BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

মহাপুরুষ শ্রী শ্রী শঙ্করদেব

Bartalipi, বার্তালিপি, মহাপুরুষ শ্রী শ্রী শঙ্করদেব

                         Il১১ll

মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষের একটি লক্ষণীয় বিষয় হল ধর্মীয় চেতনা। এই সময়ে সর্ব্বভারতীয় পটভূমিতে ভক্তি আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। দক্ষিন ভারত থেকে পূর্ব ভারত পর্যন্ত এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র ভরতবর্ষে এক বিপুল আলোড়নের সৃষ্টি করে। অসমের নববৈষ্ণব আন্দোলনকে সর্ব্বভারতীয় পটভূমিতে গড়ে উঠা ভক্তি আন্দোলন থেকে আলাদা করে দেখা সম্ভব নয়। শঙ্করদেব প্রচারিত নব-বৈষ্ণব ধর্ম ভারতীয় ভক্তি আন্দোলনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংগ মাত্র। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে ভক্তিধর্ম প্রচার করার জন্য বেশকিছু ধর্মগুরু,ধর্ম-প্রচারক,সন্ত কবির আবির্ভাব ঘটেছিল এই সমস্ত মনীষীরা তাঁদের সৃজনশীল প্রতিভার দ্বারা ভারতীয় সাহিত্য,সংস্কৃতি,সমাজ জীবনে অভূতপূর্ব অবদান রেখে গেছেন।এই প্রসঙ্গে আলোয়ার,নায়নমাররা ছাড়া শংকরাচার্য ,রামানুজাচার্য,রামানন্দ,কবীর,তুলসীদাস,চৈতন্যদেব,নানকের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। এবার আমরা ভারতের অন্যান্য ধর্মগুরুদের সংগে শঙ্করদেবের একটি তুলনামূলক আলোচনার দ্বারা শঙ্করদেবের প্রকৃত অবস্থান নির্ণয় করার চেষ্টা করব।

