BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

বাংলামিডিয়াম (১৪)

Bartalipi, বার্তালিপি, বাংলামিডিয়াম (১৪)

গ্ৰাউন্ড জিরো থেকে বলছি। বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতির শেকড় সন্ধানে নিজ হাতে মাটি খুঁড়ে দেখেছি, বাঙালির খাবারদাবারের কোনো প্রধান মূল নেই। গোটাটাই গুচ্ছমূলের উপর দাঁড়িয়ে। দু'এক ক্ষেত্রে অবশ্য বায়বীয় মূল থেকে ঠেস মূলে পর্যবসিত হতে দেখা গেছে। গুচ্ছমূল ও বায়বীয় মূলের খবরে যাঁরা প্রধান মূলের অনুপস্থিতিতে হীনম্মন্যতায় বিমর্ষ বোধ করছেন; তাঁদের বিনম্র অনুরোধ, ক্লাস সেভেনের সিলেবাসটা আর একবার ঝালিয়ে নিন। কীভাবে বোঝাব, বিজ্ঞানের বই এমন গোগ্ৰাসে গেলার বিষয় না, তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে হয়। ওই যে সব গাছ ছাড়িয়ে, এক পায়ে দাঁড়িয়ে, আকাশের সঙ্গে গভীর শলাপরামর্শে মগ্ন তাল গাছ, নারিকেল গাছ, তাহাদের প্রধান মূল নাই। অথবা বটবৃক্ষ, তাহার মূল বায়বীয়, তৎপশ্চাৎ ঠেসমূল। সুতরাং গুচ্ছমূল বলেই ছোটখাটো, এক টানে উপড়ে ফেলা যাবে, এমন ভাবার কোনো যুক্তি নেই।
বলছিলাম যে-- জলভাত, ডালভাত, দুধভাত, মাছভাত, শাকভাত; বাঙালির সঙ্গে কোনটা সবচেয়ে ভালো যায় বলুনতো? যদি শাকভাত ভেবেছেন, তবে আপনি আদি বাঙালির দলে। সেই যেখানে সুখের সংজ্ঞায় ধারদেনা না করে শাকভাত খাওয়া লোকটিকে নন্দিত করা হয়েছিল। এবার ধরুন "অতি সহজ" অর্থে আপনি জলভাত না ডালভাত কোনটাকে বেছে নেবেন তার উপর আপনার বাঙালিত্বের প্রাচীনতা নির্ণয় হবে। মনে রাখুন, ফুল্লরা সতীন ভেবে দেবীকে তাদের সংসারের দুরবস্থা বোঝাতে "আমানি খাইবার গর্ত" দেখিয়েছিল। আমানি মানে পান্তা, মানে জলভাত। না ফুল্লরার পক্ষে ডালভাত খেয়ে দিন কাটানোর গল্প শোনানো সম্ভব ছিল না। বাঙালি ডাল খাওয়া শিখেছে অনেক পরে। এইমর্মে এই সিদ্ধান্তেও পৌঁছনো চলে যে, অন্যান্য ভারতীয় প্রদেশ দ্বারা অনুপ্রাণিত হইয়া বাঙালি খিচুড়ি পাকানো শিখিয়াছে, অন্যথায় বাঙালি হয় স্বভাব সরল।
দুধভাত বাঙালি চিরকালই খেয়ে এসেছে। গোলাভরা ধান আর গোয়ালভরা গরু থাকলে দুধভাত প্রাথমিক নির্বাচন হবে, এতে আর আশ্চর্য কী! মনে পড়ে, দেবীর কাছে ঈশ্বরী পাটনি বর চেয়েছিল-- আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে। তাহলে কী দাঁড়াল, দাঁড়াল এই যে, শুধু স্বপ্নের পোলাওয়ে নয়, বাস্তবেও বাঙালির ঘিতে কার্পণ্য থাকার কথা নয়। এত দুধ থাকলে ঘি থাকবেই। ৮০০ বছর পিছিয়ে শ্রীহর্ষের "নৈষধচরিত"-এ গিয়ে দেখুন, বাঙালি গরম ভাতে ঘি চেটেপুটে খাচ্ছে। প্রাসঙ্গিক বিবেচনায় জানিয়ে রাখি, একসময় বাঙালি কাউকে তেল দিয়ে চলত না। তেলই ছিল না। সর্ষে থেকে তেল বের করা শিখতেই অনেক কাল কেটে গেছে। রইল বাকি মাছভাত। যে দেশে এক ক্রোশ পথ যেতে পাঁচটা নদী পার হতে হয়, যে জাতি আঁচলে ছাঁকিয়া ছোট মাছ ধরে, তাদেরতো মাছভাত খাওয়ার কথাই। খেতও। বিশ্বাস না হলে দময়ন্তীর বিবাহসভায় অথবা বেহুলার বিয়েতে যাঁরা নিমন্ত্রিত ছিলেন, প্ল্যানচেটে ডেকে তাঁদের জিজ্ঞেস করে নেবেন। তবে হ্যাঁ, পণ্ডিতদের মতে পাতলা মাছের ঝোল দিয়ে চাট্টি ভাত খেতে বাঙালির ১৫০০ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। তার আগে নাকি বাঙালি ঝোল খেত না।
