BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

করোনাকালের ডায়েরি (৫)

Bartalipi, বার্তালিপি, করোনাকালের ডায়েরি (৫)

আজ দশটা না বাজতেই শুভর ঘরে দরজা খোলার শব্দ কানে এলো শেখরবাবুর। তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালেন তিনি! শুভর এত তাড়াতাড়ি ওঠার কারণ কী? নিশ্চয় শরীরে কোনো অসুবিধে হচ্ছে ওর। কাশিটা কি বাড়লো? শেখরবাবু এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে গিয়ে দাঁড়ালেন শুভর দরজার কাছে। ততক্ষণে শুভ ঘর থেকে বেরিয়ে মুখ ধোয়ার বেসিনের দিকে ক্ষীপ্র পায়ে হাঁটা ধরেছে আর চেঁচিয়ে বলছে, আমারে অখ্খনি বাইর হইতে হইব, চা হইলে দিয়া যাও...। মুহূর্তের মধ্যে বাড়িতে শোরগোল পড়ে গেল যেন। সবার আগে গলাটা শোনা গেল শ্যামলীর, ক্যান, কৈ যাবি অখন! শেখরবাবু স্বরে অনেকটা চাড় দিয়ে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন, সোয়াব টেস্ট করাইতে নেকি?

--- ধেৎ তেরিনা, গুলি মার তুমার সোয়াব টেস্ট, আমি অখন যামু আনন্দনগর, গৌতমের ঘরে...

ততক্ষণে মাধবী, সাগরিকা ওরাও কৌতূহলী চোখ নিয়ে এসে হাজির হয়ে গেছে।

শেখরবাবু রে রে করে বলে ওঠেন, কস কি শুভ এই সিচুয়েশনে যে কারো ঘরে যাইতে নাই তুই জানস না!!

সাগরিকাও ঠসুদ্দাকে সমর্থন করে।

শুভ দাঁত ব্রাশ শেষ করে কুলকুচি করতে করতে বলে ওঠে , গৌতম কানদো কানদো গলায় ফোন করছে...

--- ক্যান?

--- অর বাবা মারা গেছে...

সবার চোখ ছানাবড়া হয়ে ওঠে! শ্যামলী আঁতকে ওঠে, কস কি?

---- করোনায নেকি!

শেখরবাবুর গলায় উৎকন্ঠা।

--- না না কিডনির ট্রাবল আছিল। হাসপাতালেই মারা গেছেন।

--- ত, তুই কি করবি?

--- শ্মশানে যাইতে হইব...

--- ক্যান অর পাড়ায় মানুষ নাই নেকি, এত দূর থিক্যা তরে ডাকল, তর যাইতেই ত এক ঘন্টা লাইগ্যা যাইব...

--- পাড়ার মানুষ যাইতে চাইতাছে না...

--- ক্যা-ন??

সবার চোখেমুখে এই লম্বা প্রশ্ন।

--- হেরা ভাবতাছে গৌতমের বাবা করোনায় মারা গেছে...

--- বডি কৈ?

--- বডি ঘরেই আনছে। হাসপাতাল থিক্যা ছাইড়্যা দিছে। সার্টিফিকেটও দিছে নেগেটিভ বইলা, তবুও হেরা বিশ্বাস করে না...

--- কস কি, মানুষ সোস্যাল ডিসট্যান্স হইতে হইতে এতই সেলফফবিয়ায় ভুগতাছে যে, করোনায় মরা ছাড়া আর কুনো মরারে বিশ্বাস করে না!

--- তুমি ঠিক কইছো ঠাউদ্দা, শুধু ভয় না, মানুষ অমানবিকও হইয়া উঠতাছে। আমি ত হেইটা হইতে পারুম না, আমারে যাইতেই হইব, আমি না গেলে নাকি হে অর বাবার বডি লইয়া বইস্যাই থাকব...

শেষের এই কথাটা অত্যন্ত কাঁদো কাঁদো স্বরে বলতে বলতে শুভ ওর ঘরে চলে গেল। সংগে সংগে শেখরবাবুও শোবার ঘরে চলে গেলেন।

একটু বাদে মুখে মাস্ক পরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো শুভ। ওই মুহূর্তে অন্য পোশাকে শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন শেখরবাবুও। তাঁরও মুখে মাস্ক । তিনি বলে উঠলেন, শুভ আমিও তর লগে যামু চল...

শুভ হা করে তাকিয়ে রইল শেখরবাবুর দিকে, কও কি ঠাউদ্দা? ধামালি করতাছ নেকি!

