BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

মহাপুরুষ শ্রী শ্রী শঙ্করদেব

Bartalipi, বার্তালিপি, মহাপুরুষ শ্রী শ্রী শঙ্করদেব

                    Il১৭ll

    অসমিয়া জাতির জন্য শঙ্করদেবের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান নামঘর। নামঘর হল ধর্মাচরণের কেন্দ্রভূমি। অসমিয়া জনজীবনে এর প্রভাব সর্বত্র এবং সুদূরপ্রসারী। প্রতিটি সত্রের কেন্দ্রে থাকে একটি কীর্তনঘর।সমস্ত ধর্মীয় অনুষ্ঠান এখানেই পালন করা হয়। সাধারণত পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত আড়ম্বরহীন, ঐতিহ্যবাহী প্রার্থনাগৃহ। এর নির্মাণশৈলীর মধ্যেই, শঙ্করী ধর্মের মূল আদর্শ গুলি অনেকাংশে প্রতিফলিত হয়েছে। নামঘরের চারপাশ থাকে উন্মুক্ত।  এ হল, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের প্রবেশাধিকারের প্রতীক। নাম ঘরের সংলগ্ন একটি ঘরে মণিকূট থাকে। এখানে, বিগ্রহের স্থানে ভাগবত, গুণমালা, কীর্তন ঘোষা বা মাধবদেব রচিত নাম ঘোষা  বা ভক্তিরত্নাবলীর মতো পবিত্র গ্রন্থ রাখা হয়। তবে, বর্তমানে, বরপেটা সহ অনেক কীর্তন ঘরে  পবিত্র গ্রন্থ গুলির পাশাপাশি ভগবান বিষ্ণু বা অন্য অবতারের মূর্তি পূজা করতে দেখা যায়।

    প্রত্যেক ধর্মের মানুষের একটি উপাসনা স্থান থাকে। হিন্দুধর্মের সার্বজনীন উপাসনা স্থানকে মন্দির বলা হয়। জায়গা বিশেষে এই ধরনের স্থানকে মঠ,দেবালয়,ধাম ইত্যাদিও বলে উল্লেখ করা হয়। বৌদ্ধ ধর্মের উপাসনা স্থানের নামের ভিন্নতা দেখা যায়।বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের স্থান গুলিকে বিহার,চৈত্য,প্যাগোদা  ইত্যাদিও বলা হয়ে থাকে। ইসলাম ধর্মে মসজিদ,খ্রিস্টান ধর্মে গির্জা,শিখধর্মে গুরুদ্বার বলা হয়। সংশ্লিষ্ট ধর্মাবলম্বী সমাজে এই ধরনের উপাসনা স্থলের অপরিসীম প্রভাব দেখা যায়। সমাজ জীবনকে নানাভাবে এই উপাসনা স্থানগুলি নিয়ন্ত্রণ এবং শৃঙ্খ্লাবদ্ধ করে। তবে জনজীবনে উপাসনা স্থানের এই ভিড়ের মধ্যেও নামঘরের অনন্যতা চোখে পড়ে। প্রথমত নামঘর যদিও একটি ধর্মাবলম্বীদের উপাসনা স্থান তবুও এর একটি ধর্মনিরপেক্ষ ভূমিকা রয়েছে। পবিত্র পরিচ্ছন্ন অসমিয়া পোশাক পড়ে যে কোনো মানুষই নামঘরে প্রবেশ করতে পারে, এর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারে। দ্বিতীয়তঃ নামধর্মের অনুগামীদের মধ্যে কোনো জাতিভিত্তিক বিভেদ নামঘর মানেনা। সমস্ত ভক্তই এখানে সমান। গ্রাম্য নাম ঘরের পরিচালনা সমিতিগুলি পরম্পরাগত ভাবে চারটি পদক নিয়ে (ব্যক্তির নয়) গঠিত হয়েছিল। সেই চারটি পদ নামঘরীয়া, গায়ন, বায়ন এবং সূত্রধার। এই চারটি পদের অধিকারীদের অর্থনৈতিক বা সামাজিক অবস্থান সমাজে তাদের কর্তৃত্বকে লঘুগুরু করেনা। এই ধরনের পরিচালনা ব্যবস্থা অন্য ধর্মানুষ্ঠানে দেখা যায় না। নামঘর একটি  বিশাল সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞের নেতৃত্ব দান করে- যে ভূমিকা বৌদ্ধ ধর্মানুষ্ঠানের বাইরে অন্য ধর্মের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায় না। নাম ঘরের সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞে ভাস্কর্যশিল্পী, অভিনেতা, বাদ‍্যকার, বাদ‍্য নির্মাতা, গায়ক, পোশাক নির্মাতা ইত্যাদি বহু সংখ্যক কুশলী লোকের প্রয়োজন হয়। নামঘর সমাজবাসীর কেবল আধ্যাত্মিক মুক্তির কথাই চিন্তা করে না, নামঘর উপাস্য জনের নাম নেওয়ায় গুরুত্ব দান করে ঠিকই- একটু বেশি গুরুত্বই দান করে(চৌদ্দ প্রসঙ্গ স্মরণীয়), কিন্তু সমাজ জীবনের জন্য ঈশ্বর উপাসনাই একমাত্র পথ বলে শিক্ষাদান করে না। নামঘর  এই শিক্ষাও দান করে যে সমাজ সুন্দর হতে হলে ব‍্যক্তিমন সুন্দর হতে হবে। ব্যক্তিমন সুন্দর হবে সমাজের নেতৃত্ব দানকারীরা যখন স্বার্থহীন এবং ত্যাগী হবে।নামঘরের অনন্যতার এটিও একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

