখানে ছয় মাস থেকে তিনি খীরা মরলের সাহায্যে সুন্দরীদিয়ায় সত্র স্থাপন করেন। খীরা মরলের পুত্র মাধব মরল তার বন্ধু ছিলেন।

    দুর্দিন এবং দুর্বিপাক ছিল মাধবদেবের চিরসঙ্গী। সুন্দরীদিয়ার ভক্তদের টাকা পয়সা ছিল না। অনেক সময় তাদের ভিক্ষা করে অন্ন জোগাতে হত। ঠাকুর আতা নিজের ভাঁড়ারের সমস্ত ধন দিয়ে তাঁদের কোনোমতে রক্ষা করেন। ঠান্ডায় পরার জন্য তাদের কাপড়চোপড় ছিল না। নানা ধরনের বাইরের ঝামেলায় মাধবদেবের সুন্দরীদিয়ার জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেও ধর্মের দিক থেকে কিন্তু সফল ছিল। ধর্মাচার্য হিসেবে তার যথেষ্ট নাম যশ ছিল। বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ এসে তার শরণ নিয়েছিল। তাদের মধ্যে মথুরাদাস বুঢ়া আতা, ভবানীপুরের গোপাল আতা, হরিহর আতা, শ্রী হরি,বুড়ির পো গোবিন্দ,লেকাচনীয়া গোবিন্দ  ইত্যাদির নাম  বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।     সুন্দরীদিয়ায়  মাধবদেবের সাহিত্যিক প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটে। শঙ্করদেব শেষবারের মতো বেহারে যাওয়ার আগে আগে তিনি মাধবদেব কে একটি ভক্তিতত্ত্ব মূলক ঘোষা পুথি  লেখার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেই মর্মে তিনি বিভিন্ন পুরাণে থাকা ছয়শোর মতো ভক্তি বিষয়ক শ্লোক অনুবাদ করে এবং বেশ কিছু নিজে রচনা করে এক হাজার ঘোষা সংবলিত  ‘নাম ঘোষা’ বা ‘হাজারী ঘোষা’ পুঁথি লিখতে শুরু করেন। অবশ্য এই কাজ সমাপ্ত হয়েছিল  সম্ভবত তিনি কোচবিহারে থাকার সময়। ‘নামঘোষা’ ছিল তার সবচেয়ে আদরের পুথি। ‘মৃত্যুর পরে এই পুথিতে  আমাকে পাবে’ বলে তিনি ভক্তদের বলে গিয়েছিলেন।

    ইতিমধ্যে নরনারায়ণ এবং চিলারায়ের মৃত্যু হয়েছিল। কোচরাজ্য দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছিল।পূব কোচ রাজ্যের রাজা ছিলেন চিলারায় পুত্র রঘুদেব। তাঁর রাজ্যে অসুরারি ভট্টাচার্য নামে একজন পণ্ডিত ছিলেন।রাজ্যের ধর্মস্থানগুলি দর্শন করার সময় এই পণ্ডিতের মাধবদেবের সঙ্গে দেখা হয় এবং শাস্ত্র  আলোচনা করে মুগ্ধ হন। 

    মাধবদেব ভেলায় থাকার সময় দেশে আকাল আরম্ভ হয়। ভক্তদের পক্ষে প্রতিদিনের ভিক্ষা জোগাড় করাও অসম্ভব হয়ে পড়ল। তখন উপায় না পেয়ে মাধবদেব ‘গুরুজন উবুরি হস্তে গল,আমি ভকতর হকে চিতহস্ত করিছোঁ’ বলে বেহারে তাঁর অনুগামী যে সমস্ত রাজকর্মচারী ছিলেন তাঁদের কাছে হাত পাতেন। প্রত্যেকেই উদার হস্তে দান করেন।ইতিমধ্যে মাধবদেব লক্ষ্ণীনারায়ণ রাজার মাতৃসমা ধাত্রীকে একজন শিষ্যারূপে লাভ করেন। রাজার ছয়কুড়ি মহিষীও তাঁর শরণ গ্রহণ করেন। 

    কোচবিহারেও মাধবদেবকে বিরুদ্ধবাদীদের সম্মুখীন হতে হয়েছিল।লক্ষ্ণীনারায়ণ রাজার বিরূপাক্ষ কাজি নামে একজন রাজকর্মচারী ছিল। তাঁর বোনের পরিবার মাধবদেবের শরণ নিয়েছিল।বোন ভকতনী হওয়ার পরে দাদার বাড়িতে ভাত খাওয়া নিষিদ্ধ হয়ে গেল।এই কথায় বিরূপাক্ষ কাজি মাধবদেবের উপর রুষ্ট হন। মাধবদেবের বিরুদ্ধে তিনি তর্জন গর্জন করতে লাগলেন। এবং পণ্ডিতের সঙ্গে তাকে তর্কযুদ্ধে আহ্বান জানালেন। যুদ্ধে পণ্ডিতের পরাজয় ঘটল।লক্ষ্ণীনারায়ন রাজা মাধবদেবকে ডাকিয়ে এনে খারাপ না পেতে অনুরোধ করলেন। মাধবদেবের ধর্মমতই রাজ্যে প্রবর্তিত হবে বলে তিনি তাকে আশ্বাস দিলেন। এভাবে ভক্তিধর্ম রাজধর্ম হয়ে পড়ে। বিরূপাক্ষ কাজি শেষে নিজের দোষ উপলদ্ধি করে এবং মাধবদেবের শরণ নেন। বিরূপাক্ষ কাজির অনুরোধে মাধবদেব ‘নাম মালিকা’নামে একটি সংস্কৃত পুথি অসমিয়ায় অনুবাদ করেন।পুথিটা ছিল উড়িষ্যা দেশের রাজা পুরুষোত্তম গজপতি করানো বিভিন্ন শাস্ত্রোক্তির সংকলন।

    মাধবদেব সাম্যবাদে বিশ্বাসী ছিলেন।তিনি মানুষের ছোট বড় বিচার করতেন না।তাঁর দৃষ্টিতে সবাই ছিল সমান। ইতিমধ্যে মাধবদেব জীবন সায়াহ্নে উপনীত হয়েছিলেন।তাঁর অবর্তমানে কে দায়িত্বভার গ্রহণ করবে এই কথা মাধবদেবকে জিজ্ঞেস করায় তিনি অনেকক্ষণ চিন্তা করে উত্তর দেন-

    দেখা ঘোষা পুথিখান আমার আছয়।

    সবে কহি আছো যিবা কহিবে লাগয়।।

    তাহার অর্থক যিবা জন বুজিবেক।

    সেইজনে জানা লাগ আমাক পাইবেক।।

    ঘোষাত সমস্ত মোর বল বুদ্ধি যত

    যার ভাগ্য আছে তাতে বজিবে সমস্ত।।

১৫৯৬ সনে মাধবদেবের মৃত্যু হয়।