BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

বাংলামিডিয়াম (১২)

Bartalipi, বার্তালিপি, বাংলামিডিয়াম (১২)

অঞ্জনা নদীর তীরে একটি গ্ৰাম ছিল। গ্ৰামের নাম খঞ্জনা। সেখানে একটা পোড়ো মন্দির ছিল। মন্দিরটি জীর্ণ, ফাটল ধরা। সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল কুঞ্জবিহারী। সে অন্ধ, চোখে দেখতে পায় না। কাছে দূরে তার আত্মীয় স্বজন কেউ কোথাও নেই। থাকার মধ্যে একটা লেজকাটা কুকুর। সেটি কুঞ্জবিহারীর খুব ভক্ত। আর একটা জিনিস অবশ্য ছিল। একটা একতারা। সেটাকে বুকে চেপে ধরে সে গুনগুন করে গান গাইত। --খাওয়া পরা? ছিল। গঞ্জের জমিদার সঞ্জয় সেন (এই লাইনটা কি আপনার কানে রিনরিন করে উঠল? যদি ওঠে তবে একটু বাঁ পাশে সরে দাঁড়ান। কথা আছে।) তাকে দুবেলা দুমুঠো খেতে দেন। -- এই গল্প আমার বানানো নয়। সুয্যি ঠাকুর নিজে লিখে গেছেন। তিনি আরো লিখেছেন অন্ধ কানাইয়ের কথা। সে গান শুনিয়ে ভিক্ষা করে। এসবই সহজ পাঠ-এ আছে। আমার মতো যাঁরা বাংলামিডিয়ামে সহজ পাঠ পড়েছেন তাঁরা জানেন।
যাঁরা বাঁ পাশে সরে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের আগে ছেড়ে দিই। আপনারা বাড়ি গিয়ে দেয়াল আয়নায় নিজেদের কানের পিছনটা খেয়াল করে দেখবেন, ওখানে "বাঙালি" স্টাম্প মারা আছে। জ, ন- এর অনুপ্রাস যাহার কানে রিনরিনায়, তিনি বাঙালি না হইয়া যান না।
বাঙালি এত গান গায় কেন বলতে পারেন? এমনকি অঙ্ক পর্যন্ত শুভঙ্করী আর্যা গেয়ে মনে রাখে! কেন বলুনতো? আমি যা লিখি, শুনে লিখি। পড়ে লেখা কষ্টকর আর টুকে লেখা চোট্টামি। তাই শুনে লিখি। অগ্ৰজ কবির কাছে জানতে চাওয়ায় তিনি হাসতে হাসতে বললেন-- জাতি হিসেবে বাঙালির স্মৃতিশক্তি বড়ো দুর্বল, বুঝলে। তাই সুর দিয়ে মনে রাখে। সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু কানাই, যে কিনা অন্ধ, তারতো মনে রাখার কিছু নেই, সে কেন ভিক্ষাকালে গান করে? শুনেছি সাহিত্যিক কমলকুমার নাকি বলেছিলেন, শুধু হাতে চায় না, বিনিময়ে গান শোনায়। তা-ই বা সবসময় হচ্ছে কোথায়! সেই যে কুঞ্জবিহারী, সে গান গায় কেন? তারতো চাওয়ার কিছু নেই, মনে রাখবার কিছু আছে বলেও মনে হয় না। কী গায় কুঞ্জবিহারী? -- হরি দিনতো গেল সন্ধ্যা হলো পার করো আমারে? কেন যেন কিছুতেই বিশ্বাস হয় না। অন্ধের সন্ধ্যাবোধ থাকে যেন? তাছাড়া গানের বিনিয়োগে পরলোকে সুখের প্রত্যাশা কুঞ্জকে মানায় না। সে হয়ত খাঁচার ভিতর পাখির আসা-যাওয়াকেই সুরে সুরে ভাবত বসে বসে। নয়ত একলা নিতাইয়ের হরিনামে জগত মাতানোর আনন্দ স্মৃতিতে বিভোর গেয়ে চলত গুনগুনিয়ে। "পার করো, পার করো" বলে কাঁদুনি গাওয়া এক ধরনের কাঙালপনা। সেই যে একটা আধুনিক গান ছিল, বর্ষার গান, শুনলে পিত্তি জ্বলে যায়। " ওগো বৃষ্টি আমার চোখের পাতা ছুঁয়ো না/ আমার এত সাধের কান্নার জল ধুয়ো না/ সে যেন এসে ওগো দেখতে পারে/ তার বিরহে কেমন করে কেঁদেছি।" -- তোমার জন্য আমার হৃদয় কেঁদেছে, এই নাও সেই কান্না পাওয়া হৃদয়ের প্রত্যায়িত ফটোকপি। এবারতো ভালোবাসো। -- এমন ভালোবাসার গানের মরণ হয় না কেন গা?
