শুধু হিন্দু বাঙালি নয়, মেঘালয়ে নিৰ্যাতনের শিকার সব অনুপজাতিই

শুধু-হিন্দু-বাঙালি-নয়,-মেঘালয়ে-নিৰ্যাতনের-শিকার-সব-অনুপজাতিই
A column by Manas Choudhury

   মানস চৌধুরী

 শুরুতেই একটা কথা বলে রাখি; গত ২৮ অক্টোবর শিলঙে ফেডারেশন অব খাসি গারো জয়ন্তিয়া পিপলস-এর মিছিল   থেকে শুধু বাঙালি হিন্দুদেরই আক্রমণ করা হয়নি, আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছেন অন্য অনুপজাতি সম্প্ৰদায়ের মানুষও৷   এমনকি, ডিডিও তোলার ‘অপরাধে’ যে ফটোগ্ৰাফারটিকে মারধ্র করা হয়েছিল, তিনিও একজন খাসি৷ ওই ঘটনার পর গত দশদিন ধরে শিলং বা মেঘালয়ের কোনও প্ৰান্ত থেকে অপ্ৰীতিকর কোনও ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি৷ আপাত-শান্তই রয়েছে শিলং, তবে আমাদের এই শৈলশহর দাঁড়িয়ে রয়েছে এক সুপ্ত আগ্নেয়গিরির ওপর৷ কিন্তু সে তো মেঘালয়ের জন্মলগ্ন থেকেই৷ আগ্নেয়গিরি থেকে যে কোনও সময় যে কোনও অজুহাতে উদগীরণ শুরু হয়ে যায় বিদ্বেষের, হিংসার, রক্তপাতের আগুনে-লাভার৷ বস্তুত এই আগ্নেয়গিরির সঙ্গেই গত ৫০ বছর ধরে বসবাস মেঘালয়ের বাঙালি-অসমিয়া-বিহারি-পঞ্জাবি, এক কথায় সব অনুপজাতি মানুষের৷ ফলে শুধু বাঙালি হিন্দুরা আক্রান্ত হয়েছেন, বা বাঙালি হিন্দুদের দোকানপাট গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে বরাক উপত্যকার কিছু রাজনৈতিক দল ও সংগঠন যে-অভিযোগ করছে, তা সর্বৈব সত্য নয়৷ আবার মিথ্যাও নয়৷ 

জাতিবিদ্বেষ, অনুপজাতিদের প্ৰতি স্থানীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ খাসি সম্প্ৰদায়ের সুতীব্ৰ ঘৃণাই আসলে ওই আগ্নেয়গিরির ভিত তৈরি করে দিয়েছে৷ এই জাতিবিদ্বেষ থেকে মুক্ত নয় সরকার, পুলিশ, বিভিন্ন সংগঠন, এমনকি সাধারণ মানুষও৷ অনুপজাতিদের এফআইআরও নিতে চায় না মেঘালয় পুলিশ, এমন বহু নজির রয়েছে৷ জাতিবিদ্বেষ যখন রাজনীতির বয়ান নিৰ্মাণের প্ৰধান উপাদান হয়ে যায় তখন নিরবচ্ছিন্ন অস্থিরতাই হয়ে ওঠে অনিবাৰ্য৷ মেঘালয়ে ঠিক সেটাই ঘটে চলেছে গত পঞ্চাশ বছর ধরে৷ এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর উপজাতি-তোষণের ভয়ঙ্কর নীতি৷ দিল্লিতে যে দলেরই সরকার থাকুক না কেন, এই তোষণ-রাজনীতির উৰ্ধ্বে নয় কেউই৷ ফলে মেঘালয়ে রাজ্য সরকারের অনুপজাতিদের সঙ্গে নিৰ্লজ্জ বৈষম্য, পুলিশের পক্ষপাতিত্ব, এবং বিভিন্ন সংগঠনের গো-জোয়ারি দাদাগিরি কোথাও যেন কেন্দ্ৰ সরকার থেকে শুরু করে মেনস্ট্ৰিম ইন্ডিয়ার পরোক্ষ অনুমোদন পেয়ে যায়৷ আজ মেঘালয়ে অনুপজাতিদের এই চরম দুৰ্ভোগের প্ৰেক্ষাপট আসলে নিৰ্মাণ হয়েছে এই বিন্দু থেকেই৷ 