--- না না ধামালি করতাছি না, হছা কইতাছি, আমি তর লগে যামু-যামু -যামুই...

শুভ ঠসুদ্দার এই নাছোড়বাব্দামি দেখে হেসে ফেলে, চল-অ চল-অ গৌতম খুশিই হইব...

--- আইচ্ছা তুমি উইখানে গিয়া কি করবা কও ত, আগের মতন বয়স আছে নাকি তুমার,  মাথা টাথা ঘুরাইয়া পড়বা...

শ্যামলীর এই উদ্বেগ দেখে শেখরবাবু হাসতে হাসতে বলে ওঠেন, তাইলে তুমিও আমাগ লগে চল-অ, আমি মাথা ঘুরাইয়া পল্লে তুমি ধরবা...

শুভ হাসে।

শ্যামলী হিস হিস করে ওঠে, ফাইজলামি করনের আর জাগা পাইলা না...

শেখরবাবু বীরদর্পে স্কুটির পেছনে গিয়ে বসেন। শুভ সবার সামনে দিয়ে স্কুটিটা চালিয়ে বেরিয়ে গেল। কেউ কিছুটি বলতে পারলো না। শুধু অসহায় তাকিয়ে রইলো ওদের যাওয়ার দিকে। শেখরবাবু মনে মনে ভাবতে থাকেন, গৌতমের এই কঠিন বিপদে দৈহিক ভাবে কিছু করে উঠতে না পারলেও ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ানো একান্ত জরুরি...।

শেখরবাবু আর শুভর শ্মশান থেকে ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে গেল। মাঝখানে হঠাৎ আকাশভাঙা বৃষ্টি হওয়াতে সৎকারে বিঘ্ন ঘটেছে ঘন্টাখানেক। শেখরবাবু চানটান সেরে যখন ঘরে এসে সোফায় বসলেন তখন সন্ধে নেমে গেছে। শ্যামলী চা নিয়ে এসে সামনে দাঁড়ালো।

--- খুব কষ্ট হইছে উইখানে না?

--- কষ্ট হইব ক্যান, গৌতম আমারে ত কিছুই করতে দেয় নাই, আমি বইয়া বইয়া শুধু অর্ডার দিছি, কাম ত করছে গৌতম, শুভ আর ওই ডোমটা, জগন্নাথ...

---হচাই তুমরা তিনজনই গেছিলা, আর কেউ যায় নাই!

শ্যামলীর কন্ঠে আক্কেল গুড়ুম হওয়ার ঝোঁক।

শেখরবাবু কোনো রা না করে হাঁ-সূচক মাথা নাড়াল শুধু। শ্যামলী শেখরবাবুর দিকে কিছুক্ষণ হা করে  তাকিয়ে থেকে কাঁপা কাঁপা ভীত গলায় বলে ওঠে, কী দিন আইল গ...

শ্যামলীর দু চোখ ভিজে ওঠে।

রাতের খাবার খেয়ে সবাই শুয়ে পড়েছে। শুভর ঘরে লাইট জ্বলছে। বোধ হয় শোয়নি। ও তো রাত জেগে স্টাডি করে। শ্যামলীর শেষ রাত। কিন্তু আজও শেখরবাবুর ঘুমগুলো যেন সব ধুয়েমুছে নিকেশ হয়ে গেছে। কেবল গৌতমের মৃত পিতার মুখচ্ছবিটা চোখের ওপর ভেসে উঠছে। মৃত্যু হলো অন্য রোগে অথচ লোকে তাঁকে সন্দেহ করেছে করোনায মৃত বলে। এমন কি তাঁর আত্মীয়স্বজনরাও পর্যন্ত! কী মর্মান্তিক! গৌতমের কান্নাভেজা মুখটাও বার বার ভেসে উঠছে তাঁর চোখের ওপর...। ছেলেটি সারাক্ষণই শুধু কেঁদেছে!

শেখরবাবু বেশিক্ষণ আর শুয়ে থাকতে পারলেন না। বিছানা থেকে নেমে পায়চারি করা শুরু করলেন। তাঁরও যদি এমন অবস্থা হয়! মাথায় যেন কোনো কাজ করছে না তাঁর। ইচ্ছে করে, শ্যামলীর ঠাকুরঘরে গিয়ে সিংহাসনের ওপর জোরে জোরে কপাল ঠোকেন!

এমন সমর অন্ধকারে তাঁর সামনে আরেকটি ছায়া এসে দাঁড়ালো।

--- কি হইল ঠাউদ্দা তুমি অখন-অ ঘুমাও নাই!

এ তো শুভর কন্ঠস্বর! শেখরবাবু চমকে ওঠেন, শুভ তুই! আইজ বুজি স্টাডি নাই?

