BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

ক্যালাইডোস্কোপ

Bartalipi, বার্তালিপি, ক্যালাইডোস্কোপ

                  ।। ৯ ।।

         

              বই ও মিছিলের পথ

 কলেজে ঢোকার পথেই  দিপুর চোখে পড়ে, গোটা কলেজ পোস্টার-ব্যানারে ছয়লাপ। কলেজটা তো একটা উঁচু টিলার মতো জায়গায়। কেউ কেউ তো কলেজ-টিলাও বলে। আসলে জায়গাটার নাম টিকরবস্তি। টিকর শব্দের অর্থ উঁচু স্থান। গোটা শিলচর সমতল হলেও, এই টিকরবস্তিই একমাত্র উঁচু একটি টিলা। এরকম উঁচু জায়গা একমাত্র ডিসট্রিক্ট লাইব্রেরির সামনে দিয়ে যে রাস্তা গেছে, সার্কিট হাউসের সামনে দিয়ে, সেই জায়গাটা। তবে টিকরবস্তির মত উঁচু নয়। বাড়ি বানানোর জন্য অনেকেই উঁচু দেওয়াল তুলেছেন, যাতে বৃষ্টিতে টিলার মাটি ধুয়ে না যায়। সেইসব দেওয়ালে সাদা রঙ দিয়ে ,তার উপর লাল নীল অক্ষরে কলেজ মজলিস নির্বাচনের প্রার্থীদের নাম লেখা। এদের মধ্যে অনেকেই নির্দল প্রার্থী। দল বলতে শুধু এস এফ আই। সারথির সাথেই আজ কলেজে এসেছে। টিকরবস্তির নিচে, রিক্সা থেকে নেমে, পিচ করা টিলা-পথ বেয়ে উঠতে হয়। কলেজে ঢুকেই দিপু বুঝতে পারে, আজ আর ক্লাস-টাস হবে না। ছোট ছোট রঙিন কাগজে, প্রার্থীদের নাম ছাপা স্লিপ দিয়ে যাচ্ছে ছেলেরা। সারথি বলল, এরা আসলে এন এস ইউ আই-এর ক্যান্ডিডেট। নির্দল নামে দাঁড়িয়েছে। ইমার্জেন্সির ক্ষোভ মানুষের মনে তখনও দপদপ করছে। মনে আছে দিপুর, ইন্দিরা গান্ধী হেরে যাবার খবর রেডিওতে আসার সঙ্গেই কলোনি জুড়ে কত বাজি পুড়েছিল। দিপু নির্দল প্রার্থীদের স্লিপগুলো দলা পাকিয়ে ফেলে দিচ্ছিল। শুধু এস এফ আই-এর স্লিপ গুলো , পকেটে রাখছিল সযত্নে। এই ক’দিনের আলাপে বুঝতে পেরেছিল,সারথি মনে মনে বামঘেঁষা।

ওদিকে অরূপ চৌধুরী ছাত্রদের মুখে মুখে , ক্রমেই আপন হতে হতে অরূপদা হয়ে গেছেন।  এস এফ আই ছোট ছোট গ্রুপ মিটিং করছে। সারথি দিপুকেও নিয়ে গেল, এমনই একটি মিটিং-এ। বয়েজ কমন রুমে চলছিল মিটিং। আচমকা কতগুলো ছেলে, মারমুখী হয়ে ঢুকে পড়ল কমন রুমে। ওদের দাবি, এটা কমন রুম। এখানে মিটিং করা চলবে না। মিটিং-এ আসা কিছু ছেলে পাল্টা তর্ক শুরু করল। অরূপদা ওদের থামিয়ে সেই মারমুখী , উত্তেজিত ছেলেদের সাথে খুব শান্ত হয়ে কথা শুরু করলেন।  অরূপদা যা বলছিলেন, তা যুক্তির কথা। কিন্তু ছেলেগুলো কোনো যুক্তি মানতে বা শুনতে রাজি নয়।  অরূপদা শেষে বলেছিল, তোমরা যদি না চাও, আমরা চলে যাব কমন রুম থেকে। তবে এর ফল কিন্ত তোমাদের জন্য ভালো নাও হতে পারে। সেটা তোমাদের হাইকমান্ডকে জানিয়ে দিও। হাইকমান্ডটা কে, সেটা অনেকেই বোঝেনি। ব্যাপারটা একটা ধাঁধা হয়ে রইল। মারমুখী ছেলেগুলো তখনো দাঁড়িয়ে। অরূপদা বললেন, চলো, কাঁঠাল গাছের তলায়। ওখানেই মিটিং করব আমরা। জি সি কলেজের কাঁঠাল গাছ তলার একটা বিশেষত্ব আছে। গাছের তলাটা পাকা করে বাঁধানো। বৃষ্টি-বাদলা না থাকলে , পাকা করে বাঁধানো চাতালটা ছাত্রীদের দখলে থাকে। কোনো ছেলেকে যদি ঘনঘন কাঁঠাল তলার আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখা গেলে, অবধারিত তার নামে আওয়াজ ওঠে লুকুদার চায়ের দোকানের আড্ডায়। সঙ্গে হাসির হুল্লোড়। সেদিনও চাতাল ছিল মেয়েদের দখলে। অরূপদাকে সদলে আসতে দেখে, মেয়েরা সসম্ভ্রমে সরে গিয়ে এক পাশে দাঁড়াল। জেল-ফেরত অরূপদা যেন এক রূপকথার নায়ক। একজন মানুষকে ভালবাসায়, শ্রদ্ধায় নায়ক করে তোলা, সিনেমায় যেমন হয়, তেমনই হতে লাগল। যতদিন যাচ্ছে, অরূপদা ছাত্র মহলে জনপ্রিয়তার শিখর ছুঁতে যাচ্ছে। সেটা কি শুধুই জেল খাটার জন্য ? দিপু ও সারথি একদিন আলোচনা করছিল এ নিয়ে। আসলে অরূপদার মাটিঘেঁষা অমায়িক আচরণ, অরূপদার উজ্জ্বল চোখের দ্যুতি, রসবোধ,-- সব মিলিয়ে সবাই মানুষ অরূপদাকে ভালো না বেসে পারেনি। কাঁঠাল তলায় সবাই জড়ো হল।

