BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

ক্যালাইডোস্কোপ

Bartalipi, বার্তালিপি, ক্যালাইডোস্কোপ

স্মৃতি

 

দিনগুলো মাঝেমাঝে কিরকম যেন আবছায়াতে ভরে যায়। তখন সবকিছু বোধের আড়ালে চলে যায়। সম্পর্ক, মানুষ, চেনা হাত, কমলা রঙের আঁচল, চোখ,--সব কিছু জটিল ধাঁধার মতন মনে হয় শুধু।  সমস্ত পথের মুখে আগল পড়ে থাকে। গোলকধাঁধার ভিতর, ঘুরে ঘুরে ক্লান্তি আসে।অবসন্ন বোধ হয়, নিভে যায় চেতনার আলো। অনেক রাত অবধি ঘুম আসে না। ধরা যাক, প্রবল গ্রীষ্ম। টিনের চালের গরম, সিলিং ফ্যানের হাওয়ায়,সমস্ত শরীরে, আরও তপ্ত হলকা ছুঁইয়ে দিচ্ছে। গ্রীষ্মের একটি অনবদ্য বিবরণ লিখেছিলেন বুদ্ধদেব বসু। এক গ্রীষ্মে দুই কবি প্রবন্ধে। বাইরে কাক ডেকে উঠল। পূর্ণিমার রাতে , কখনো শোনা যায় কাকের ডাক।  আগে কত রাতচরা পাখি ছিল। এখন সেসব নেই। কুউউহ,কুউউহ তীক্ষ্ণ সুরে, এক রকম পাখি ডাকত। সম্ভবত, কোনো প্রজাতির প্যাঁচাই হবে হয়তো। ডাক শুনলে, কেঁপে উঠত বুক। মা আগুন জ্বেলে  সর্ষদানা পোড়াতেন। ওটা ডাকলে নাকি অমঙ্গল আসে। শূন্য রাস্তা দিয়ে একটা গাড়ী প্রচণ্ড গতিতে চলে গেল। পাশের খাটে দাদা ঘুমোচ্ছে অঘোরে।  খাট না বলে, চৌকি বলাই ভালো। খাট বললে যে ছবিটা মনে ভেসে আসে, এর সাথে দাদার খাটের কোনো সাদৃশ্য নেই। সদরঘাটে সস্তার কাঠ চিঁরে, পেরেক ঠুকে বানানো চারপেয়ে খাট। মাশারি লাগানোর খুঁটি নেই। আর এইসব খাটে কোনো বার্নিশ থাকে নাকয়েক মাস পর পেরেক গুলো ঢিলে হয়ে গেলে, খাট নড়ে ওঠে, বসলে বা শুতে গেলে। আমার খাট অবশ্য পুরনো। দাদুর আমলের। প্রতি বছর বাবা মিস্ত্রি ডেকে বাড়ীর সব আসবাবের সাথে, এই খাটও বার্নিশ করান। দাদার অবশ্য খাট নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই। সেটা আমাদের বাড়ীর পারম্পরিক সহবৎ বোধ। বড়রা ছোটদের জন্য ত্যাগ করবে। আমাদের বাড়ীর অনেক শরিক। দাদু কোন খেয়ালে , কে জানে, কলকাতার পাশে বারাসতে এক লপ্তে সস্তায় অনেকটা জমি কিনে ফেলেছিলেন। সেই বসতবাটিতে আমার কাকা-জ্যাঠারা চলে যান। দাদুর এক ভাই স্বদেশী রাজনীতি করতেন। জেল খাটেন। জেল থেকে যখন বেরোলেন, তখন তিনি কম্যুনিস্ট হয়ে গেছেন। কম্যুনিস্ট পার্টি তাঁকে  পশ্চিমবঙ্গে কাজ করতে পাঠিয়ে দেয়। পার্টির কাজের ফাঁকে, পড়াশোনা করে বি এ পাশও করেন। আমরা তাঁকে বড় দাদু ডাকতাম। সেই দাদুও কলকাতায় বসত গড়েন। হয়তো বড় দাদুর টানেই আমার ঠাকুর্দা কলকাতায় একটা বসত গড়েন। আমার বাবারা পাঁচ ভাই, এক বোন। জ্যাঠা-কাকারা পড়ার জন্য কলকাতা গিয়েছিলেন। বাবা সবার ছোট। দাদু বাবাকে কলকাতা যেতে দেননি। সে নিয়ে  বাবার দুঃখ আজও যায়নি। কলকাতায় পড়ার সময় , বড় দাদু ছিলেন ওদের অভিভাবক। বড় দাদু মাঝেমধ্যে আমাদের শিলচরের বাড়ীতে আসতেন। তবে সেটা পার্টির কাজে। খুব আমুদে মানুষ ছিলেন। আমার চোখে বড় দাদু মহানায়ক। স্বদেশী করেছেন, জেল খেটেছেন।বড় হয়ে যখন পথের দাবীপড়ি, বড় দাদু তখন আর নেই, আমার মনে ভেসে উঠত , বড় দাদুর মুখটা। স্বদেশী আন্দোলনের ইতিহাসের প্রতি আমার যে দুর্মর আকর্ষণ, তা বোধহয় বড় দাদুর প্রতি টান থেকেই । বুঝতে চাইতাম , কেমন ছিল ওদের সময়টা। কেন একজন মানুষ , আর দশজন মানুষের মত, সংসারের সাধ আহ্লাদে ভেসে না গিয়ে, সন্ন্যাসীর মত, একটি দুর্গম , বন্ধুর পথে হেঁটে গেলেন, সারাটা জীবন। দেখেছি, বড় ঠাকুমা, জ্যাঠারা খুব সাধারণ জীবন যাপন করে গেছেন। বড় দাদুর দিকের বড় জ্যাঠা, পারিবারিক রাজনীতির সুবাদে, বামপন্থী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ট্রেড ইউনিয়ন করতেন। কিন্তু জীবন ছিল বড় সাদামাটা। ক্ষমতা , রাষ্ট্রশক্তি, কিছুই বদলাতে পারেনি বড় জ্যাঠাকে। জ্যাঠা কোনোদিন রাষ্ট্র শক্তির ক্ষমতার কাছে, হাত পেতে, ভিক্ষা নিতে পারেননি। জ্যাঠার দল ক্ষমতায় এসেছিল। দলের উপরতলা থেকে, দলের সাধারণ ক্যাডার, সকলকেই চিনতেন। তবু জ্যাঠা , দলের অধিকৃত রাষ্ট্র-ক্ষমতার বলয়কে অস্বীকার করে, নিজের চারপাশে, আরেকটা অলঙ্ঘনীয় বলয় তৈরি করে নিয়েছিলেন। সেটা ভেদ করে জাগতিক চাওয়া-পাওয়ার সহজ লালসা, তাঁর মনে বাসা বাঁধতে পারেনি। আমার জ্যাঠতুতো দাদারা সেই অর্থে অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত জীবনই যাপন করে আজও। কোনো ছেলের জন্য চাকরীর উমেদারী করেননি দলের নেতাদের কাছে। আজ বুঝি, আমাদের বংশধারায় তীব্র আত্মসম্মানবোধের পরম্পরা, বাহিত হয়ে চলেছে। অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়ানো আমাদের ধাতে নেই। আর তাই জন্যই বাবা , সরকারী আদেশের প্রতিবাদে বিনা বেতনে , দীর্ঘ পনেরো মাস আদালতে কেস লড়েছিলেন, সেই অন্যায় সরকারী আদেশের বিরুদ্ধে। বাবার কাছের মানুষরা বুঝিয়েছিল, এসব করো না। যদি চাকরী চলে যায়। বাবা নীরবে হেসেছেন। চলে গেলে চলে যাবে। এদিকে ঘরে নাই টাকা। বাবা চললেন, কলকাতা। যাবার আগে আমাকে বলে গেলেন, পূর্ণ পালের দোকানে বলা আছে। যা চালডাল লাগবে, যেন বাবার নাম করে নিয়ে আসি। ইটখোলার এক শব্জিওয়ালা বাবার ছাত্র। আমাকে নিয়ে গিয়ে ওর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। বাকী বন্দোবস্তমাছওয়ালার সাথে পরিচয় হল। সেখানেও বাকী বন্দোবস্ত। তখন তো জানতাম না, বাবা ফিরবেন কোর্টের রায় বেরনোর পর, পনেরো মাস কলকাতায় কাটিয়ে।