জল-দুধ-শাক-ডাল-মাছ থেকে চট করে যদি মাংস ভাতের দিকে যেতে চান, আপত্তি নেই। হাজার একশ বছরের পুরনো বাংলা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহার বই চর্যাপদ-ঐ হরিণ শিকারের কথা আছে। সুতরাং বাঙালির হেঁসেলের ইতিহাসকে আমিষের ছোঁয়া বাঁচিয়ে রাখা কার্যত অসম্ভব। বাংলা হোটেলের সাইনবোর্ডে "এখানে মাছ, মাংস পাওয়া যায়" এক আদি ও অকৃত্রিম আমন্ত্রণ।
তাই বলে কী নিম-শিম-বেগুন থাকতে নেই! আছে তো। ছিলও। তবে তথ্য প্রমাণ মোতাবেক তিতা হিসেবে নিমের পাশাপাশি নালিতা শাক অর্থাৎ পাট শাকও বাঙালির পাকঘরের পুরনো বাসিন্দা।
যদি ভেবে থাকেন এত কচকচিতে না গিয়ে গরম ভাতে আলু সেদ্ধ আর কাঁচা লঙ্কা ডলে একথালা ভাত মেরে দিয়ে বিশুদ্ধ বাঙালিটি হয়ে চুপচাপ বসে থাকবেন, তাতেও চাপ আছে। জ্ঞাতার্থে জানাই, আলু এবং লঙ্কা দুটোই সতেরো শতকের কোন এক সময় পর্তুগিজদের হাত ধরে বাংলায় এসেছে। এবং টমেটোও।
পরমান্ন চলতেই পারে। কৃষি ও পশুপালন সভ্যতার ঊষাকালের অর্জন। দুধে চাল ফোটালেই পায়েস, পরমান্ন। গুড়ের পায়েস হলেই ভালো, চিনির শেকড় তেমন গভীর নয়। তবে ভুলেও কলকাতার রসগোল্লাকে আশ্রয় করে শেকড় চাড়ানোর চেষ্টা নয়। দুধ ফাটানোর অপকর্মটি পর্তুগিজদের সঙ্গদোষ। সতেরো শতকে। ছানার মিষ্টি ওই বট গাছের মতো বায়বীয় মূল থেকে বাংলার ঠেস মূল হয়েছে আরকি।
বাঙালি মোগলের হাতে পড়েছিল, সাথে খানাও খেয়েছে বিস্তর। কোপ্তা কোর্মা কালিয়ায় তার দাগ লেগে আছে। ব্রিটিশদের থেকেও নেওয়া গেছে বিস্তর।
বাঙালির হাতে ম্যাজিক আছে। যেকোনো প্রদেশের মানুষকে বাঙালি হেঁসেলের নামে ডাক দিন, দেখবেন পকেটে গ্যাস ও অম্বলের বড়ি গলিয়ে রাজি হয়ে যাবে।
খেতে খেতে একটা গল্প বলি। ডাক্তারের মতে গল্প করে খেলে খাওয়া হজম হয়। আমার এক খাদ্যরসিক অবাঙালি বন্ধু আছে। মাসিমার হাতে শুক্টো, মোছার ঘোন্ট, ঝিংএ পোস্টো, ইলিশ মাছের পাটুরি খাবার তার তীব্র বাসনা। হঠাৎ একদিন এক রাতের অতিথি হয়ে সে এসে উপস্থিত। সেদিন আমার মেজ কাকুর মেয়ের বিয়ে। খবর পেয়ে কাকু এসে নেমন্তন্ন করে গেছেন। বাঙালি বিয়ের নেমতন্ন পেয়ে সে রীতিমতো উত্তেজিত। সেদিন ওর স্বাদকোরক কোনটাকে কত নম্বর দিয়েছিল আমার জানা হয়নি তবে বাঙালি রান্না খেয়ে ওর চোখে মুখে যে বিস্ফোরক বিস্ময় ফুটে উঠেছিল তা আজও চোখে ভাসে। কেন? তার উত্তর জানতে সে রাতের মেনু চার্টটাতে একবার চোখ বোলান-- মেইন কোর্সের আগে হালকা খাবার হিসাবে ছিল দই ফুচকা, বম্বে চাট, চিকেন ললিপপ, মশলা সোডা, কফি ক্যাপাচিনো। খাবার পাতে ক্রমটা এইরকম-- বেবি নান, পনির বাটার মশালা, জিরা রাইস, ডাল মাখনি, ভেজ পকোড়া, মালাই কোপ্তা, চিলি প্রন, স্টিম রুই, বাসন্তী পোলাও, মটন রেজালা, প্লাস্টিক চাটনি, গোলাপ জামুন, আইসক্রিম, পান মশালা। খানিকটা হতভম্ব বন্ধুটির সংলাপ এখনও কানে বাজে। --"ইসমে বেঙ্গলি খানা কাহাঁ!?"
মাঝে মাঝে রিয়ালিটি শোতে নাচতে নাচতে হা হুতাশ করতে দেখি -- "একদিন বাঙালি ছিলাম রে।" কবে ছিলাম কে জানে। আদৌ কী ছিলাম! আমার তো মনে হয় বাঙালি এক ক্রমাগত হয়ে চলা। বাঙালি ভৈলি। ভুসুকুর সময় থেকে আজ পর্যন্ত কেবল শেকড়ে মাটি বাঁধা আর মাথা উঁচু করা। সব বাধা ছাড়িয়ে উঁকি মারা আকাশে।