BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

বাংলামিডিয়াম (১৬)

Bartalipi, বার্তালিপি, বাংলামিডিয়াম (১৬)

কালীর গানে বাঙালির মন মানসিকতা যেভাবে ধরা আছে তেমনটা আর কোথাও নেই। বিশেষ করে রামপ্রসাদের সেই গানটা। যেখানে তিনি দালানকোঠায় থাকতে চাইছেন না, মাটির ঘরই তাঁর কাছে সোনার ঘর। তিনি জানেন, দালানকোঠায় থাকলে আর মা ডাকতে পারবেন না। সামন্ততন্ত্র, আধা সামন্ততন্ত্র পেরিয়ে বনিকতন্ত্রের নব্য নাগরিক আজকের বাঙালি হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছেন মা ডাকতে না পারার ক্ষরণ। অভিশপ্ত মেধার তাড়নায় বাঙালি একসময় ছুটে বেরিয়েছে দেশ হতে দেশ দেশান্তরে। তার শেকড় আলগা হয়ে গেছে। কে যেন তার কানে কানে বিবর্তিত মর্মার্থে তোতাপাঠ পড়িয়েছিল-- বড় যদি হতে চাও ছোট হও তবে। তাই সে মাটি ছেড়ে বসতি গেড়েছে টবে। কিন্তু তার অন্তর্গত রক্তের সংস্কার তাকে বিমর্ষ করে রাখে। বাক্স বাড়ির নিঝুম রাতে, ছোট্ট সাদা বড়ির বিনিময়ে কেনা-ঘুমের ভিতর একা গেয়ে চলেন বাঙালির বিবেক, রামপ্রসাদ সেন --
"দ্বারেতে অতিথি এলে, মা
না হয় যেন মুখ লুকাতে
ঘরে কাঁসার থালা, কাঁসার বাটি, মা
পায় যেন তায় দুটো খেতে"
এই অতিথি পরায়ণতা আমার বিসর্জিত অতীত। কতদিন কেউ আসে না দূরদেশে এই বাসাবাড়িতে আমাদের। এর চেয়ে টিলার উপর একার বাড়িটিও ভালো ছিল। ভাত ছিল না, কিন্তু অফুরান ছিল অতিথি আগমন। সামর্থ্যই শেষ কথা নয়। বাঙালি জানে সুজন হলে তেঁতুল পাতায় ন'জন ধরে যায়। তাই অসমিয়া হয়ে এলেও, অনূদিত বাংলায় ভূপেন হাজরিকার গাওয়া মানুষ মানুষের জন্য বাঙালির প্রাণের স্বতঃস্ফূরিত উচ্চারণ। আপন গান।
বাঙালি বড় অতিথি পরায়ণ ছিল। সেই কবে সুদূর গ্ৰামদেশের আন্তরিক আমন্ত্রণ ছিল-- "আমার বাড়িত যাইওরে বন্ধু বইতে দিয়াম পিড়া।
জলপান করিতে দিয়াম শালি ধানের চিড়া।।
শালি ধানের চিড়া দিয়াম আর ও শবরী কলা।
ঘরে আছে মইষের দইরে বন্ধু খাইবা তিনো বেলা।" গ্ৰামান্তরে শবরী কলার বদলে বিন্নি ধানের খই ছিল। ছিল গামছা বাঁধা দই। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, "বলি ও ননদী আর দুমুঠো চাল ফেলে দে হাঁড়িতে" সময়ের নিরিখে অর্বাচীন। ঠাকুরজামাই হঠাৎ এসে উপস্থিত হলে একা তার জন্য হাঁড়িতে দুমুঠো চাল বেশি ফোটাতে হবে, এ-ছবি একান্নবর্তী বাংলার হতেই পারে না। বাড়িতে জামাই এলে দাবড়িয়ে তাগড়া মোরগটাকে ধরে জবাই করা হতে পারে, এমনকি ঘচাং করে একটা আস্ত পাঁঠাও কাটা হতে পারে, হতে পারে পুকুরে জাল টেনে ছটফটে দীঘল চিতল দুটো তোলা হলো; না না, একজনের ভাত কম পড়ার কথা নয়। বাংলামিডিয়ামে অনূদিত দ্রৌপদীরা অন্নপাত্রে এক কণিকা খাবারও নষ্ট করেননি কখনো, আবার অভুক্ত অতিথিকে ফিরতে হয়েছে এমন উদাহরণও নেই। যাকে বলে লক্ষ্মীর ভাঁড়ার। প্রতীয়মানার্থ যা-ই হোক বাংলামিডিয়ামের হাঁড়িতে চিরকাল বাচ্যার্থেই ভাত বাড়ন্ত।
পঞ্জিকার একটা ছবি কৈশোরে ভীষণ আকর্ষণ করত। জামাই ষষ্ঠীর ইলাস্ট্রেশন।কাঁসার থালার সামনে অর্ধবৃত্তাকারে কাঁসার বাটি। থালাবাটি নয়, আমাকে আকৃষ্ট করত ঝালর লাগানো তালপাখা হাতে পৃথুলা শাশুড়ি। কেউ বলে দেয়নি তবু জানতাম, জামাই বাবাজি যে আসনে খেতে বসেছেন, সেইটি পাশে দাঁড়ানো জড়সড় মহিলাটির দীর্ঘ মনোনিবেশে বোনা। ওই আসন সাধের আসন। বাঙালি রমণীর ওই আসনে জাঁকিয়ে বসতে চেয়ে কত রক্তপাত, কতই না সমরায়োজন!
তালপাতার বাতাস, জল বাতাসার আপ্যায়ন, বাটা ভরা পান সুপারি, গাছ থেকে নামানো ডাবের কাঁদি-- কোয়ি লওটাদে মেরে বিতে হুয়ে দিন। মানুষতো মানুষ, ঘুমের মাসিপিসির জন্য পর্যন্ত মাছের মুড়ো বরাদ্দ ছিল। বৈঠকখানায় গড়গড়া ছিল। ছিল শীতল পাটি পেড়ে দ্বিপ্রাহরিক বিশ্রামের আয়োজন। তারপর কোথা থেকে কখন যে কী হয়ে গেল। নিমতন্নের চিঠি ছাপা হতে আরম্ভ হলো। আপনি, আপনারা, সবান্ধবের মাঝে অবলিক বসতে আরম্ভ করল। বুফে ও ক্যাটারিংওয়ালাদের কাছে কাঙাল ভোজন মঙ্গল গ্রহের ভোকাবুলারি।
খুব সংকুচিত হয়ে পড়ি। রক্তের সংস্কার ভর্ৎসনা করে; যখন কর্মোপলক্ষে উপজাতীয় অথবা আধা সামন্ততান্ত্রিক উত্তরাধিকারবাহী সুজনদের আতিথ্য গ্ৰহণের অবকাশ ঘটে। হাতে বানানো পিঠে, বাগানের ফল, গাছের পান সুপারি, ফেরার সময় তাজা শাকসবজি। একতরফা দাতার আনন্দ বর্ধনের কারক হতে ভালো লাগে না আর। আধুনিকতার নামে বড় তাড়াতাড়ি মানুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল জীবন থেকে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বন্দনা গাইতে গাইতে, সমষ্টির থেকে দূরে যেতে যেতে, আমার আমির কাছে কখন যেন মানুষ বড়ো ঝামেলা হয়ে উঠেছে। আমার হয়ে গলায় গামছা ঝুলিয়ে ব্রিটেনিয়া কোম্পানি অতিথি আপ্যায়নের ঠিকে নিয়েছে। আমি অবচেতনে আউড়ে চলেছি- অল্পেতে সাধ মেটে না। এ স্বাদের ভাগ হবে না।(ক্রমশ)

(লেখক টংলা কলেজের বাংলার অধ্যাপক)