--- আছে আছে, কিন্তু গৌতমের কথা ভাইব্যা ভাইব্যা স্টাডিতে মন বসতাছে না, তাই একটু বারান্দায় হাটতা ছিলাম, তুমারে দেইখ্যা আগাইয়া আইলাম... তুমার চুখেও ঘুম আইতাছে না তাই না ঠাউদ্দা?

---হ রে শুভ, কাইল থিক্যা রাইতে আমার ঘুম আহে না...

--- হইবই হইবই, পরিস্থির চাপ, আতংক, কু-ভাবনা... একটু আগে স্ট্যাটিসটিক্স দেখলাম, অখন সারা বিশ্বের প্রায় আদ্ধেক মানুষ ইনসমনিয়ায় ভুগতাছে, লগে লগে ঘুমের অসুধের কোম্পানিগুলি ডাবল লাফা লুটতাছে। দাঁড়াও আনতাছি...

বলতে বলতে শুভ চলে যায় ওর ঘরের দিকে। একটু বাদেই ফিরে আসে। তারপর শেখরবাবুর হাতে একটি ছোট্ট ট্যাবলেট দিতে দিতে বলে, লও ঠাউদ্দা, এই ট্যাবলেটটা খাইয়া শুইয়া পর ঘুম আইস্যা যাইব...

--- তুই ঘুমের অসুধ খাস!

শেখরবাবু চমকে উঠলেন।

--- হ ঠাউদ্দা খাই, কুনো কুনো দিন বেশি স্টাডিতে মাথায় বায়ু চইড়া যায়, কিছুতেই ঘুম আইতে চায় না, তখন খাই... কুনো ক্ষতি করে না... লাইট পাওয়ারের... রাইতে ঘুম না-হইতে না-হইতে অইন্য রুগে ধরব যে... যাও ঠাউদ্দা খাইয়া শুইয়া পর...

শেখরবাবু সুবোধবালকের মতো নাতির কথায় মজে গিয়ে ট্যাবলেটটা মুখে দিয়ে টেবিলে রাখা গেলাস থেকে একটু জল খেয়ে শুয়ে পড়েন।

এরপর ঘুম ভাঙে পরদিন সকালে। উঠেই দেখেন বিছানায় শ্যামলী নেই। পাশের ঘরগুলো থেকে সবার গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। রান্নাঘর থেকে টুংটাং শব্দ। শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগছে শেখরবাবুর আজ। রাত জেগে কারো কাশি-সর্দির শব্দ শুনতে হয়নি! এ রকম সকাল অনেক দিন পর পেলেন তিনি। বিছানা ছেড়ে বাইরে এসে বেসিনের কাজ সেরে প্রতিদিনকার অভ্যেস মতো সবার খোঁজ নিতে থাকলেন তিনি। দীপক বাথরুমে ঢুকেছে। ওর ব্যাংকে যাওয়ার তাড়া। সাগরিকা ওর ঘরে বসে ল্যাপটপ নিয়ে ব্যস্ত, ওর নাকি জনতা-সদনে আজ কিসের একটা ইন্টারভিউ আছে। বৃথাই খাটছে মেয়েটি! ওখানে বাঙালির চাকরি অসম্ভব। বরং বেইজ্জতি হতে হয় কিনা মেয়েটির ওটাই চিন্তার। দিসপুরই বা যাবে কী ভাবে ও! ও বলেছে বাসেই যাবে। কিন্তু, পাবলিক ট্রান্সপোর্টে তো উচিৎ হবেই না। ওগুলো প্রতিদিন ঠিক মতো সেনিটাইজ্ড করা হয় কিনা সন্দেহ। শুভকেই বলতে হবে ওকে স্কুটি করে পৌঁছে দিয়ে আসতে। নিয়ে আসতেও হবে। কিন্তু শুভর তো উঠতে দেরি হয়ে যায়। সাগরিকার ইন্টারভিউ দশটায়। নটার সময় রওনা দিতে হবে। শেখরবাবু তখনই সিদ্ধান্ত নিলেন তিনিই স্কুটি করে দিয়ে আসবেন নাতনিকে। সেটা তিনি জানিয়ে রাখলেন সাগরিকাকে। সাগরিকা হই হই করে ওঠে, ঠাউদ্দা, তুমি দেখি আইজকাইল অমিতাভ বচ্চন হয়ে উঠতাছ হি হি হি...

