BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

ক্যালাইডোস্কোপ

Bartalipi, বার্তালিপি, ক্যালাইডোস্কোপ

                   I।৭।।


           একটি নতুন অভিজ্ঞতা



বাবলুর পোস্টকার্ড এল। নতুন কলেজ খুব ভাল লাগছে। গুয়াহাটি টইটই করে ঘুরছে। দিপু কখনও গুয়াহাটি যায়নি। শুনেছে খুব বড় শহর। শিলচরের চেয়ে অনেক বড়। অনেক নতুন বন্ধু হয়েছে। ও এখন অনেকটা অসমিয়া শিখে নিয়েছে। দিপু স্কুলে বাধ্য হয়ে অসমিয়া বই পড়েছিল ঠিকই। কিন্তু বলতে পারে না। বাবলু ওকে অনেক পিছনে ফেলে এগিয়ে গেছে।  বাবলু মিশুকে। ওর বন্ধু জোটাই স্বাভাবিক।বাবলুর চিঠিতে কত জায়গার নাম,- ফ্যান্সি বাজার, পল্টন বাজার, লাখটকিয়া, ভরালিমুখ। ওখানে সে সিটিবাসে কলেজ যায়। ও থাকে গোসাবায়। বেশ কিছুদিন কেটেছে নানা জায়গা ঘুরে। উমানন্দ শিব বাড়িও ঘুরে এসেছে। মাঝে এক শনিবার কলেজ বন্ধ ছিল। অরূপ কলিতা বলে  এক সহপাঠীর সঙ্গে ঘুরে এসেছে কাজিরাঙা অভয়ারণ্য। বাঙালি ছেলেদের নাম অরূপ হয়। কিন্তু কলিতা টাইটেলটা এই প্রথম জানল দিপু। একটা চিঠিতে বাবলু লিখেছে, বেড়াতে তার ভালো লাগে। তার মধ্যে যে একটা ভ্রমণ-পিপাসু মন আছে, আগে তা অনুভব করেনি। আসলে, স্কুলের শৃঙ্খল যতদিন ছিল, ততদিন , মন ডানা মেলতে পারেনি, স্বাধীন ইচ্ছার আকাশে। কলেজের অর্থ যে মহাবিদ্যালয়, সেটা দিপুও আজ অনুভব করতে পারছে, তার নিজের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। বাবলুর চিঠি থেকে বোঝা যাচ্ছে, ওর এখন এক দঙ্গল বন্ধু- বান্ধব । কেউ বেজবরুয়া, যেমন গৌরব বেজবরুয়া, রাজেশ তামুলি, দীপেন গোঁহাই। এই টাইটেল গুলো আগে জানত না দিপু। কিন্তু নামগুলো বেশ বাঙালি-বাঙালি।বাবলুর অধিকাংশ বন্ধুই এখন অসমিয়া।  ওর চিঠি পড়লে বোঝা যায়, ও একটা নতুন দুনিয়ার, স্বপ্নের মত দুনিয়ার ঠিকানা পেয়ে গেছে। যত দিন যেতে লাগল, বাবলুর চিঠির সংখ্যাও কমে আসতে লাগল। দিপু ভাবে, হয়তো, পড়ার কত চাপে। শেষে নববর্ষ, আর বিজয়ার শুভেচ্ছার চিঠিতে এসে থামল। দিপু, যদিও মিশুকে নয়, তবু , তারও কিছু নতুন বন্ধু হয়ে গেছে। পড়ার চাপও বাড়ছে। কলেজে একটা লাইব্রেরি আছে। কত বই। রেল ইনস্টিটিউটের লাইব্রেরির থেকে অনেক বড়। কার্ড দিয়ে দুটো বই নেওয়া যায়। ক্যাটালগ দেখে বই নিতে হয়। দিপুর আকর্ষণ সাহিত্যে। কিছু লেখকের নাম তো স্কুলপাঠ্য বইয়ের সুবাদে