    ষষ্ঠ শতকে দাক্ষিণাত্যে বৈষ্ণব ভক্ত কবি আলোয়ার এবং শৈব ভক্ত কবি নায়নমাররা ভক্তি আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়। এই আলোয়ার এবং নায়নমারদের জীবন সম্পর্কে খুব বেশি তথ্যাদি জানা যায় না। আলওয়ারদের পরবর্তী ধর্মপ্রচারক হলেন শংকরাচার্য।শংকরাচার্যের আবির্ভাবকে একটি যুগ পরিবর্তনকারী ঘটনা বলে অভিহিত করা হয়। শংকরাচার্যের প্রকৃত নাম শংকর বিজয় বিলাস।ভক্তিধর্ম প্রচারকদের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিভাশালী ছিলেন শংকরাচার্য। শংকরাচার্যের জীবন কথা,প্রতিভা এবং ব্যক্তিত্বের বেশ কিছু দিকের সঙ্গে শঙ্করদেবের সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।কুসুম্বর ভূঞার বহুদিন ধরে কোনো সন্তানাদি না হওয়ায় শিবের আরাধনা করে শঙ্করদেবকে লাভ করেন। ঠিক একইভাবে শিবগুরু এবং আর্চাম্বার বহুদিন ধরে কোনো সন্তানাদি না হওয়ায় শিবের কাছে প্রার্থনা করে শংকরাচার্যকে লাভ করেন। তাই সন্তানের নাম রাখেন শংকরাচার্য। পাঁচ বছর বয়সে শংকরাচার্যের পিতার মৃত্যু হয়। শঙ্করদেবের ও শৈশবে পিতা মাতার মৃত্যু হয়। দাদি খেরসুতি তাঁর লালন পালন করেন। বেদ আদি অধ্যয়ন করার জন্য শংকরাচার্যকে পাঁচ বছর বয়সেই গুরুগৃহে পাঠান হয়। শংকরদেব ও বারো বছর বয়সে গুরু মহেন্দ্র কন্দলীর টোলে পড়তে যান।শংকরাচার্য খুবই কম দিনের মধ্যে বেদ এবং অন্যান্য শাস্ত্র অধ্যয়ন করে অভূতপূর্ব মেধার পরিচয় দান করেন। ঠিক তেমনই শঙ্করদেব ও অল্প বয়সেই শাস্ত্রজ্ঞান ও সৃষ্টিশীল প্রতিভার পরিচয় দান করেন। উভয়ের সম্পর্কেই নানা অলৌকিক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। কম বয়সে বর্ষার ভরা ব্রহ্মপুত্র সাঁতরে পার হওয়া,নদীতে ডুব মেরে কাছিম ধরা,বলদ গরুর শিঙ ধরে কাবু করা,ভেকুরি নামে একজন ভিক্ষুকের ভাঙ্গা হাড় জোড়া লাগিয়ে দেওয়া ইত্যাদি অনেক কাহিনিতে শঙ্করদেবের বাল্যজীবন পরিপূর্ণ। একইভাবে শংকরাচার্যের জীবনেও নানান রকম অলৌকিক ঘটনার সমাবেশ লক্ষ্য করা যায়। দিবাকর নামে একটি বোবা শিশুকে বাকশক্তি প্রদান,মহাদেবের সাক্ষাৎ লাভ,শিবের আজ্ঞা অনুসরণে ব্যাসকৃত ‘ব্রহ্মসূত্র’এর ভাষ্য রচনা,ব্যাসের সশরীরে শংকরাচার্যকে দর্শন দান,ব্রহ্মসূত্রের নিঁখুত ব্যাখ্যা শুনে সন্তুষ্ট হয়ে শংকরাচার্যের ষোল বছরের মৃত্যুযোগ বিনাশ করে আর ও ষোলো বছরের আয়ু প্রদান,যোগবলে শংকরাচার্যের আকাশপথে পরিভ্রমণ ইত্যাদি অনেক অলৌলিক কাহিনি শংকরাচার্যের জীবনেও আমরা দেখতে পাই। শঙ্করদেব তাঁর জীবনকালে দুবার করে তীর্থ ভ্রমণ করেছিলেন। প্রথমবার সুদীর্ঘ বারো বছর এবং দ্বিতীয়বার ছয়মাস কাল। এই ভ্রমণে তিনি গয়া,মথুরা,বৃন্দাবন,দ্বারকা,বদরিকাশ্রম,কাশী,প্রয়াগ,বারাণসী,পুষ্কর,পুরী,অযোধ্যা ইত্যাদি বিভিন্ন তীর্থস্থান ভ্রমণ করেন। এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শঙ্করদেবের জীবনকে সমৃদ্ধ করে তুলেছিল। শংকরাচার্য ও ধর্মমত প্রতিষ্ঠার জন্য তিব্বত,কাশ্মীর,ভূটান,নেপাল আদি ভ্রমণ করার কথা জানা যায়। তবে শঙ্করদেবের মতো সুদীর্ঘ বারো বছর ছয়মাসের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা আর কোনো ধর্মগুরুর ছিল না। ধর্মমত প্রচার করার জন্য শংকরাচার্য নিজে ভারতে চারটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেই মঠগুলি হল –দক্ষিণে শৃঙ্গেরী পর্বতে শৃঙ্গেরী মঠ,পশ্চিমে দ্বারকায় শারদা মঠ,উত্তরে বদরিকাশ্রমে জ্যোর্তিমঠ (জোশী মঠ হিসেবে পরিচিত),পূবে জগন্নাথ পুরীতে গোবর্ধন মঠ।এই মঠগুলির মাধ্যমে শংকরাচার্যের শিষ্য তথা অনুগামীরা ধর্ম প্রচার করে থাকেন। শংকরদেব এবং তার অনুগামীরা নামঘর,সত্র প্রতিষ্ঠা করে বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার করেন। ভক্তি আন্দোলনের প্রায় প্রতিজন ধর্ম প্রচারকই সাহিত্যের মাধ্যমে ধর্ম প্রচার করেছিলেন। এর ফলে প্রতিটি প্রদেশেই সাহিত্যের ভাণ্ডার ঋদ্ধ হয়েছিল।শংকরাচার্য ‘প্রস্থানত্রয়’নামে ব্রহ্মসূত্র,উপনিষদ এবং গীতার ভাষ্য রচনা করেন। ‘বিবেকচূড়ামণি’,’অপরোক্ষনুভূতি’,’আত্মবোধ’,’সর্ব বেদান্তসার সংগ্রহ’,’শতশ্লোকী’,মোহমুদ্গর শংকরাচার্যের উল্লেখযোগ্য রচনা। শংকরাচার্যের মতোই রামানুজাচার্যের ‘শ্রীভাষ্য’,তুলসীদাসের ‘রামচরিত মানস’,’বিনয় পত্রিকা’,সুরদাসের ‘সুরসাগর’,নানকের’গুরুগ্রন্থ সাহেব’মীরাবাঈ এবং কবীরের ভজন ভক্তি সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। কিন্তু অন্যান্য ভক্ত কবিদের সংগে শঙ্করদেবের সৃষ্টিপ্রতিভার তুলনা করলে দেখা যায় যে শঙ্করদেবের রচনার পরিমাণ অনেক বেশি।তাই সাহিত্যসৃষ্টির ক্ষেত্রে ও ভারতীয় ভক্ত কবিদের মধ্যে শঙ্করদেব অন্যতম।শঙ্করদেবের মতো একই ব্যক্তি গীত,নাটক,কাব্য,পরিবেশ কলা সৃষ্টি করে প্রতিটি ক্ষেত্রে বিরল প্রতিভার স্বাক্ষর রাখার মতো উদাহরণ একান্তই বিরল।