ওই মুহূর্তে রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে ওঠে শ্যামলী,

--- আইজকাইল তুমার ঘুম একটু বাড়ছে মনে হইতাছে... তুমি না কইছিলা, বুড়া হইয়া আইলে মানুষের ঘুম কইম্যা আহে, তুমার ঘুম বাল্ল ক্যান?

শেখরবাবু শ্যামলীর প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়ে লেখার ঘরে ঢুকে গেলেন। একটু বাদে মাধবী চা দিয়ে গেল। 


শেখরবাবু সাগরিকাকে দিসপুর জনতা-সদনের পরীক্ষাস্থলে পৌঁছে দিয়ে সেখানেই সদনের চত্বরের বাইরে ছাতিম গাছের ছায়ায় একটি  খোলা চায়ের দোকানে বসে ঘন্টা খানেক কাটিয়ে দেবেন বলে স্থির করলেন। কারণ, এ চত্বরে আর অন্য কোথাও একটু বসে সময় কাটানোর ঠাঁই চোখে পড়লো না। শেখরবাবু  দোকানীর সংগে গাঁজাখুড়ি আলাপ শুরু করে দিলেন। দোকানি অনেকবার চেষ্টা করেছিল তাঁর হাতে চায়ের গেলাস গুঁজে দিতে। কিন্ত শেখরবাবু বার বার এড়িয়ে গেছেন এই বলে যে, তিনি স্পেশাল চা ছাড়া অন্য কোনো চা খান না। দোকানি বানাচ্ছিল লাল চা। শেখরবাবু কিন্তু লাল চাই পছন্দ করেন। কিন্তু শেখরবাবুর কেন জানি বার বার মনে হচ্ছিল দোকানির শরীরে করোনা আছে। ব্যাটা মাস্ক পরেছে কিন্তু নাকমুখ ওর খোলা। মাস্কটা ঝুলছে ওর থুতনির নিচে। তবে এখনো পর্যন্ত ওকে কাশতে দেখেননি শেখরবাবু। কিন্তু জ্বরটর আছে কিনা এই চিন্তা তাঁকে ছিঁড়েফিরে খাচ্ছে। তিনি দোকানির থেকে তাঁর অবস্থানের দূরত্ব মাপলেন মনে মনে। হ্যাঁ, ঠিক আছে ছ ফুটই হবে। তবুও তাঁর মনে শান্তি বিঘ্নিত হচ্ছে বার বার। কি জানি, যদি...। আর ভাবতে পারেন না শেখরবাবু।  অথচ জনতা-সদনের  বাবুরা মাঝে মাঝেই  এখানে এসে চা খেয়ে যাচ্ছেন। মস্তি করছেন ওর সংগে।

এমন সময় সাগরিকা এসে হাজির। শেখরবাবু বাক্যহীন হয়ে তাকিয়ে রইলেন ওর দিকে! এত তাড়াতাড়ি! হাতঘড়ি দেখলেন। তারপর আবার ওই বিস্মিত চোখে তাকালেন সাগরিকার দিকে। দেখলেন, সাগরিকার মুখটা ভার। চোখ দুটো ছলছলে...।

-- ঠাউদ্দা, অক্ষনি চল-অ, আর এক মুহূর্ত থাকুম না ইখানে...

বলতে বলতে সাগরিকা দ্রুত পা চালিয়ে স্কুটির সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। শেখরবাবু কিছু বুঝে উঠতে পারেন না। অনেকটাই হতভম্ব হয়ে নাতনির হুকুম মেনে স্কুটিতে স্টার্ট দিয়ে দেন। সাগরিকা পেছনে বসে।

শেখরবাবু সাগরিকাকে নিয়ে বাড়িতে এসে পৌঁছলেন। তাঁদের আসার শব্দ শুনে শ্যামলী হন্তদন্ত হয়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো।

--- কী ওইল, এত্ত তাত্তাড়ি তুমরা চৈল্লা আইলা!

--- কী জানি, রিকার কী অইছে কে জানে...

কথাটা বলে শেখরবাবু নাতনি সাগরিকার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। সাগরিকা তখনও চেপে চেপে কাঁদছে। চোখ দুটো ফুলে উঠেছে। শ্যামলী খুব উদ্বিগ্ন চোখে নাতনির কাছে দৌড়ে আসে।

--- কী ওইছে গো শোনা আমার, শরিলটরিল খারাপ কল্ল নেকি!

বলতে বলতে সে সাগরিকার কপালে হাত দেয়। হাত দেওয়া মাত্র চেঁচিয়ে ওঠে শ্যামলী, ও মা গ,  রিকার শরিল জ্বরে পুইড়া যাইতাছে গ...

বলে হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকে শ্যামলী।

শেখরবাবু আঁতকে ওঠেন, কও কি!

