BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

বাংলামিডিয়াম (১৫)

Bartalipi, বার্তালিপি, বাংলামিডিয়াম (১৫)

বোকা গাধা। কমবেশি সবাই শৈশবে গুরুজনের এই স্তুতিবাক্যে অভিষিক্ত হয়েছি। গুরুজনেরা সদাই ইনোভেটিভ, কখনো নতুনত্বের সন্ধানে বলতেন-- তৃতীয় স্বর আর সপ্ত স্বর। বুঝুন একবার, গালি দেবে আমাকে আর আমাকেই কিনা সঙ্গীতজ্ঞের শরণাপন্ন হয়ে তার অর্থ বুঝে নিতে হবে। অনেক পরে বুঝেছি, এভাবে ঘুরিয়ে গালি দিলে দাতার আনন্দ বাড়ে। বেড়াল যেমন এক কামড়ে ইঁদুর সাফা না করে খেলিয়ে খেলিয়ে মারে। তা, গুরুজনের উপরে কথা নেই। বোকা গাধা হয়েই বড়ো হয়েছি। তবে আমার বোকাপনা নিয়ে কাকা এবং মামাদের স্পষ্ট দুটি ভাগ ছিল। কাকারা গাধাকে বেছেছিলেন, মামারা বলদ। সরাসরি বলদ নয় "বলদা" বলতেন। এখান থেকেই প্রশ্নের উদ্ভব। বোকা বোঝাতে বাঙালি গাধা বলে কেন? লোকা ধোপার একটা গাধা ছিল বলে বইয়ে পড়েছি বটে, তবে আপন চোখে কোনো ধোপাকে গাধার পিঠে কাপড় চাপাতে দেখিনি। মানছি, লোকা ধোপার গাধাই বাংলা মিডিয়ামের একমাত্র গাধা নয়, বাংলা লোককথায় মাথায় ঘোল ঢেলে গাধায় চাপিয়ে চূড়ান্ত অপদস্থ করার রেওয়াজ ছিল। তবে সেই ঘিও নেই, সেই গন্ধও নেই। কিন্তু বলদ আছে। কিশোরবেলায় বলদ দেখেননি এমন কেউ এই লেখা পড়ছেন না, আমি নিশ্চিত। এবং বলদগুলো যে ভীষণ বলদ হয়, সে বিষয়ে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। সুতরাং যা গেছে তা যাক, এখন থেকে গাধা না বলে বলদ বলুন। মনে রাখবেন গালির পেছনে প্রকট লজিক থাকে, থাকে মোটা দাগের চিত্রকল্প। ওটাকে অক্ষত রাখুন।
বড়ো মাপের পণ্ডিতদের মতে গালি প্রত্যক্ষ হিংসাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বমন ধৌতি যে কাজটা করে আরকি। একই মাপের বড়ো আর একদল পণ্ডিত মনে করেন গালি দুর্বলের প্রবোধ। আর অভিশাপ হলো অক্ষমের শেষ আস্ফালন, গালির এক ডিগ্ৰি উপরে। গায়ে শক্তি থাকলে ডাইরেক্ট অ্যাকশনই পথ। নির্ণায়ক কোনো বক্তব্যে না গিয়ে একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভাগ করছি। শ্বাসরুদ্ধকর অসম আন্দোলনের দিনগুলির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জনৈক প্রবীণ বলেছিলেন, প্রতি মুহূর্তে মানসিক ভাবে ক্ষতবিক্ষত হতে হতে তিনি গভীর রাতে ছাদে উঠে গিয়ে প্রচণ্ড জোরে আহআঃ করে একটা লম্বা চিৎকার করতেন। আমি জানি, পৃথিবীর যেকোনো ভাষার অনুবাদক সেই চিৎকারের অনুবাদে তার শব্দভাণ্ডারের নিকৃষ্টতম শব্দটিকেই বাছবেন।
আমাদের এক ঝগড়ুটে আত্মীয়াকে নিবৃত্ত করতে জনৈক পারিবারিক বিচক্ষণ বুদ্ধি দিয়েছিলেন-- "মাসিমা আপনার যখন প্রচণ্ড রাগ উঠবে তখন যেকোনো একটা ঘরে ঢুকে পড়বেন, তারপর ছিটকানি দিয়ে তার চোদ্দ গুষ্টিকে জোরে জোরে গালি দেবেন, দেখবেন মনটা হালকা হবে, আরাম পাবেন।" অবিশ্বাস্য হলেও তিনি তা-ই করতেন। একদিন জিজ্ঞেস করলাম-- "গালি দিতে কেমন লাগে?" উত্তর ছিল-- "আরাম পাই, বেশ আরাম পাই।" মোদ্দা কথা গালাগালি এক প্রকারের মোক্ষণ। তবে তা মোটেই যেমন তেমন মোক্ষণ নয়। রীতিমতো শিল্পমণ্ডিত। উদ্দিষ্ট ব্যক্তির চূড়ান্ত বিপর্যস্ত অবস্থাটি প্রত্যক্ষ করতে পারাতেই তার সিদ্ধি। অবশ্যই এখানে রুচির কথা এসে পড়ে। এই রুচি নির্ণিত হয় সামাজিক অর্থনৈতিক অবস্থানের দ্বারা। নিম্নবিত্ত মানুষের মুখে ব্যবহৃত অপশব্দ যতটা উদোম এবং অশিষ্ট, তুলনায় মধ্যবিত্ত শব্দকোষ অনেটাই ঘোমটার পেছনে খেমটা নাচতে প্রয়াসী। সামাজিক আধিপত্যের চিহ্নগুলো গালাগালির মধ্যে ভয়ংকর