BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

মহাপুরুষ শ্রী শ্রী শঙ্করদেব

Bartalipi, বার্তালিপি, মহাপুরুষ শ্রী শ্রী শঙ্করদেব

।।১৮।।

মাধবদেব ছিলেন শঙ্করদেবের প্রিয়তম শিষ্য এবং তাঁর ধর্ম মতের প্রচারক।শঙ্করদেব অসমে ভক্তি ধর্মের সূচনা করেছিলেন,কিন্তু তাকে চারপাশে ছড়িয়ে দেওয়া ব্যক্তিটি ছিলেন মাধবদেব। মাধবদেবের পূর্বপুরুষ ছিল বাংলাদেশের অন্তর্গত রঙপুর জেলার ধলেশ্বরীর তীরের বণ্ডুকায়।পিতা গোবিন্দগিরি,মাতা মনোরমা।মাধবদেব ১৪৮৯ সনের জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষ্ণা প্রতিপদ তিথিতে মনোরমা দেবীর গর্ভে জন্ম গ্রহণ করেন।

    মাধবদেবের শৈশব খুব সুখের ছিল না।অভাব অনটনের বিরুদ্ধে তাকে সব সময়ই যুদ্ধ করতে হয়েছিল।পিতার মৃত্যুর পরে সম্ভবত সম্পত্তির ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে মতান্তর ঘটে।তখন মাধবদেব বণ্ডুকা পরিত্যাগ করে মায়ের কাছে উজনিতে চলে আসেন।

    শঙ্করদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ মাধবদেবের জীবনের গতিপথ বদলে দেয়।এই সাক্ষাৎকারের পর থেকেই মাধবদেব শাক্ত ধর্ম ছেড়ে বিষ্ণুভক্ত হয়ে পড়েন এবং গুরুর সেবায় নিজের সম্পূর্ণ জীবন উৎসর্গ করেন।মাধবদেবের কাছে শঙ্করদেব ছিলেন সাক্ষাৎ কৃষ্ণের অবতার,হরি ভক্তের কল্পতরু-

    শ্রীমন্ত শঙ্কর             হরি ভকতর 

                 জানা যেন কল্পতরু।

    তাহান্ত বিনাই           নাই নাই নাই 

                 আমার পরম গুরু।।                    -নামঘোষা 

    শঙ্করদেবও মাধবদেবকে অভেদাত্মা জ্ঞান করতেন-

    সবাতো অধিক         তুমি প্রিয়তম 

            নিশ্চয় জানিবা তাক।

    তুমি আমি ভিন        নুহিকো জানিবা 

                  কহিলোহো সত্য বাক।।                -দৈত্যারি 

    মাধবদেব শঙ্করদেবের চেয়ে দুই কুড়ি বছরের ছোট ছিল।তবু শঙ্করদেবের চোখে তিনি ছিলেন ‘পরম বান্ধব’।বহুদিন আগে পিতা কুসুম্বর ভূঞা পেতে দেওয়া গোবিন্দগিরি ভূঞার পুত্র বলে শঙ্করদেব মাধবদেবকে আদর করে ‘বরার পো’বলতেন।

    সংসারের বাঁধনে একবার ঢুকলে ধর্মাচরণ করা টান হয়ে পরে বলে ভেবে মাধবদেব বিয়ে সাদিও করেন নি।মাধবদেব নিজে বিয়ে করেন নি যদিও তিনি শিষ্যদের তার উদাহরণ নিতে নিষেধ করেছিলেন-

    তোরা যদি সবে ভকতি করিবা।

    তেনে গৃহবাস পুনু কেহো নচারিবা।।

    আমাক দেখিয়া গৃহবাস নাহিকয়।

    ইটো সাহ নকরিবা তোরা সমস্তয়।।                -দৈত্যারি  

পরবর্তীকালে অবশ্য তাঁর অনেক শিষ্য-প্রশিষ্য তাঁর উপদেশ অস্বীকার করে তাকে অনুকরণ করে ‘কেবলীয়া’হয়েছিলেন। সত্রে কেবলীয়া ভকত প্রথার এভাবেই সৃষ্টি হয়।

    নামধর্ম প্রচারের জন্য মাধবদেব নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।তারজন্য তিনি ভক্তি বিদ্বেষীদের সমস্ত নিন্দা,গঞ্জনা গুরুর সঙ্গে সমান ভাবে ভোগ করতে হয়েছিল।প্রকৃতপক্ষে মাধবদেবের সহনশীলতা ছিল বিষ্ময়কর।পরবর্তীকালে তিনি যখন বারাদিতে ছিলেন,তখন নাম কীর্তন থেকে একদিন ফিরে আসার সময় কিছু ভক্তি ধর্মবিদ্বেষী মানুষ তাকে গালিগালাজ করে মারার জন্য তেড়ে এসেছিল।কিন্তু এরকম একটি পরিস্থিতিতেও তিনি ছিলেন অটল এবং অবিচল।তাঁর এমন সৌম্য মূর্তি দেখে লোকেরা বিস্মিত হয় এবং পায়ে পরে ক্ষমা চায়। 

    আর্থিক অভাব অনটন ছিল মাধবদেবের চিরকালীন সঙ্গী।মাতৃশ্রাদ্ধের জন্য ধন জোগাড় করার সময় শঙ্করদেবের মাধ্যমে নারায়ণদাস ঠাকুর আতার সঙ্গে তার পরিচয় হয়।শঙ্করদেব দুজনকে বন্ধুত্বের সূত্রে বেঁধে দেন।ঠাকুর আতা মাধবদেবকে মাতৃশ্রাদ্ধের জন্য ধন জোগাড় করায় সাহায্য করেছিল।