    শঙ্করাচার্য যে অর্থে দার্শনিক ছিলেন সেই অর্থে শংকরদেবকে দার্শনিক আখ্যা  দিতে না পারলেও তাঁর ধর্মীয় জীবনবোধের একটি গভীর দার্শনিক পটভূমি ছিল এবং একটি স্থির দার্শনিক প্রত্যয়  সামনে রেখে তিনি বিভিন্ন শাস্ত্র থেকে নিজের মতের অনুকূলে বিশেষ বিশেষ অংশ নির্বাচন করেছিলেন অথবা অনুবাদ করে নিয়েছিলেন। একথা অনস্বীকার্য যে পূর্ব ভারতে শংকরদেবই প্রথম দার্শনিক ভাবনা- সম্পৃক্ত চিন্তার জন্ম দিয়েছিলেন। এই সম্পর্কে বিরিঞ্চিকুমার বরুয়া যথার্থই মন্তব্য করেছেন-‘Sankardev was not a philosopher nor did he endeavour to evolve a new philosophy .Nevertheless,his literary works are pointers to the fact that he was stepped in the lore of Hindu philosophy.’  শঙ্করাচার্য প্রচারিত দার্শনিক মতবাদ কেবলাদ্বৈতবাদ, মায়াবাদ ইত্যাদি নামে পরিচিত।

    শঙ্করাচার্যের মতে ব্রহ্ম নির্গুণ, নিষ্ক্রিয়,নির্বিশেষ,নৈর্ব্যক্তিক যা সৎ নয় অসতো  নয়।কার্য নয়,কারণ ও নয়, জ্ঞাতা নয়,জ্ঞেয় ও  নয়,তা মন এবং বাক্যের অতীত অবাঙমানসগোচর। সগুন ব্রহ্ম অথবা ঈশ্বরকে তিনি অস্বীকার করেননি, কিন্তু তার মতে ঈশ্বর মায়িক তাই ঈশ্বরের গুণময় অভিব্যক্তি অনিত্য।জীব এবং জগতের মতো ঈশ্বরকেও  তিনি পারমার্থিক সত্য  হিসেবে গ্রহণ করেননি।তাঁর মতে ঈশ্বর ও জীব জগতের অনিত্য এবং ব্যবহারিক সত্য। অন্যদিকে অদ্বৈত ঈশ্বরবাদী শংকরদেব পঞ্চম পুরুষার্থ হিসেবে ভক্তিকে শীর্ষস্থানে দিতে গিয়ে শঙ্করাচার্যের ‘শারীরিক মীমাংসা ভাষ্য’, রামানুজের ‘শ্রীভাষ্য’, নিম্বার্কের ‘বেদান্ত পারিজাত সৌরভ’, মধ্বাচার্যের ‘পূর্ণ প্রজ্ঞ’ ইত্যাদি ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্যের সহায়তা না নিয়ে মূলত নির্ভর করেছিলেন গীতা এবং সর্ব বেদান্ত সার শ্রীমদ্ভাগবতের উপরে। শংকরদেব জগতের আত্মা ঈশ্বরকে পারমার্থিক মূল্য দিয়েছেন এবং সেবামূলক ভক্তিকে চরম মূল্য দিয়ে শ্রবন কীর্ত্তনের অনুষ্ঠান করে একচিত্তে ঈশ্বরের সেবাকে তাঁর বৈষ্ণব ধর্মের মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। শংকরদেবের মতে জগৎ মিথ্যা হতে পারেনা কেননা ঈশ্বর স্বয়ং ‘জগতের আত্মা’ এবং ঈশ্বর নিজে মায়ার অলীক কল্পনা হতে পারেন না, কারণ ঈশ্বর নিজেই মায়াধীশ-মায়া  ঈশ্বরের অধীন। মুক্তি বাঞ্ছাকে তিনি এক শরণ নামধর্মে চরম গুরুত্ব দান করেননি।

