BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

ক্যালাইডোস্কোপ

Bartalipi, বার্তালিপি, ক্যালাইডোস্কোপ

                      ।। ১০ ।।

             একটি তারায় ভরা রাত

বুদ্ধ যে রাতে মিঠুনের সঙ্গে তাদের বাড়ি গিয়েছিল প্রথম বার, সেটা ছিল পূর্ণিমার রাত। অগ্রহায়ণ-এর প্রায় শেষ , ডিসেম্বরের শুরুর সপ্তাহ। তার জন্মদিনের দু'দিন আগে। তার মানে সেটা ছিল পাঁচ তারিখ। আর সেবার ,তার জন্মদিনের বাংলা ও ইংরেজি তারিখ মিলে গিয়েছিল। জন্মদিনটা তার মনে থাকে। কিন্তু ঘোষণাটা আসে মায়ের কাছ থেকে। পূর্ণিমা বিগত প্রায় সময়ে জন্মেছিল বলেই কি তার নাম , বুদ্ধ রাখা হয়েছিল? তার বাড়ির সবকিছুই সৃষ্টিছাড়া। যেমন নাম রাখা। অনেক বন্ধুবান্ধবের পরিবারে দেখেছে, নাম রাখা হয় বাবার নামের আদ্যাক্ষরেরে সঙ্গে মিলিয়ে। তার এক বন্ধুর বাবা ও ভাইদের নাম সংক্ষেপে এন.সি.পাল। শুধু এন.সি.পাল নামে কোনো লেফাফা বা ইনল্যান্ড লেটার এলে ওরা প্রেরকের নাম দেখে নিত। তারপর চিঠি খুলত। বাবার নাম নরোত্তম, ছেলেরা নরেশ, নরেন,নগেন। ডাকনাম অবশ্য আলাদা রকমের, মিল ছাড়া।

কিন্তু বুদ্ধর আর কোনও নাম নেই। তার একটাই নাম। পাড়ার এক  কাকু স্কুলে ভর্তি করার সময়, ডাকনামটাই বলেছিলেন। বাবার সময় নেই। সেই কাকুকে বলে দিয়েছিলেন, বুদ্ধকে স্কুলে ভর্তি করে দিস। তখনো ওর  ভালো নাম রাখার কথা কেউ ভাবেইনি। অগ্রহায়ণ এলেই মা ঘোষণার মত সকলকে শুনিয়ে বলতেন, বুদ্ধর  জন্মদিন তো এসে গেল। যেন সেটা কোনো মহাপুরুষের জন্ম তিথি। বোন আড়াল থেকে ফোড়ন কাটত, বুদ্ধদেবের আবির্ভাব তিথি। বলে মুখ টিপে হাসত। দাদা হাসি লুকোনর চেষ্টা করত গাম্ভীর্যের আড়ালে। বুদ্ধ নিজেও উপভোগ করত এই নির্মল খুনসুটি। তবে মা যে শুধু ওরই জন্মদিনের ঘোষণা করতেন, তা নয়। সবার জন্মদিনই এভাবে ঘোষণা করতেন। আসলে যে সন্তানদের তিনি পৃথিবীতে এনেছেন, তাদের জন্মদিন মায়ের কাছে উৎসবের মতো ছিল। যে কোনও আনন্দের খবর সকলকে ডেকে ডেকে বলার অভ্যাস ছিল মায়ের। এই দেখ, কি সুন্দর গোলাপ ফুটেছে ; কিম্বা , দেখে যা , কিরকম হলুদ রঙ ধরেছে গাঁদা ফুলের গাছে। শীতের নরম আলোয়, গাঁদা ফুলের গাছ গুলো, সত্যিই হলুদ আভায় ভরে যেত। অথবা সেই আভা মায়ের মন থেকে ছড়াচ্ছে। মায়ের স্পর্শে সব কিছু স্নিগ্ধ সুষমায় ও লাবণ্যে ভরে যায় ; যাদের মনটা সরল হয়, তাদের সান্নিধ্যে এলে , এই লাবণ্য ফুলের সুবাসের মত অনুভব করা যায়।