ঘুম তো আসছেই না। এই রোগটা খুব সাম্প্রতিক। চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা কোমল সরু হাত, যে হাত ধরিনি কখনো। মনেমনে ধরেছি প্রতিদিন, দেখা হলেই। চশমার আড়ালে উজ্জ্বল দুটো চোখ। হাসিতে ঝর্নার কুলুকুলু ধ্বনি। মিঠু,আমার বন্ধু,তারই খুড়তুতো বোন। স্বাতী। বাংলাদেশ থেকে এসে এখানে ক্লাস এইটে ভর্তি হয়। অত্যন্ত মেধাবী। ওর আসল নাম ছিল, ভাস্বতী। এডমিট কার্ডে ভুলবশত ওর নাম হয়ে যায়, স্বাতী। ডাকনাম , ফুল। একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, কি ফুল ? ও বলে, তা তো জানিনা। সেই দিনটাতে ওকে , গাড় স্বরে ডেকেছিলাম, জুঁই। ও মর্মছোঁয়া চোখে তাকায় , আমার চোখে। পলকের মুহূর্তটি ভেঙে গেল, মিঠুর মা আসায়। তবু মুহূর্তটি ভেসে রইল , তরঙ্গের মত , ইথারে ইথারে। বুকের ভিতরে, স্মৃতির গহীনে। হানা দিচ্ছে, ঘা দিছে, রক্তাক্ত করে দিচ্ছে অন্তর-বাহিরআর নিভে যাচ্ছে, চেতনার আলো। আলো জ্বালাবার সুযোগ থাকলে, বই পড়া যেত। কাল বাবার টেবিল ল্যাম্পটা আনতে হবে। বাথরুমে গেলাম। চোখে মুখে জল দিলাম। বাইরে পূর্ণিমার আকাশ। নক্ষত্রে ভরা এক রাত। এর মাঝে কোনটার নাম, স্বাতী ?