    সপ্তদশ শতক নাম ঘরের বিকাশের কাল। এই শতকে কোচবিহার- কামরূপ-আহোম রাজ্য- এই তিন রাজ্যে অজস্র গ্রাম্য নামঘর এবং সত্র গড়ে উঠে এবং এইসব চৌদ্দ প্রসঙ্গ, গীত-নৃত্য ভাওনার চর্চা তথা পরিবেশন কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। নিঃসন্দেহে এর শুরু শংকরদেবের দ্বারা। মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শংকরদেবের রচনা রাজি অধ্যায়ন করলে কোথাও নামঘর শব্দটি পাওয়া যায়না। তার বিপরীতে ধর্মগুরুর উল্লেখে পাওয়া যায় ‘থান’ শব্দটি। এই ‘থান’শব্দটি ধর্ম এবং সংস্কৃতি চর্চা-এই দুটিরই কেন্দ্রস্থল রূপে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। শংকরদেবের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত প্রথম নামঘরটি ছিল বরদোয়া বা বটদ্রবা থান। পুরুষোত্তম ঠাকুরের রচনায় এই  থানটি  সম্পর্কে পাওয়া যায়।–

    ‘জয় জয় বটদ্রবা বৈকুণ্ঠ দূতয়।

    সেহিস্থানে নিজগুরু ভৈলন্ত উদয়।।

    সেহিস্থানে নিজগুরু পাতিলন্ত পাট।

    রামনাম মহারত্ন বেহাইলন্ত হাট।।

    মধ্যে পদশিলা দক্ষিণে নামঘর।

    মণিকূট গৃহ সাজি রহিলা শঙ্কর।।

উল্লেখিত এই পদে ব্যবহৃত ‘নামঘর’শব্দটি পরবর্তী পর্যায়ে প্রক্ষিপ্ত হতে পারে। তার আগে  বিভিন্নজন বৈষ্ণব ধর্মের কেন্দ্রস্থল গুলিকে মন্দির,সত্র,থান,পাট  ইত্যাদি নামে ব্যবহৃত করেছিল। পরবর্তীকালে নাম ঘর শব্দটি কেবল নব বৈষ্ণব ধর্মের কেন্দ্র স্থল হিসেবে নয়, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সামাজিক আলোচনা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের কেন্দ্র রূপেও ব্যবহৃত হয়েছিল। কেবল তাই নয়, এই শব্দটিকে ইসলাম ধর্মীরাও তাদের উপাসনা স্থলের সঙ্গে তুলনা করেছিল। সতেরো শতকে আজান পীর বাগদাদ থেকে এসে এর নাম ঘর,সত্র ইত্যাদির সঙ্গে মুসলমানদের সম্পর্ক দেখতে পেয়েছিল। এমনকি কুড়ি শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত দরং, শিব সাগর ইত্যাদি জেলার মুসলমান সমাজ ইসলাম ধর্মের উপাসনা স্থলকে নামঘর  বলতেন।  এই ধরনের নামঘরে হিন্দু-মুসলমানেরা যুক্ত সাধনা ও করেছিল।

    শংকরদেবের থান- নামঘর সমূহ  ছিল শরীরচর্চা, সঙ্গীত চর্চা, এবং নৃত্য চর্চার কেন্দ্রস্থল। নাম ঘরের চৌহদে এই ধরনের চর্চা করায় কোনো ধরনের জাতি ভাষা বা বর্ণের বিচার ছিলনা। কায়স্থ, কলিতা কোচ, কৈবর্ত, ব্রাহ্মণ ইত্যাদি থেকে শুরু করে জনজাতীয় সমাজের মিছিং, কছারি, কারবি ইত্যাদি সম্প্রদায়ের লোকেরাও নামঘরে একসঙ্গে বসে শরীর এবং সঙ্গীত চর্চা করতেন। গারোর গোবিন্দ, মিছিঙের  পরমানন্দ, ভুটিয়ার দামোদর, কৈবর্তের পূর্ণানন্দ, কছারির রমাই, কোচের মুরারি ইত্যাদি শংকরদেবের সময়ে নামঘরে একসঙ্গে ধর্ম সাধনা করতেন। ব্রাহ্মণ হরিদেব, দামোদর দেব, আহোমের নরহরি,নগার নরোত্তম, কার্বির হরিদাস ইত্যাদিও একসঙ্গে একই সারিতে বসে নাম কীর্তনে এসে মহাপ্রসাদ গ্রহণ করতেন। ইসলাম ধর্মী চান্দসাই(চান্দ খাঁ) যবন জয়হরি (জহুর আলী)ধেলী দর্জি ইত্যাদি ভিন্ন ধর্মের শিষ্যদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে থান- নামঘরে সমন্বয় সভার আয়োজন করেছেন।