জানা যায়। কিন্তু এর বাইরে যে আরো লেখকের নাম যে সে জানত না, বুঝতে পারল , কলেজের বইয়ের ক্যাটালগ দেখার পর। একদিন তো শুধু নাম পড়েই কাটিয়ে দিল। সারি সারি কাচের পাল্লা দেওয়া আলমারিতে বই রাখা আছে। কাগজে বইয়ের নাম, আর একটা নাম্বার লিখে জমা দিলে, তাও দুপুর দু’টোর মধ্যে, পরের দিন বই পাওয়া যায়। চটইদা, নামটা অন্যদের মুখ থেকে শোনা, বেঁটে খাটো, রোগা-পাতলা, মজার মানুষ, উঁচু টুলে চড়ে, আলমারি থেকে বই নামান। কিন্তু ভেতরে ঢোকা বারণ। একদিন ক্যাটালগ দেখছে মন দিয়ে, এমন সময় , কে যেন পাশ থেকে বলল, এই বইটা পড়েছ , বলে আঙুল দিয়ে বইয়ের নামটা দেখাল। লেখকের নাম অজানা, বইয়ের নাম ‘তপস্বী ও তরঙ্গিণী’, লেখক বুদ্ধদেব বসু। দিপু ছেলেটার দিকে তাকায়। ওরই মামার বাড়ীর ওদিকে থাকে। দিপু বইটার রিকুইজিশন দিল। ওর নাম সারথি দত্তগুপ্ত। বাড়ি নূতন পট্টি। যেভাবে বইটার কথা বলল, লেখকের সম্পর্কে বলল, বোঝা যায়, পড়ুয়া ছেলে। ঢ্যাঙা মত লম্বা, এই বয়সেই মাথায় চুল কম। প্রচুর কথা বলে। ওর অনেক কথাই নতুন লাগে দিপুর। এসব নিয়ে ,আগে কখনো ওর কথা হয়নি কারো সাথে। তবে বইয়ে পড়েছে। সেই প্রথম আলাপেই, সারথির সাথে সম্পর্কটা জমে গেল দিপুর। ভালো লেগে গেল সারথিকে। দিপুর মামার বেশ নামডাক আছে। নাম বলতেই সারথি চিনে গেল। সারথিই বলল, রোববারে ডিস্ট্রিক্ট লাইব্রেরি নিয়ে যাবে। ও প্রতি রোববার যায়।  প্রথম দিন ডিস্ট্রিক্ট লাইব্রেরি  ঢুকেই, মনে মনে বদরপুরের ইনস্টিটিউট লাইব্রেরির সাথে তুলনা করতে লাগল। তিনগুণ বই এখানে। কত পাঠক। অথচ চারদিক নিঃশব্দ। অথচ ইনস্টিটিউট লাইব্রেরিতে খুব চেঁচামেচি হত। কেউ ক্যারম খেলছে। কেউ গল্প করছে। এখানে সবাই নিঃশব্দে পড়ছে। দিপুর অবস্থা বুভুক্ষু মানুষকে প্রচুর খাবারের সামনে ছেড়ে দিলে যেমন হয়, তেমনি। কত রচনাবলী, যাদের একটা লেখা বাংলা পাঠ্য বইয়ে থাকত, তাঁদের। সারথি ওর হাতে তুলে দিল একটা রচনাবলীর খণ্ড। প্লাস্টিকের মলাট দেওয়া, পরে জেনেছে, ওটাকে বলে জ্যাকেট, বই আগে দেখেনি। সবুজ কভার। উপরে লেখকের হাতের লেখা নাম। সৈয়দ মুজতবা আলী। প্রথম লেখাতেই মজে গেল দিপু। আগে তো পড়া দূরে থাক, নামই শোনেনি। সাতটায় বন্ধ হয় লাইব্রেরি। বইটা তাকে রেখে, হেঁটে চলল মামার বাড়ি। দু’গলি আগে নেমে গেল সারথি। সোমবারে দেখা হবে ওর সাথে। মাথায় ঘুরছেন মুজতবা আলী।

