BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

ক্যালাইডোস্কোপ

Bartalipi, বার্তালিপি, ক্যালাইডোস্কোপ

                     ।।৮।।

                       স্মৃতি 


বাইরে কি বৃষ্টি হচ্ছে ? যেন অতিদূরে, কোথাও, আকাশ-ভাঙা বৃষ্টিতে ধুয়ে, ঝাপসা হয়ে আসছে গাছপালা, ঘরদোর, কাচা-ভাঙা পথ, ঝাউ গাছ ও দেবদারু বীথি, বড়ই গাছ, সবুজ কচি লেবু পাতা, কলা বাগান, সুপুরির বন, হাওরের জলে ভেসে চলা শূন্য নৌকা, যে হাওর তখন উথাল-পাথাল, ঢেউয়ে-ঢেউয়ে অস্থির,উত্তাল ,আর হিজলের গাছগুলো, হাওরের জলে দাঁড়িয়ে মাথা নেড়ে চলেছে অবিরত। বাস্তবিকই, ঝাপুস বৃষ্টিতে আমি দেখেছিলাম, চারচর, এরকম ঝাপসা হয়ে আসতে ; ধলাই গিয়েছিলাম পার্টির কাজে। আচমকাই আসে বৃষ্টি। একটি অচেনা বাড়ির মাটির দাওয়ায় বসে প্রত্যক্ষ করি আমি, বৃষ্টির তুমুল উচ্ছ্বাসে, কিরকম ঝাপসা হয়ে এলো আদিগন্ত ধলাই গ্রাম। যতটুকু দূরে চোখ যায়, যেন নন্দলাল বসুর আঁকা জলরঙ ছবি, স্নিগ্ধ, স্মিত,প্রকৃতির সেই স্বরচিত ছবিখানি, দেখেছিলাম আমি।

গৃহস্থ আমাকে এক বাটি নুন-চা, আর সঙ্গে মুড়ি দিয়েছিলেন। এইসব অলৌকিক দৃশ্য দেখে না যারা, জন্মান্ধ,চির বঞ্চিত তারা। বৃষ্টি তো হচ্ছে না ! টিনের চালে কোনও শব্দ নেই। বৃষ্টি হলেই, এমন শব্দ মন আমার আবিষ্ট করে ফেলে। তবে এটা ফ্যানেরই শব্দ। বনবন করে ঘুরে চলেছে। এবার নভেম্বরের শুরুতেই, হিম পড়ে গেল। আমি প্রবল শীত-কাতুরে। এই নিয়ে স্বাতী কত ঠাট্টা করে। আমি এখনই কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুই। দাদা শুধু বেডকভার নিয়ে শোয়, যদি ঠাণ্ডা লাগে ভোরে, গায়ে দেবে। ওটা ওর পাশে লম্বালম্বি ভাঁজ করা থাকে। যাতে, ভোরের ঘুম চোখে, চোখের পাতা না খুলেই, টেনে নিতে পারে চাদরখানা। তবু ওকে ফ্যান চালিয়ে ঘুমোতেই হবে। এটা চলবে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ অবধি। আবহাওয়া বদলে গেছে। হিম-লাগা শীতের পরিধি ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে দ্রুত। অথচ আমার মনে আছে, লেপের নিচে শুয়ে, রেডিওতে মহালয়া শুনেছিলাম। বাবার সেই ছোট্ট হাত রেডিও। মহালয়ার আগের দিন বাবা নতুন ব্যাটারি কিনে আনতেন। এভারেডি । নতুন ব্যাটারি লাগিয়ে, মাথার বালিশের পাশে, ছোট্ট টুলে, যেটায় তাঁর পেতলের জলের গ্লাস থাকত, প্লেট দিয়ে ঢাকা, আর থাকত হাত ঘড়ি,ফেভরল্যুবা, এক খুড়তুতো দাদা ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি পেয়ে , বাবাকে উপহার দিয়েছিল। বড় যত্ন করতেন ঘড়িটাকে। হাত থেকে খুলে শুকনো কাপড় দিয়ে মুছতেন। সুইস ঘড়ি। আমরা বলতাম, ফেভারলুভা। সেই ছোট্ট টুলের উপর থাকত একটা গোল মত এলার্ম ঘড়ি। ওটার মাথায় গোল একটা বোতাম ছিল। এলার্ম বন্ধ করতে হলে, ঘড়ির মাথায় লাগানো বোতামে, থাবা মারতে হত। ছোটবেলা এলার্ম বাজিয়ে ওটার মাথায় জোরে থাবা মারা ছিল আমার প্রিয় খেলা। তখন আমরা ছোট ছিলাম। এলার্ম ঘড়ির প্রয়োজন কালেভদ্রে পড়ত। বাবা তাই ওটা আলমারির উপর উঠিয়ে রাখলেন, আমার নাগালের বাইরে। কিন্তু বাবা স্কুলে চলে গেলে , আমি মায়ের আঁচল ধরে কান্না জুড়ে দিতাম, ঘড়িটা নামিয়ে দেবার জন্য। ওই বয়স থেকেই আমি ছিলাম প্রচণ্ড নাছোড়বান্দা ; আর যতক্ষণ না ঘড়ি হাতে পাচ্ছি, ক্রমাগত কেঁদেই চলতাম, কেঁদেই চলতাম। আমার মায়ের মতো সহনশীল নারীও, অতিষ্ঠ হয়ে ঘড়িটা নামিয়ে দিতেন। আরা বাবা আসার আগে, ওটা জায়গামত তুলে রাখতেন। এটা ছিল মা আর আমার মধ্যে একটা নীরব বোঝাপড়া।