১৯৭২ সালে পৃথক রাজ্য হিসেবে জন্ম মেঘালয়ের৷ কিন্তু অনুপজাতিদের ওপর খাসিদের বঞ্ছনা শুরু এরও আগে থেকেই৷ ১৯৭০ সালে বৰ্তমান মেঘালয় নিয়ে গঠন করা হয় স্বশাসিত উপ-রাজ্য৷ তখনও পূৰ্ণ রাজ্য হয়নি, কিন্তু সেসময়ই মেঘালয়ে অনুপজাতিদের জমি-বাড়ি কেনা-বেচার আগে উপ-জেলাকৰ্তার কাছ থেকে নো অবজেকশন নেওয়া বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়৷ যুক্তি হিসেবে বলা হয়, গরিব খাসিরা দারিদ্ৰের জন্য অনুপজাতিদের কাছে জলের দামে জমি-বাড়ি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন৷ এতে নিজেদের রাজ্যেই ভূমিপুত্ৰরা সৰ্বস্বান্ত হয়ে পড়ছেন৷ ফলে খাসিদের ‘আত্মরক্ষা’র খাতিরেই জমি-সম্পত্তি কেনা-বেচায় উপ-জেলা কৰ্তৃপক্ষের আগাম অনুমতি বাধ্যতামূলক করা হোক৷ কেন্দ্ৰ সরকার তাতে সায় দেয়৷ ১৯৭৮ সালে অনুপজাতিদের জমি-বাড়ি কেনা-বেচার ওপর পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়৷ এখনও শিলঙের ‘ইউরোপিয়ান ওয়াৰ্ড’ অৰ্থাৎ পুলিশ বাজার, জেল রোড ও ওকল্যান্ড ছাড়া বাকি শহর ও গোটা মেঘালয়ে অনুপজাতিরা জমি-বাড়ি কিনতে পারেন না, আবার খাসি মানুষ ছাড়া আর কারোর কাছে বিক্রিও করতে পারেন না৷ পুলিশ বাজার, জেল রোড ও ওকল্যান্ড মিলিয়ে গোটা শহরের পাঁচ শতাংশ হবে, এবং সেখানে আর জমি বা বাড়ি কোথায় যা অনুপজাতিরা কিনবেন৷ 