    মহাপুরুষ শঙ্করদেব এবং গুরু নানক সমসাময়িক মহাপুরুষ। দুজনেরই জীবন দর্শন প্রায় এক। দুজনেই ছিলেন সমাজ সংস্কারক,সাম্যবাদী,উদার,দয়ালু,মেধাবী,সৃষ্টিশীল সাহিত্যিক,সংসারে বসবাস করেও উদাসীন বৈরাগী,ঈশ্বরভক্তিতে আত্মমগ্ন সিদ্ধ যোগীপুরুষ।গুরু নানকের জীবনও অলৌকিকতায় পরিপূর্ণ।মহাপুরুষ শঙ্করদেব যেমন বর্ণমালা শিখে আকার-ইকার ছাড়া কবিতা লিখে শিক্ষককে বিস্মিত করেছিলেন,গুরু নানক ও তেমনই বর্ণমালা শিখেই একটি সুন্দর প্রার্থনা সংগীত রচনা করে সুন্দর কণ্ঠে গেয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেন।তবে শঙ্করদেবের মতো নানককে শৈশবে পিতৃ-মাতৃহীন হতে হয় নি। পিতা কালু একজন ধনী সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন। শৈশব থেকেই নানক ছিলেন প্রকৃতিমুখী।নির্জন স্থানে বসে ঈশ্বর চিন্তায় মগ্ন থাকতে ভালোবাসতেন।শৈশব থেকেই নানক ছিলেন যুক্তিবাদী।তখনকার দিনে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা উপবীত ধারণ করতেন। নানকের ও উপবীত ধারণের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হল।কিন্তু তিনি উক্ত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করলেন না।তিনি অংশগ্রহণ না করার কারণ হিসেবে বললেন-‘যে উপবীত তোমরা আমাকে ধারণ করতে বলছ,তা কয়েকটি সুতোর সমাহার মাত্র।একদিন এই উপবীত জীর্ণ হবে,অপরিষ্কার হবে,ছিঁড়ে যাবে।এটা তো পরলোকে আমার সঙ্গী হব না।‘শঙ্করদেবের মতোই নানক অস্পৃশ্যতা এবং বর্ণবাদী সমাজ ব্যবস্থার বিরোধী ছিলেন। তাঁর উদার সাম্যবাদী কার্যকলাপের দ্বারা পশ্চিম-উত্তর ভারতে অস্পৃশ্যতা দূর করার চেষ্টা করেছিলেন।মহাপুরুষ শঙ্করদেব যেভাবে ঈশ্বর উপাসনার জন্য নাম-কীর্তন,বরগীত আদি রচনা করেছিলেন গুরু নানক ও তেমনই প্রার্থনা গীত,ভজন আদি রচনা করেছিলেন।অবশ্য নাট-ভাওনা,চিত্র-ভাস্কর্য ইত্যাদি চর্চার কথা গুরু নানকের জীবনীতে  দেখা যায় না।

    শংকরদেব যেভাবে সতী রাধিকা শান্তি দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছিলেন, ঠিক সেভাবে নানক সৃষ্টি করেছিলেন লালো নামে একজন মুচির দৃষ্টান্ত। সেই সময় জমিদারী শোষণ এবং অস্পৃশ্যতার বলি লালোর ঘরে আহার এবং আশ্রয় গ্রহণ করে নানক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সৃষ্টি  করেছিলেন। লালোর বাড়ি ছিল সৈয়দপুরে। পরিব্রাজক নানক, শিষ্য মর্দানা সহ লালোর বাড়িতে থেকে শিখ ধর্মের বাণী প্রচার করেছিলেন।এই কথা সৈয়দপুরের জমিদারের কানে যাওয়ায় তিনি গুরু  নাঙ্কের উপরে ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেন। কিন্তু প্রকাশ্যে নানকের বিরুদ্ধে কিছু করার তার সাহস ছিলনা কারণ নানক স্থানীয় ভক্ত সমাজে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। তিনি  একটি ভোজসভার আয়োজন করে নানককে আমমন্ত্রণ জানান। তার উদ্দেশ্য ছিল নানককে এই ধরনের কার্যকলাপ বন্ধ করার  কথা বলা। নানক কে আনার জন্য তিনি বরকন্দাজ সেনার দল প্রেরণ করেছিলেন। নানক সেনার দলের সঙ্গে জমিদারের বাড়িতে উপস্থিত হয়েছিলেন। কিন্তু জমিদারের ঘরে জল স্পর্শ করতে রাজি হননি। জমিদার অপমান বোধ করে তার এই ধরনের আচরণের কারণ জিজ্ঞেস করেন। নানক তখন বলেন-‘ তোমার যে উপার্জন তা ঘাম -রক্তের বিনিময়ে উপার্জন নয়। তুমি কেবল অধিকার জাহির করে দীন দুঃখীদের পরিশ্রমের ফল কেড়ে এনেছ। তাই তোমার জল অস্পৃশ্য। যারা নিজের রক্ত-ঘামের বিনিময়ে পরিশ্রম করে তার অবশিষ্ট অংশ দান করে সেটাই যথার্থ স্পৃশ্য।’  জমিদারের বিরুদ্ধে এ ধরনের প্রতিবাদ সাব্যস্ত করার সাহস সেই সময়ে কারও ছিল না। এই ধরনের প্রতিবাদে পীড়িত নাগরিকদের মনোবল বৃদ্ধি করেছিল।