একদিন এলার্ম দেবার চাবিটাই ভেঙে ফেললাম। মা সেদিন খুব ভয় পেয়েছিলেন। বাবা কিন্তু সব বুঝেও আমাকে কিছু বলেননি। ঘড়িটা সারাতে দিলেন। তারপর এনে, আলমারিতে তালা মেরে রেখে দিলেন। যেদিন এলার্ম দেবার প্রয়োজন হতো, সেদিন বের করতেন আলমারি খুলে। সেই ঘড়িটা আজ আর কোথায়, ঘরের কোন ঘুপচিতে পড়ে আছে, জানি না। সময়ের মত ঘড়িও হারিয়ে যায়।

দাদা অকাতরে ঘুমোচ্ছে। আমার কেন যে ঘুম আসছে না আজ।  এতোল-বেতোল কি সব ভাবছি। আবার শীত লাগছে আমার। শীত লাগলেই আমার মনে পড়ে যায়, স্বাতীর সেই হাসি, যা সে হেসেছিল আমার মাথায় মাঙ্কি টুপি দেখে। একা পেলে ওকে ডাকি, স্বাতীফুল। আমার মনে হয়, এটাই প্রকৃত নাম ওর। আকাশের নক্ষত্র যেন নেমে আসে, মাটির উপর। এই সময় প্রচুর ফুল ফোটে আমাদের বাড়িতে। মায়ের একটাই শখ,বিলাসিতা,-- ফুল গাছ লাগানো। যার বাড়িতে যে ফুল দেখেন, একটা চারা এনে লাগান। গোবর দেন। জল দেন। চারপাশে মাটি খুঁড়ে দেন। মা'র কোনও খুরপি নেই। একটা পুরনো রান্নার ছেনি দিয়ে মাটি খোঁড়েন। খুব সুন্দর করে , বাগান করেন। যখন ফুল ফোটে, মায়ের মুখ আলো করা হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আমাদের সকলকে ডেকে ডেকে দেখান, আয়, দেখে যা, জুঁইটা ফুটেছে। দেখে যা, গাঁদা ফুটেছে। মল্লিকা ফুটেছে। শুধু শিউলি ফুটলে দেখাতেন না। ওর সৌরভে সারা উঠোন ম ম করত।

মা'কে দেখেছিলাম, এক ভরা জ্যোৎস্না রাতে, ফুলে ভেসে থাকা শিউলি গাছটার দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে আছেন। সারাদিন সংসারের কাজ করে, ফুল গাছের পরিচর্যা করাটা, মায়ের চূড়ান্ত বিনোদন। কিছু না করার থাকলেও, কোনও একটা গাছের পাতা বা ডাল ছুঁয়ে দেখতেন। যেন আদর করে কুশল জিজ্ঞেস করছেন। মায়ের বিশ্বাস, গাছ বা ফুলকে ছুঁলে, ওরা অনুভব করতে পারে, সেই স্পর্শ,ভালবাসা,-- যে তাকে পরিচর্যা করে। সত্যিই কি ফুল বোঝে, ভালবাসা ? একদিন ছুঁয়েছিলাম, আঙুল। তর্জনী দিয়ে, আরেক গহীন তর্জনী। সরে যায়নি, তর্জনী। শুধু গভীর হয়েছিল, মধ্যবর্তী নীরবতা। যেন নিঃশ্বাসের শব্দও শোনা যাবে। অথবা থেমে গেছে, সমস্ত পৃথিবীর তীব্র কোলাহল। জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে, পাশের বাড়ির পুকুরের জলে, স্ট্রিট লাইটের হলুদ আলোর প্রতিবিম্ব, যা বাতাসে কেঁপে কেঁপে ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে।  (ক্রমশ)