ওরা দুজনে ধরাধরি করে সাগরিকাকে ভেতরে নিয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে বাড়ির ভেতর যেন তুমুল ঝড় উঠলো। শ্যামলী-মাধবীকে ছাপিয়ে শেখরবাবুর আতংকভরা গলাটাই চড়ে উঠছে। তিনি শুভর ঘরের দরজা ধাক্কিয়ে ধাক্কিয়ে ডাকছেন---

--- অই শুভ উঠ...

ভেতর থেকে শুভ ঘুমের ঘোরেই সাড়া দেয়, কী ওইল তুমি দিদিরে লইয়া যাইবা কৈছিলা না?

--- হ, গেছিলাম ত, ফিরাও আইছি, অর হঠাৎ জ্বর উঠছে...

শুভ ধরমর করে উঠে বসে, কার জ্বর উঠছে কইলা!

--- রিকার....

--- কও কি!

বলতে বলতে শুভ দরজা খুলে বেরিয়ে আসে।

ঘুম ঘুম চোখে সে খেই খুঁজে পাচ্ছে না কী করবে! অনেকটা কাঁদো কাঁদো গলায় জানতে চায়, অখন কী করুম কও ত ঠাউদ্দা, একটা প্যারাসিটামল খাওয়াইয়া দিলে হয় না?

শেখরবাবুর গলা দিয়ে স্বর বেরোতে চায় না যেন। সারা শরীর কাঁপছে তাঁর। ওই অবস্থায় তিনি বলেন, আগে অর টেস্ট করান দরকার, সোয়াব টেস্ট...

--- অ হ্যাঁ, ঠিক কইছ, দেখি কোভিড হেল্পলাইনে ফোন কইরা...

বলতে বলতে শুভ মোবাইলে নম্বর টেপা শুরু করে ---

ওপারে রিং হয় ---

--- হ্যালো...

--- আপনেরা কি কোভিড হেল্পলাইন কইতাছেন?

--- হয় হয়...

--- আমার দিদির ধুম জ্বর উঠছে...

--- কার জ্বর কলে?

--- আমার দিদির, মানে মোর ডাঙর ভনির...

--- অ এতিয়া ত হচপিটালত বেড খালি পোয়া মুচকিল, হোম আইসোলেশনত থাকিব লাগিব...

--- হেইটা ত বুঝলাম সোয়াব টেস্টটা আগে করাইতে হইব ত?

--- আপনার ওচরতে কোভিড টেস্টিং সেন্টার নাই নেকি?

--- ওচরতে নাই, বহুত দূরে, আপনার হেল্প লাগব, প্লিজ...

--- ঠিক আছে আপনার এড্রেসটু মেসেজ করি দিয়ক, আমার মানু যাব, চিন্তা করিব নে লাগে...

বলতে বলতে ওপারে মোবাইল বন্ধ করে দেয়।

একটু বাদেই অ্যামবুলেন্স করে এসে পড়ে স্বাস্থ্য কর্মীর লোক। ওদের সবার গায়ে পরা কিড-বর্ম। সাগরিকার নাকে স্ট্রিপ ঢুকিয়ে রেপিড টেস্ট করে ওরা। ফলাফল দেখা গেল নিগেটিভ। স্বাস্থ্যকর্মীর প্রধান যিনি, তিনি বলে উঠলেন, একো ন হয়, এনেয়ে নরমেল জ্বর, চিন্তার একো নাই... প্যারাসিটামল খোয়াই দিব, প্রয়োজন হলে এন্টি-বাইওটিক...

স্বাস্থ্যকর্মীরা আর বসে থাকে না। চলে যায়।

শ্যামলী আনমনে বলে ওঠে, তাইলে জ্বরটা ক্যান উঠলো?

সাগরিকা জ্বরের ঘোরে জবাব দেয়, হেরা না আমারে 'বিদেখি বঙাল' কইছে...

বলতে বলতে সে আবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে।

শেখরবাবু এতক্ষণে আবিষ্কার করতে পারলেন সাগরিকার জ্বরের উৎস।

তিনি গিয়ে বসলেন তাঁর লেখার ঘরে একটু জিরোবার জন্য। কিন্তু কী জিরোবেন! তাঁর শরীরেও বুঝি জ্বর আসছে। সাগরিকার ওই জ্বর। হু হু করে ধেয়ে আসছে কাঁপন।

এই জ্বরও খুব দ্রুত সংক্রমিত হয়...। শত টেস্টেও ধরা পড়ে না।

(পরবর্তী অংশ আগামী সপ্তাহে)