মিঠুনের সাথে পরিচয় থেকে বন্ধুত্বের ঘনিষ্ঠতায় কি করে সম্পর্কটা পৌঁছল, বুদ্ধ এই মুহূর্তে মনেই করতে পারছে না। মিঠুনের পড়াশোনা পাব্লিক স্কুলে, আর বুদ্ধ পড়েছে গভট বয়েজে। গভর্নমেন্ট স্কুল কেউই বলে না। সকলেই সংক্ষেপে গভট বয়েজ, গভট ইস্কুল, কেউ আবার গর গর্মেন্ট ইশকুলও বলে। তবে কৌলীন্যের বিচারে অধর চাঁদ , গভট বয়েজ আর নরসিং স্কুলই সেরা। কলেজ যেন একটা সমুদ্রের মত। নানা স্কুলের, নানা জায়গার ছেলেরা-মেয়েরা  এসে জড়ো হয়। যার সাথে আগের পরিচয় নেই, সে হয়ে ওঠে প্রিয় বন্ধু। আর স্কুলে যে ছিল নিত্যদিনের ছায়াসাথি, তার সাথে বেড়ে যায় মানসিক দূরত্ব, অভিমান বাসা বাঁধে, বাবুই পাখীর মত, মনের নিভৃত কোণে। একদিন ছিঁড়ে যায় সম্পর্কের শেষ সুতোটুকুও। বুদ্ধর স্মৃতি প্রখর। কিন্তু ভেবে আশ্চর্য হয়, মিঠুনের সঙ্গে এহেন ঘনিষ্ঠতা কি করে ঘটল! শুধু মনে আছে, কি একটা সিনেমা দেখতে গিয়ে দেবদূত হলে ওর সাথে দেখা । খুব ভিড় হয়েছিল টিকিট কাউন্টারে। মিঠুন দীর্ঘকায়, প্রচণ্ড বলশালী। এক ঝটকায় কাউন্টারের লোহার গ্রিল ধরে এগিয়ে যায়,   আট-দশটা ব্ল্যাকারকে টপকে। বুদ্ধ তখনও পাশে দাঁড়িয়ে। বুদ্ধকে দেখেছিল ও। জিজ্ঞেস করে কোনটা  নেব ?  মিডল স্টল নিয়ে নিই ? বুদ্ধ মাথা নাড়ে। দু'টাকা পঁচিশের টিকিট নিয়ে বিজয়ীর মত বেরিয়ে আসে মিঠুন। মুঠোতে দুমড়ানো মোচড়ানো , দলা পাকানো দুটো গোলাপি টিকিট। সেই প্রথম আলাপ, একসাথে সিনেমা দেখা, সিগারেট খাওয়া ইন্টারভ্যালে। 

বিদ্যুৎ ছিল না। চাঁদের আবছা আলো , হলুদ আভা ছড়িয়ে রেখেছে চারপাশে। মিঠুনের বাড়ির গলিটা বেশ নির্জন। কয়েকটা এঁদো পুকুর পড়ে পথে। সোঁদা গন্ধ আসছে, ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক, আঁধারকে মহিমান্বিত করা জোনাকির আলো, আর তারা হাঁটছে আর গল্প করছে। তবে সেই গল্পের আদি-অন্ত নেই। আকাশের সাদা মেঘের মত ভেসে ভেসে আসছে কথার প্রসঙ্গ। আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। মিঠুনের বাড়ির গেট টিনের। গেটের উপর দিয়ে হাত দিয়ে ছিটকিনি খুলতে হয়। বিদ্যুৎ নেই। ঘরে জ্বলছে টেবিল ল্যাম্প আর হ্যারিকেন। বুদ্ধদের মতই টিনের চাল। বেশ বড় জমি নিয়ে বসতবাড়ি। পেছনে পুকুর আছে, বলেছিল মিঠুন। মিঠুনের মা এলেন, দিদি এলো। মিনিদি খুব মিশুকে। প্রথম আলাপেই বুঝেছিল, মিমিদির মনটা ভীষণ সরল । ঝর্না মাসিও তেমনই। বুদ্ধ লক্ষ করে ঝর্ণা মাসিও বেশ লম্বা। মিনিদিও তাই। সেজন্যই মিঠুন এত লম্বা, ছফুটের কম তো হবে না। মিনিদি কাকে যেন ডাকল। হ্যারিকেনের আলোয় তো আঁধার ঘোচে না। বরং একটা আবছা রহস্য ঘনিয়ে তোলে। মিনিদি যাকে ডেকেছিল, সে এসেছে। চুড়িদার পরা ছিপছিপে একটি কিশোরী । মিঠুনের খুড়তুতো বোন। বাংলাদেশ থেকে এসেছে। ওখানে সুরক্ষা নেই। তাই। এক মাথা কোঁকড়ানো চুল। টিকলো নাক। থুতনি ধারালো। মিনিদি বলে, ফুল, চা নিয়ে আয়। তারপর পরিচয় করিয়ে দেয়। এখন ক্লাস টেন-এ উঠেছে। ও সেতার বাজায়। আর কণ্ঠস্বরে সেই সেতারেরই ঝঙ্কার। 

বুদ্ধ জানত না, এই পরিচয়, এই রাত,  তার বাকি জীবনের নিয়তি লিখে দিয়ে গেল। অসুরক্ষিত অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচতে , যে নিজের দেশ ছেড়ে এসেছে, সে তো সহজে নৌকা ভাসাবে না, আসমানের গতিক না পড়ে, বুদ্ধ জানত না। ( ক্রমশ)