ভাবে প্রতিফলিত। বাংলা অপশব্দের তালিকায় নারীর অবমাননার চিহ্ন যত্রতত্র ছড়ানো। ব্রাত্য শব্দের প্রচ্ছায়ায় সেই পুরুষ শাসিত সতীত্বেরই বন্দনা। এমনকি নারীও অভ্যাসে সেই প্রক্রিয়ার অংশী হয়ে কাকের মাংস খেয়ে চলেছে। শুধু কী তাই। পাগলা গারদের নাম পাল্টে যতই মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র করা হোক, পাগল আজও এক সামাজিক ক্ষত, সেই সঙ্গে গালি। কানা খোঁড়া ভেঙ্গুর শয়তানের লেঙ্গুর-- এরকম কিছু শুনেছেন? অথবা কালা বামুন? শুনে থাকলে সমাজের গভীরে প্রথিত বর্ণবাদ এবং বিকলাঙ্গের প্রতি সামাজিক মানসিকতাটা বুঝে নিন। আবার দেখবেন অপশব্দগুলি অনেক সময় রূপকের আশ্রয়ে ফুটে ওঠে। হ্যাঁ, অবশ্যই মধ্যবিত্তের অপশব্দ চয়নে। ধরুন হিটলার অথবা মিরজাফর। আবার বিজিতের মনস্তাপ মোচনে কিছু বদ রসিকতা জন্ম নেয়। দেখবেন বাংলা জোকসে পাঞ্জাবিরা সবসময়ই মস্তিষ্কহীন বলশালী। পাঞ্জাব এবং বাংলা, স্বাধীনতা অর্জনের একটা বড়সড় কৃতিত্বের অংশীদার। এবার পাঞ্জাবিদের বাহুবলকে দাগিয়ে দিতে পারলে বাঙালির বুদ্ধি দুকদম এগিয়ে থাকে। তাই আরকি।
ভাষা সবসময় নতুন প্রকাশ মাধ্যমের দিকে ঝুঁকে থাকে। একটা প্রচলিত ভাষা-কাঠামোকে ভেঙে তাতে নতুনত্ব আনবার একটা প্রচল পথ ঠেসে গালিগালাজ ঢুকিয়ে দেওয়া। সস্তায় স্মার্টনেসের শর্টকাট। আর ঠিক এই পথটাই বেছেছে বাংলা ওয়েব সিরিজ। বাছবে নাই বা কেন? মেট্রোর আলট্রা মডার্ন ঠেকগুলির বং কালচার সেদিকে বাঁক নিয়েছে অনেক আগেই। সে তুমি মুখে যাই বলো না, রোদ্দুর রায়ের ইউটিউব ভিউ কোনো কথা না বলে অনেক কথাই কিন্তু বলে দিয়েছে।
মানুষ আজও বড়ো ইনসিকিওর বুঝলেন। নইলে মনুষ্যেতর প্রাণীদের কথায় কথায় অপদস্থ করতে হতো না। এ যেন তুলাযন্ত্রের উন্নয়ন ক্রিয়া। যত
অন্যরা নীচে নামাবে আপনার পাল্লা ততই উপরে উঠবে। গোরু, ছাগল, গাধা, কুত্তা, পাঁঠা, খাসি, ব্যাঙ, গিরগিটি যাকে যখন ইচ্ছা গালাগাল হিসাবে বেছে নিলেই হলো। ওই যে শীতের রোদে পিঠ এলিয়ে মা শুয়োর তার ছানাদের গা চাটছে, অথবা ওই যে কালো কুকুরটার চারটা বাচ্চা গা ঘেঁষাঘেঁষি করে মায়ের দুধ খাচ্ছে, ভাগ্যিস ওরা মানুষের ভাষার মর্মাহতার্থ বোঝে না। ভাগ্যিস আপনার শালা অথবা শালি...। থাক না-ই বললাম।
আমি ছেলে জন্ম থেকেই বাঁকা। অত্যন্ত বিবেচনার সহিত ভুলভাল কাণ্ড করেই চলি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন গুয়াহাটি বইমেলায় গেছি সহপাঠী বান্ধবীর সাথে। সে আমাকে একটি বই উপহার দিয়েছে। জয় গোস্বামীর কবিতার বই। আমারও ইচ্ছা তাকে কিছু দেই। দিলাম। ভক্তি প্রসাদ মল্লিকের একটি বই। রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছিল বইটি। উন্নত মানের গবেষণার নিদর্শন। কখনো কোথাও বইটার আলোচনা পড়েছিলাম। মেলার ধুলোয় হঠাৎ বইটার সবুজ মলাট দেখেই রক্তের উষ্ণতা টের পাই। কিনে ফেললাম। এবং বান্ধবীকে রিটার্ন গিফ্ট হিসাবে দিয়ে বেশ একটা কেতা অনুভব করলাম। বুঝবে, ছেলের নজর আছে। সেই বিখ্যাত বইটির নাম "অপরাধ জগতের ভাষা ও শব্দকোষ"। (প্রসঙ্গত উৎসাহীরা চোখ বোলাতে পারেন-- 'বাংলা গালাগালের ভাষাতত্ত্ব’- পবিত্র সরকার।) বান্ধবীর বান্ধবী অনেক কথা শুনিয়েছিল এ-প্রসঙ্গে। ওর ধারণা ছিল, আমার মাথায় গোলমাল আছে।
কোথাও কোনো গোলমাল নেই। যে ভাষার স্ল্যাং ডিকশনারির মতো শব্দভাণ্ডার মজুত আছে, সে ভাষাকে ঠেকায় কে। আপনি আমি বাংলা মিডিয়ামের ছায়ায় দিব্য আছি। সে, যে যতই গালমন্দ করুকগে। এক্ষেত্রে আমার চামড়া গণ্ডারের। জানিয়ে রাখলাম।