সোমবার কলেজে হুলুস্থুল। কলেজ মজলিশ নির্বাচন হবে। শনিবারেও শান্ত ছিল কলেজের পরিবেশ। একদিনের ব্যবধানে বদলে গেছে, পুরো পরিবেশ। একদল ছেলে, এরা অনেকেই কলেজের নয়, শ্লোগান দিতে দিতে কলেজে ঢুকল। শ্লোগানটা চেনা। ইনকিলাব জিন্দাবাদ। লাল সেলাম,- এটাও শোনা। বদরপুরে থাকতে প্রায়ই শুনত। শ্লোগান দিয়ে দলটা গোটা কলেজ চত্বর ঘুরল। এরপর ক্লাসে ক্লাসে ঢুকল। ক্লাস তো বন্ধ হয়নি। একটা ক্লাস শেষ হয়, আর পরের ক্লাসের স্যার আসার ফাঁকে ওরা ঢোকে। দিপুদের ক্লাসেও ওরা এল। মনে মনে এই মুহূর্তটার জন্যই যেন প্রতীক্ষায় ছিল দিপু। কেন ছিল, হয়তো জানে না। স্রেফ কৌতূহল থেকেও হতে পারে। স্কুলে তো এসব দেখেনি। কলেজে যে নির্বাচন হয়, তাও আবার অনেকটা সাধারণ নির্বাচনের মত, জানতই না। তাও আবার রাজনৈতিক দলের মত শ্লোগান দেওয়া, একেবারে অভাবিত। নাকি ওর চেনা স্লোগানগুলো ওকে উৎসুক করে তুলেছিল, মন চাইছিল,ওদের ভালো করে দেখতে ? রক্তে কি অজানা কোলাহল জেগেছিল অজান্তে ? 

  যে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে স্যারেরা লেকচার দেন, ওখান থেকে কয়েকজন ছেলে উঠে দাঁড়াল। ওদের মধ্যে একজন দেখামাত্রই চোখ টেনে নেয় চুম্বকের মত। ফর্সা, লম্বা কোঁকড়া চুল দাড়ি, উজ্জ্বল মায়াময় চোখ। একজন পরিচয় করিয়ে দিল। জরুরী অবস্থায় জেলে ছিল। শোনামাত্র দিপুর রক্তে আবেগের কলরোল শুরু হয়ে গেল।  এইসবই ওর চেনা ঘটনা। জরুরী অবস্থায় বাবার সহকর্মীদের কাউকে কাউকে, যারা ওর খুব কাছের, কাকু-জেঠু  বলে ডাকে, ওদের পুলিশ জেলে নিয়ে গেছে। সেই মানুষটি এবার বলতে শুরু করলেন। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সেই  কথাগুলো শুনছে গোটা ক্লাস। কথাগুলো নতুন কিছু নয়। আবার নতুনও। কিন্তু মানুষটার সহজ সরল কথা, দিপুর মন কেড়ে নিল। মানুষটার কথা শেষ হল ইনকিলাব জিন্দাবাদ, এস এফ আই জিন্দাবাদ স্লোগান দিয়ে। আর মানুষটার বলা শেষ হতেই, পাশের ছেলেরা শ্লোগান তুলল, ইনকিলাব জিন্দাবাদ, এস এফ আই জিন্দাবাদ, কমরেড অরূপ চৌধুরী লাল সেলাম। গোটা ক্লাস গমগম করছে। ওদের ক্লাসের কিছু ছেলেও সেই স্লোগানে গলা মেলালো। দেখতে দেখতে ওদের গলাতেও সংক্রমিত হচ্ছে শ্লোগান। দিপুও এই প্রথম গলা মেলালো রাজনৈতিক স্লোগানে। এই প্রথমবার সে উচ্চারণ করল, ইনকিলাব জিন্দাবাদ। ( ক্রমশ)