১৯৭৯ সালে ঘটে যায় নিৰ্মম বাঙালি নিধন৷  শহরের যেসব এলাকায় খাসিয়ারা সংখ্যায় বেশি, সেখান থেকেই বাঙালিদের মেরে তাড়িয়ে দেওয়া হয়৷ জ্বালিয়ে দেওয়া হয় অন্য অনুপজাতিদের বাড়িঘরও৷ এখনও মনে আছে, ওই নিধনযজ্ঞে পঞ্চাশ জনেরও বেশি অনুপজাতি মানুষ খুন হয়েছিলেন৷ পরিতাপের বিষয় হল, দিল্লি বা মূলস্ৰোতের ভূখণ্ডে এই নিধনযজ্ঞ কোনও রেখাপাতই করেনি৷ ‘মৃতের সংখ্যা ৫০’ এই পরিসংখ্যান হিন্দি বলয়ে কোনও আলোড়নই তুলতে পারেনি, এমন একটি ভাব সেসময় দেখা গেল যে, মারা গেছে তো মাত্ৰ পঞ্চাশ, উত্তর ভারতে এর চেয়ে কত বেশি মানুষ হিংসার শিকার হয় প্ৰতিবছর৷ ওই গণহত্যার কোনও বিচার তো দূর, কোনও রাজনৈতিক দলই কড়াভাষায় এর নিন্দাও করেনি৷ জাতীয় সংবাদ মাধ্যমে হেডলাইন হয়নি৷ অথচ এখনও ১৯৮৪-র শিখ দাঙ্গা বা ২০২০ সালের গুজরাট দাঙ্গা নিয়ে এখনও গোটা দেশে কত তৰ্ক, কত বিতৰ্ক৷ কিন্তু মেঘালয়ের  বাঙালি নিধন নিয়ে কেউ কোনও কথা বলেন না, যেন এমনটা হয়ইনি কখনও৷ আসলে দিল্লির এই মনোভাবের নেপথ্যেও রয়েছে সেই উপজাতি-তোষণের ভ্ৰান্ত নীতি৷ কিন্তু এই নীতির ভ্ৰান্তিতে যে বাস্তব তথ্য চাপা পড়ে গেল, তা হল, ১৯৭৮ সালে মেঘালয়ের জনসংখ্যা ছিল মাত্ৰ ২৫ লক্ষ, এর মধ্যে এক লক্ষ মানুষকেই যদি হিংসার শিকার হয়ে রাজ্যছাড়া হতে হয়, তাহলে শতাংশের হিসেবে তা কত দাঁড়ায়, এই সাধারণ অংক করার প্ৰয়োজনও কেউ মনে করল না৷ ফলে মেঘালয়ের জন্মের সময় যেখানে অনুপজাতি জনসংখ্যা ছিল কুড়ি শতাংশ তা গত পাঁচ দশকে নেমে এসেছে দশেরও কাছাকাছি৷ ১৯৮৭ সালে জাতিবিদ্বেষের শিকার হয়ে প্ৰায় পঞ্চাশ হাজার নেপালিকে মেঘালয় ছাড়তে হয়েছে৷ এই রক্তাক্ত অধ্যায়ও মেনস্ট্ৰিম ইন্ডিয়ার ইতিহাসে স্থান পায়নি৷ এক কথায় মেঘালয় থেকে অনুপজাতিদের নীরব প্ৰব্ৰজন ঘটেই চলেছে, এর কোনও খবর কেউ রাখে না, রাখার প্ৰয়োজনও মনে করে না৷  সেন্সাসের একটি সাধারণ মাপকাঠি রয়েছে, তা হল, প্ৰতি দশকে প্ৰতিটি সম্প্ৰদায়ের জনসংখ্যা গড়পরতা আড়াই শতাংশ করে বাড়ে৷ এটাই স্বাভাবিক প্ৰবণতা৷ কিন্তু মেঘালয়ে ঘটে চলেছে এর উল্টোটাই। আজ যখন দেখি বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যার হার ক্রমাগত কমেই চলেছে বলে ‘গেল-গেল’ রব তোলা হচ্ছে তখন আমার হাসিও পায়, আবার দুঃখও হয়৷ প্ৰজন্মের পর প্ৰজন্ম ধরে দেশেরই কোনও রাজ্যে বসবাস করার পরও একটি সম্প্ৰদায় সেই রাজ্য ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে, অথচ এ নিয়ে মূলস্ৰোতের রাজনীতি পুরোপুরি নিৰ্বিকার, নিৰ্লিপ্ত৷ শুধু মেনস্ট্ৰিম ইন্ডিয়া কেন, বাঙালির রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ বা বাঙালির উপত্যকা বরাক থেকেও তো কখনই এর সংগঠিত প্ৰতিবাদ করা হয়নি৷ সন্তোষমোহন দেবের দিল্লিতে এতো প্ৰভাব ছিল, রাজীব গান্ধীর ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মানুষ ছিলেন তিনি, কিন্তু মেঘালয়ে তাঁর দলের সরকার থাকার সময়ও যখন বাঙালির ওপর পরোক্ষ প্ৰত্যক্ষ আক্রমণ করা হয়েছে, সন্তোষমোহন নীরব থেকেছেন৷ অথচ তিনি পারতেন, বরাক উপত্যকা থেকে একমাত্ৰ তিনিই পারতেন৷ 