    বারাদিতে তিন বছর থাকার পরে কলানিকুছিতে দীঘলা কাত বলে একজনের বাড়িতে ছয়মাস এবং তাম্রধ্বজ নোয়াকুছি ভিটায় মাধবদেব চারমাস ছিলেন।সেইসময় শঙ্করদেব পাটবাউসীতে ছিলেন। তাঁর বাড়ি থেকে অধিক দূরত্বের জন্য শঙ্করদেব পাশেই একজন গণককে এক তোলা সোনা দিয়ে তাঁর বাগানটা কিনে নেয় এবং সেখানে বাড়ি ঘর তৈ্রি করে মাধবদেবকে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়।পরবর্তীকালে এই জায়গা গণককুছি নামে পরিচিতি লাভ করে। এখানে মাধবদেব সুদীর্ঘ আঠারো বছর বসবাস করেন।গণককুছিতে থাকার সময় মাধবদেব শঙ্করদেবের দ্বিতীয়বার তীর্থভ্রমণের সঙ্গী হন। শঙ্করদেব যাতে বৃন্দাবন না যেতে পারেন,তার ওপরে নজর রাখার জন্য কালিন্দী আই যাত্রার সময় মাধবদেবকে অনুরোধ করেন।সেই অনুসারে ছয়মাসের মধ্যে কেবল শ্রীক্ষেত্র দর্শন করেই তাঁরা ফিরে আসেন।

    গণককুছিতে থাকার সময়েই মাধবদেবের সাহিত্যিক জীবনের শুরু হয়।এর আগে দুই একটি গীত রচনা করলেও পুথি রচনা করা হয়নি।তাঁর প্রথম পুথি হল ‘জন্মরহস্য’।শঙ্করদেব মহারাজ নরনারায়ণের সঙ্গে দেখা করে বেহার থেকে ফেরার সময় ছোট রাজা চিলারায় ‘জন্মপুরাণ’নামে অধুনালিপ্ত একটি পুরাণের শ্লোক সংবলিত একটি সংস্কৃত পুথি পেয়ে তা অনুবাদ করার জন্য শঙ্করদেবকে অনুরোধ করে।শঙ্করদেব কাজটা নিজে না করে মাধবদেবকে সেই কাজের দায়িত্ব অর্পণ করেন।নিজের সামর্থের ওপরে সন্দেহ করে মাধবদেব প্রথমে কাজটা হাতে নিতে ইতস্তত করছিলেন।শেষ পর্যন্ত শঙ্করদেবের উৎসাহে মাধবদেব ‘জন্ম রহস্য’নাম দিয়ে পুথিটির পদ্যানুবাদ করেন।অনুবাদ দেখে শঙ্করদেব আনন্দিত হ্ন এবং ‘আমি বঢ়াব হে পারোঁ,টুটাব নোয়ারোঁ,তুমি হ্রস্ব-দীর্ঘ সবে পারা দহো’-বলে মাধবদেবের অনুবাদ প্রতিভাকে প্রশংসা করেন।মাধবদেব ও –

    তেন্তে মোর মহা               গুরু পিতৃ হুয়া 

                      উদ্ধারিলা নরকর।

    দিয়া ভক্তি দান                পালন্ত পোষন্ত 

                     পুত্রত করি বিস্তর।।

    -বলে এই পুথিতে শঙ্করদেবের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

    নরনারায়ণ-চিলারায়ের সঙ্গে শঙ্করদেবের সদ্ভাব হওয়ার সময়,সম্ভবত তিনি গণকুছিতে  থাকার সময়,মাধবদেব তাঁর একমাত্র কাব্য ‘রাজসূয়’রচনা করেন।ভাগবতের দশমস্কন্দ এবং মহাভারতের সভাপর্বের ভিক্তিতে এই পুথি রচিত হয়েছিল।

    গণকুছিতে থাকার সময় মাধবদেব নাটক রচনার কাজেও হাত দিয়েছিলেন। ‘দধি মথন’বা ‘অর্জুন ভঞ্জন’ নামে নাটকটি সম্ভবতঃ এখানেই রচিত হয়।এটিই তাঁর প্রথম এবং একমাত্র পূর্ণাঙ্গ নাটক।মাধবদেব গণকুছিতে বাস করার সময় বরপেটার কম্ল বায়েনের বাড়িতে শঙ্করদেব বেশ কিছু গীত রচনা করেছিলেন।তিনি মনের দূঃখে গীত রচনা বন্ধ করে এই কাজের দায়িত্ব মাধবদেবকে অর্পণ করেন।মাধবদেব সর্বমোট নয়কুড়ি এগারোটা রচনা করেন বলে জানা যায়।গীতগুলির বেশিরভাগ গণকুছিতে লেখা হয়েছিল। মাধবদেব গণকুছিতে থাকার সময়েই শঙ্করদেবের মহাপ্রয়াণ ঘটে। মৃত্যুর ঠিক আগে বড়ছেলে রামানন্দকে কাছে ডেকে শঙ্করদেব বলে যান-

    মাধব আমার         পরম বান্ধব 

                মোর প্রাণ একে সরি।।

    তান্ত হৈতে জীব       বিস্তর তরিব

                ভক্তির হৈব আচার্য।

    মই চলি যাওঁ       তাহান্তে লাগিল 

              ইঠায়র যত কার্য।।                                  -দৈতারি

    রামানন্দ পিতার শেষ ইচ্ছা সবাইকে জানানোর পরে ভক্তরা সবাই মিলে মাধবদেবকে ধর্মাচার্য পাতে।