জয়া বলে একটি মেয়ে একটা গান ধরল। ‘ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় না’ ,- সঙ্গে সঙ্গে আরও কিছু গলা উঠল। সমস্ত ঘটনাটা সকলকে এতটাই তাতিয়ে দিয়েছিল , ওখানে যারা ছিল, সবাই গলা মেলালো, সুরে-বেসুরে। দিপুও গাইছে। গানটা জানা ওর। বদরপুরে কত শুনেছে, ছোট থেকেই। গানের পর, অরূপদা সকলকে বলল, কমনরুমের ঘটনাটা, ওদের আচরণ। সারথি লক্ষ করল, সেই মারমুখী ছেলেগুলো দূর থেকে নজর রাখছে। অরূপদা খালি গলায় বলছিল। ওরা যেখানে দাঁড়িয়ে, সেখান থেকে শুনতে পাচ্ছিল না, অরূপদার কথা। ওরা এগিয়ে আসে। কলেজের এক অধ্যাপকও শুনছিলেন, টিচার্স কমনরুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। পড়ে জেনেছিল, ইনিই সেই হাইকমান্ড। কংগ্রেস দলের নেতা। অরূপদার কথা শুনে ভদ্রলোকের মুখ ম্লান হয়ে এল। জমায়েত হওয়া ছাত্রদের আবেগ যে অরূপদার দিকে পুরো ঘুরে গেছে, তা বুঝতে অসুবিধে হয়নি, হাইকমান্ড অধ্যাপকের। 

    নির্বাচনের দিন, দাদু কিছুতেই দিপুকে কলেজে যেতে দিতে রাজি ছিলেন না। নির্বাচনে মারামারি হয়, এটা জানতেন। কলেজের হাইকমান্ড-অধ্যাপক আবার দিপুর মামার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দাদুও স্বদেশি করার সুবাদে, কট্টর কংগ্রেসি, এ কি বৈপরীত্য। সারথি এসে বাঁচালো। দু’জনে একটা রিক্সা নিয়ে ছুটল কলেজে। ভোট শুরু হয়ে গেছে। এই প্রথম ওরা কলেজে ভোট দিচ্ছে, তা-ই নয়, জীবনেও প্রথম ভোট দেওয়া। পরদিন, বেরোবে ফল। রাতটা কাটল তীব্র উত্তেজনায়। সারথি আর দিপু, পাড়ার কাছে জাহাজ গুদামের পাশে, বরাকের তীরে এসে বসে। সন্ধ্যা নেমেছে। আগে এখানে কত জাহাজ আসত। এখন কালেভদ্রে এক দুটো আসে। 

    তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিল সকালে, কলেজ যেতে হবে বলে। আজ যে ফল বেরোবে। এমন উত্তেজনা ওদের কেন হচ্ছে, নিজেরাই বুজতে পারছে না। বা বুঝতেও চাইছে না। যেন এটা ওদেরই লড়াই। বিকেল হয়ে গেল ব্যালট গোনা শেষ হতে। সমস্ত কলেজ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল লাল আবিরের আভা। ইনকিলাব জিন্দাবাদ। এস এফ আই জিন্দাবাদ। চারদিকে দিপুর এত কালের চেনা লালা পতাকা আন্দোলিত হচ্ছে। মিছিলে মিশে গেল দিপু আর সারথি। সারা শহর ঘুরছে মিছিল। পৌঁছে যাছে মানুষের কাছে, পালাবদলের বার্তা। দিপু কি করে যে ভুলেই গেল, সন্ধে ছ’টার মধ্যে বাড়ি না গেলে, দাদু চিন্তা করবেন। আর ভুলবে নাই বা কেন। দিপু তো নিজের অস্তিত্বই ভুলে গিয়েছিল। জনসমুদ্রের জোয়ারে ভেসে ভেসে সে পৌঁছে যাচ্ছিল, এক স্বপ্নের দেশে। ( ক্রমশ)