মেঘালয়ে এই জাতিবিদ্বেষের বীজ নিহিত রয়েছে খাসি সম্প্ৰদায়ের সমাজ-কাঠামোর মধ্যেও৷ খাসি সমাজে ‘দরবার’ বা গ্ৰামসভার প্ৰভাব অপরিসীম৷ এর প্ৰধান, যাঁকে অসমে ‘গাঁওবুঢা’ বলা হয়, তাঁদের প্ৰতাপ নিরংকুশ, সামাজিক বিষয় তো বটেই, আইন-শৃঙ্খলার ক্ষেত্ৰেও তাঁরাই শেষ কথা বলেন৷ ফলে ‘দরবার’-এর চৌকাঠ ডিঙোতে পারে না পুলিশ-প্ৰশাসন৷ কোনও অপরাধের তদন্তে সেখানে যেতে হলেও পুলিশকে আগে গ্ৰামপ্ৰধানের অনুমতি নিতে হয়৷ এই ‘দরবার’ ভীষণ মাত্ৰায় সাম্প্ৰদায়িক, অনুপজাতিদের প্ৰতি তাঁদের প্ৰবল বিতৃষা-বিদ্বেষ৷

এখন শিলঙের বাঙালি প্ৰধান এলাকাগুলোতেও দাপট বেড়ে গেছে ‘দরবার’-এর৷ কোনও এলাকায়, ধরা যাক, বাঙালি রয়েছে হাজার ঘর, খাসি পঁচিশ থেকে পঞ্চাশ, কিন্তু সেখানেও বাঙালিদের কথা বলার কোনও অধিকার নেই৷ যা বলার বলবে খাসিরাই৷ ভোটার কাৰ্ড আধার কাৰ্ড থেকে শুরু করে ক্যারেক্টার সাৰ্টিফিকেট বা ট্ৰেড লাইসেন্স থেকে শুরু করে জন্ম-মৃত্যুর শংসাপত্ৰ সব কিছুর জন্যই অনুপজাতিদের এই খাসি প্ৰতিনিধিদের দরজায় দরজায় ঘুরতে হয়, এবং বহু ক্ষেত্ৰে অপ্ৰয়োজনে অপমানও সইতে হয়৷ ওরা প্ৰভু, আমরা দাস, ওরা জমিদার আমরা রায়ত, এই বাস্তব সত্য বাঙালি সহ সব অনুপজাতিই বিলক্ষণ বুঝে গেছে৷ এবং এটা আরও ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছে সিএএ৷ ত্ৰিপুরা-সিকিমের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে খাসিরা আন্দোলন শুরু করে দেন এই যুক্তিতে যে সিএএ-র সুবাদে একদিন বাঙালির জন্য তাঁরাও সংখ্যালঘু হয়ে যাবেন নিজেদের রাজ্যেই৷ সিএএ-বিরোধী আন্দোলনে শিলং তখন উত্তাল, আর ভয়ে-ত্ৰাসে স্তব্ধ বাঙালি পাড়াগুলো৷ এই আন্দোলনকে শান্ত করার জন্য কেন্দ্ৰ সরকার নিদান দিল, ষষ্ঠ তফসিল এলাকাগুলোতে সিএএ বলবৎ হবে না৷ ফলে শিলঙের পুলিশ বাজার, জেল রোড ও ওকল্যান্ড, এক কথায় ইউরোপিয়ান ওয়াৰ্ড, এই ছোট্ট এলাকাটুকু ছাড়া গোটা মেঘালয়ে কখনই কাৰ্যকর হবে না সিএএ৷ ধৰ্মীয় নিৰ্যাতনের শিকার হয়ে যেসব বাঙালি হিন্দু বাধ্য হয়ে বাংলাদেশ পালিয়ে এসে মেঘালয়ে আশ্ৰয় নিয়েছিলেন, এই সিএএ বলবৎ হলেও তাঁদের শাপমুক্তি ঘটবে না৷ সিএএ-র নামে এতো বড় প্ৰহসন, অথচ কোনও প্ৰতিবাদ নেই৷  কেন্দ্ৰের এই ‘বদান্যতা’র ফলে বিধানসভায় খাসিদের জন্য একশ শতাংশ আসন সংরক্ষণের পথ সুগম হল, উপজাতি-তোষণকারী দিল্লিকে চাপে ফেলে সরকারি চাকরিতেও একশ শতাংশ সংরক্ষণের দাবি উঠল জোরালোভাবে৷ রাজীব গান্ধীর আমলে ষাট আসনের বিধানসভায় ৫৫টি কেন্দ্ৰ খাসিদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়েছিল৷ শুধু পাঁচটি কেন্দ্ৰকে সংরক্ষণের বাইরে রাখা হয়৷ সারা দেশের কোনও রাজ্যে এমন আজব ঘটনা এই প্ৰথম ঘটল যেখানে সংখ্যাগুরুদের জন্য বিধানসভায় আসন সংরক্ষণ করে দিল কেন্দ্ৰ সরকার৷  এখন শিলঙে যে  তিনটি আসন সংরক্ষণের বাইরে রয়েছে সেখান থেকেও অনুপজাতিদের জেতা বা ভোটে দাঁড়ানোর সুযোগ দিনদিনই কমছে, কারণ অনুপজাতিরা ভয়ে ভোট দিতে যাওয়াই ছেড়ে দিয়েছেন৷ বৰ্তমান বিধানসভায় একজনও বাঙালি হিন্দু প্ৰতিনিধি নেই৷ এককথায়, আজকের শিলঙে বাঙালি বা অনুপজাতিদের কোনও রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই, রাজনৈতিক অধিকার নেই, চাকরি নেই, ব্যবসার সুযোগ নেই৷ এই অবস্থায় বাঙালিরা সম্মান নিয়ে পালিয়ে যেতে পারলেই বাঁচেন৷ মেঘালয় আজ এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে৷