বড্ড বেশি গান গায় বাঙালি। ছাদ পেটাতে পেটাতে গায়, নৌকা বাইতে বাইতে গায়, কোদাল চালাতে চালাতে গায়। গায়তো। ব্রতচারী। চল কোদাল চালাই/ ভুলে মানের বালাই/ ঝেড়ে অলস মেজাজ/ হবে শরীর ঝালাই। আমরা চাষ করি আনন্দে গায়, ধান পাহারায় হেই সামালহো গায়, আয়রে মোরা ফসল কাটি গাইতে গাইতে ধান কাটে, এমনকি ধান ভানতে ভানতে নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক শিবের গীত গায়। যাঁরা বিশ্বাস করেন --ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে, তাঁদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে, সেখানেও তারা ধান ভানতে শিবের গীত গান কি না? গান। একশো শতাংশ গান। সেখানেতো গান বাজনার অ্যাপয়েন্টেড স্টাফ রয়েছে। দেদার আয়োজন। মায় নারদ পর্যন্ত বীণা বাজিয়ে সু্রে সুরে চুকলি করেন।
কী গান পাগল জাত ভাবুন, বছরে তিরিশবার চিত্রাঙ্গদা আর শ্যামা-শাপমোচনের অশ্রুমোচনে তিতিবিরক্ত হয়ে যিনি ভেংচি গীতি শুনিয়েছিলেন তিনিই কিনা বিচার হলে গান শুনানি হোক দাবি করলেন।
সত্যিই জানি না লালন শুনে ভাসে কেন বুকের আঙিনা, জানি না এ পৃথিবীর ঘাতকরা গান শোনে কিনা। জানি না জাতীয় সংগীতের জয় হে জয় হে পর্বে কবি ঠাকুর ইচ্ছে করেই বাঙালির কীর্তনের হরি বোল হরি বোল-এর সুর গুঁজে গেছেন কি না! শুধু জানি বাংলা মিডিয়ামের ডাকাতেরা হা রে রে রে রে রে করে সুর তুলে ডাকাতি করতে যেত।
দ্বিজেনবাবু বলেছেন বাংলা মিডিয়ামে নাকি কুঞ্জে কুঞ্জে পাখি গান গায়। আর মিডিয়ামের সবাই নাকি পাখির গান শুনতে শুনতে জাগে শুনতে শুনতে ঘুমোয়। ডেপুটি সাহেবতো মাতৃ বন্দনায় আস্ত একখানা সংগীত মর্মর নির্মাণ করে ফেললেন। বাংলা মিডিয়ামে নাকি ঠাকুরের গানই দুই হাজারের বেশি। সৈন্যরাই বা বাদ যাবে কেন! দুখুমিঞা বাংলায় মার্চিং সং লিখলেন। এমনকি ইউরোপীয় ক্রমোজমের টানটান বাঙালি মাইকেল পর্যন্ত বাংলা মিডিয়ামে যুদ্ধ কাব্য লিখতে বসে অভ্যাসে গাইলেন মহাগীত।
বাংলা সিনেমা গান ছাড়া কল্পনা করা যায়? অসম্ভব। রায়বাহাদুরের সিনেমায় গান নেই গেল গেল রব উঠেছিল, হীরক রাজার আখ্যানে একত্রে বারো খানা জুড়ে দিয়ে মান রাখতে হয়েছিল, মনে নেই? নেই যদি রায়বাহাদুরি সিঁড়ি বেয়ে একধাপ উঠে গিয়ে ভীষ্মলোচন শুনে নিন।
প্রকৃতার্থেই আমরা গানের গুঁতোয় আক্রান্ত। নাকি কমবেশি গোটা উপমহাদেশটাই? হতে পারে, তবে গীতগোবিন্দজাত বাংলা মিডিয়াম যেন একটু বেশিই গান পাগল। বাহু তোলা চৈতন্য বাঙালির আইকন। সংকীর্তন শিরদাঁড়া। অস্বীকারের উপায় কী? (ক্রমশ)
(লেখক টংলা কলেজের বাংলার অধ্যাপক)