    শংকরদেবের মতোই গুরু নানকও নাম কীর্ত্তন ভজন প্রচলন করেছিলেন। মহাপুরুষ শংকরদেব ‘কীর্ত্তন ঘোষা’ রচনা করার মতো নানক রচনা করেছিলেন ‘কীর্ত্তন সোহিলা’। ‘কীর্ত্তন সোহিলা’ অবশ্য ‘কীর্ত্তন ঘোষা’র মতো সুবৃহৎ গ্রন্থ নয়। তা  হল ভজন বা ভক্তিমূলক গীতের অংশবিশেষ। কিন্তু ঈশ্বর উপাসনার সাধন রূপে এর পরিবেশন প্রণালী প্রায় ‘কীর্ত্তন ঘোষা’র মতোই এবং এরও উদ্দেশ্য হল ঈশ্বরের গুণানু কীর্তন করা। মহাপুরুষ শঙ্করদেব এবং গুরু নানকের ঈশ্বর প্রাপ্তির সাধনমার্গ ছিল নাম- কীর্তন। গুরু শংকরদেব যেভাবে ‘মুখে বোলা রাম, হৃদয়ে ধরা রূপ’ বলে ঈশ্বরের নাম নেওয়া এবং মনন করার উপদেশ দিয়েছিলেন। নানক ও তেমনি শিষ্যদের ঈশ্বরের নাম গ্রহণ করার জন্য এবং অন্তরে তাকে ধ্যান করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

    মহাপুরুষ শঙ্করদেব এবং গুরু নানক দুজনেই গৃহী হয়েও বৈরাগী এবং বৈরাগী হয়েও গৃহী ছিলেন। মাঝেমধ্যে গৃহত্যাগ করে গেলেও বহুদিন পরে আবার পরিবারের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন। সুদীর্ঘ বারো বছরের শেষে শঙ্ককরদেব যেভাবে নিজের গৃহে প্রত্যাবর্তন করে গৃহী হিসেবে বাস করেছিলেন, গুরু নানক ও তেমনই অনেক বছর পরে নিজের কর্তারপুর গ্রামে ফিরে এসে পুত্র পরিবারের সঙ্গে কিছুদিন বসবাস করেছিলেন। আহার বিহারের ক্ষেত্র দুইজনের মধ্যে মিল ছিল। দুজনেই মাছ মাংস খেতেন বা আমিষ আহার গ্রহণ করতেন। দুজন গুরুরেই ইহলীলা সম্বলন প্রক্রিয়া একই ছিল। ইহলীলা সম্বরণের সময় দুজনেই ধ্যানে মগ্ন হয়ে সমাধিস্থ হয়েছিলেন এবং ভক্তদের সেই সময়ে গীত পদ গাইতে  নির্দেশ দিয়েছিলেন। দুজনেই ছিলেন সমসাময়িক মহাপুরুষ এবং এক জটিল রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে জন্মগ্রহণ করা ব্যক্তি। সেই সময়ের রাজ শক্তি এবং রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে প্রগতিশীল সমাজবাদী সাম্যবাদী চিন্তাধারার প্রচার প্রসার করা সহজ ছিল না সময়ে সময়ে তাদের ভয়ঙ্কর প্রত্যাখ্যানের সম্মুখীন হতে হয়েছিল কিন্তু নিজের দৃঢ়তা, সততা এবং ঈশ্বরের প্রতি সুগভীর ভক্তি দুজনকে এই ধরনের প্রস্তাবগুলির সামনে  অবহেলায় মুখোমুখি হওয়ার সাহস জুগিয়েছিল এবং তাদের এই সাহস, সমাজমুখিতা জীবনকালে দু'জনকেই সার্বজনীনভাবে শ্রদ্ধেয় এবং কিংবদন্তি পুরুষ হিসেবে  গড়ে তুলেছিল। আজকের দিনে এই মহাপুরুষদের শিক্ষা সমাজের জন্য পাথেয় হয়ে রয়েছে।