২৮ অক্টোবরের যে মিছিলকে ঘিরে এতো বিতৰ্ক, সেটি যে দাবিতে বের করা হয়েছিল, তা অযৌক্তিক ছিল, এমন কিন্তু নয়৷ সত্যিই সরকারি চাকরির সংস্থান খুবই সীমিত মেঘালয়ে৷ বেকারের সংখ্যা দিনদিনই বাড়ছে৷ আসলে রাজ্য সরকার কোনও শিপ্লস্থাপনের উদ্যোগ নেয়নি, উদ্যোগ নেয়নি কোনও পরিকাঠামো তৈরি করার৷ কিছুদিন আগে কেন্দ্ৰীয় অৰ্থমন্ত্ৰী নিৰ্মলা সীতারমণ একটি খঁটি কথা বলেছেন৷ তিনি বলেছেন, কিছু কিছু রাজ্য ক্ষমতার বাইরে গিয়ে দেদার ঋণ নিচ্ছে, সেই ঋণ পরিশোধের মতো কোনও ব্যবস্থা তারা করছে না৷ মেঘালয়েরও এটিই অন্যতম প্ৰধান সমস্যা৷ ফলে খাসিদের মধ্যেও অসন্তোষ দানা বেঁধেছে সঙ্গত কারণেই৷ সংখ্যাগরিষ্ঠের আৰ্থিক অবস্থা যখন দুৰ্বল হয়ে পড়ে তখনই যাবতীয় আক্রোশের সূচিমুখ সংখ্যালঘুদের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়৷ রাজনীতির এটিই নিয়ম৷ অতীতেও আমরা দেখেছি, নিৰ্বাচন এলেই অনুপজাতিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো শুরু করে দেয় রাজনৈতিক দলগুলো৷ এবং ঠিক এখানেই ভয় আমাদের৷ আমাদের বাঙালিদের, অনুপজাতি অন্য সম্প্ৰদায়গুলোর৷ 

এই প্ৰেক্ষাপট থেকেই ২৮ অক্টোবরের ঘটনা সম্পৰ্কে বরাক উপত্যকার রাজনৈতিক দল ও অন্য সংগঠনের প্ৰতিক্রিয়াকে অনুধাবন করতে হবে৷ সেদিন দেখলাম শিলচরের বিধায়ক দীপায়ন চক্রবৰ্তী অসমের মুখ্যমন্ত্ৰী হিমন্তবিশ্ব শৰ্মাকে স্মারকপত্ৰ দিয়ে মেঘালয়ে হিন্দু বাঙালিদের ওপর নিৰ্যাতনের ব্যাপারে পদক্ষেপ করার আৰ্জি জানিয়েছেন৷ বিজেপির বরাক উপত্যকা সময় কমিটিও এ ব্যাপারে হিমন্তবিশ্ব শৰ্মার সঙ্গে দেখা করবেন বলে জানতে পারলাম৷ দীপায়নরা নিজেদের রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে হয়তো সেটা করেছেন, এ নিয়ে আমার কিছু বলা সমীচীন হবে না৷ কিন্তু একটি বিষয় আমি বরাক উপত্যকার রাজনৈতিক নেতাদের বলতে চাই৷ মেঘালয়ে দশকের পর দশক ধরে অনুপজাতিদের বিরুদ্ধে যে নিৰ্যাতন চলছে, এর সঙ্গে ধৰ্মীয় পরিচিতির কোনও সম্পৰ্ক নেই, ফলে শুধু ‘হিন্দু’ বাঙালি নিৰ্যাতিত হচ্ছেন, এমন অভিযোগ তোলা রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ঠিক নয়৷ মেঘালয়ে নিৰ্যাতিত হচ্ছেন অনুপজাতি সব সম্প্ৰদায়ই, শুধু ‘হিন্দু’ বাঙালি একা নয়৷ বরং বেশি ‘বাঙালি হিন্দু’ ‘বাঙালি হিন্দু’ আওয়াজ তুললে তা ‘খাসি বনাম বাঙালি হিন্দু’র লড়াই হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে৷ পাশাপাশি অন্য অনুপজাতিদেরও পাশে পাওয়া না যেতে পারে৷  এই কিছুদিন আগে শিলঙের অসমিয়ারাও হিমন্তবিশ্ব শৰ্মার সঙ্গে দেখা করে তাঁর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন৷ কারণ অসমিয়ারাও একইভাবে মেঘালয়ে নিৰ্যাতন ও বৈষম্যের শিকার৷ আমার বক্তব্য, এই নিৰ্যাতনের সঙ্গে ধৰ্মীয় পরিচিতিকে গুলিয়ে না ফেলে রাজদীপ রায়, দীপায়ন চক্রবৰ্তীদের মেঘালয়ে অনুপজাতিদের নিরাপত্তার ব্যাপারে হিমন্তবিশ্ব শৰ্মার সঙ্গে আলোচনা করা উচিত৷ শুধু রাজদীপ-দীপায়ন নন, বরাক উপত্যকার অন্য সব রাজনৈতিক দল ও সংগঠনকেই এটা অনুধাবন করতে হবে যে, মেঘালয়ে শুধু ‘হিন্দু’ বাঙালি নন, নিৰ্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে সব অনুপজাতি মানুষকে৷ না হলে মেঘালয়ে হিন্দু বাঙালি আরও কোণঠাসা, একঘরে হয়ে পড়তে পারেন৷ 

(লেখক পদ্মশ্ৰী মানস চৌধুরী মেঘালয়ের প্ৰাক্তন শিক্ষামন্ত্ৰী ও দ্য শিলং টাইসম পত্ৰিকার কৰ্ণধার)



Bartalipi Digital Desk

Bartalipi Digital Desk

Bartalipi Digital Desk

Total 7 Posts. View Posts


About us

প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার যুগে খবরের সত্যতাটির পক্ষপাতদামুক্ত উদ্যোগ / দীক্ষা প্রয়োজন। ক্লান্তিকর সংবাদগুলি আর সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। অভ্যন্তরীণ খবরে বৈশ্বিক কোণ থেকে বর্ণিত করার লক্ষ্যে, "বার্তালাপি ডিজিটাল" ডিজিটাল সাংবাদিকতার মাঠে প্রবেশ করেছে। শিরোনামের মিশ্রণটি তার লক্ষ্য এবং লক্ষ্যটির স্ব-ব্যাখ্যামূলক। বৈশিষ্ট্যগুলি, নিউজফ্ল্যাশগুলি এর মাধ্যমে একটি প্ল্যাটফর্মে সমস্ত সিঙ্ক করা হয়, এটি বারাকের নেটিজেনদের একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আভা দেয়। বার্তালাপি ডিজিটাল তাই ডিজিটাল ভারসাম্য পূরণের প্রতিশ্রুতি দেয় যা এটি ডিজিটাল বিবর্তনের যুগে একটি সংবাদ সংস্থা হিসাবে চিহ্নিত করবে




Follow Us