BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

বাংলামিডিয়াম (১১)

Bartalipi, বার্তালিপি, বাংলামিডিয়াম (১১)

মাঝে মাঝে ইস্কুলে যাই। ইংলিশ মিডিয়াম। যাই মূলত পান চিবুতে চিবুতে আড্ডা মারতে। অঙ্কের মাস্টার পানাসক্ত। দুজনেরই স্টকে যা থাকে তাতে অনায়াসে অতিথি আপ্যায়ন চলে। রবি বাবু মানে রবিশঙ্কর ভট্টাচার্য এ অঞ্চলে অঙ্কের বাঘা শিক্ষক। রসিক মানুষ। পড়াশোনা বাংলা মিডিয়ামে। ইংরেজিতে যথেষ্ট স্বচ্ছন্দ। সেদিন আড্ডা দিচ্ছি, এমন সময় জুনিয়র সেকশনের অঙ্কের মাস্টার ক্লাস সিক্সের এক ছাত্রকে নিয়ে উপস্থিত। তরুণ শিক্ষক ছাত্রটিকে নিয়ে সমস্যায় পড়েছেন। ছেলেটি কিছুতেই triangle, equilateral triangle, Isosceles triangle, scalene  triangleকে আলাদা ভাবে সংজ্ঞার সঙ্গে মিলিয়ে মনে রাখতে পারছে না। রবি বাবু বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, নাম কী? ছেলেটা ভয়ে ভয়ে জানাল, তপোব্রত সরকার। এবার রবি বাবু বাংলার দিদিমনিকে ডাকিয়ে এনে বললেন -- তপোব্রত দুদিন বাংলা ক্লাস করবে। আপনি ওকে ত্রিভুজ, সমবাহু ত্রিভুজ, সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ এবং বিষমবাহু ত্রিভুজের মানে বুঝিয়ে দেবেন। তপোব্রতকে বললেন -- তুমি দুদিন দিদিমনির কাছে বাংলা পড়বে, কেমন; দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। ছেলেটা কেমন যেন ভয় পেয়ে গেল। মিনমিন করে বলল -- কিন্তু আমি তো হিন্দি।

"আমি তো হিন্দি" বলে ছেলেটা বোঝাতে চেয়েছিল, ওর সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ বাংলা নয়, হিন্দি। সে যা হোক, সেদিন থেকে একটা প্রশ্ন আমার মাথায় ঘুরছে -- "সমবাহু ত্রিভুজ কাকে বলে?" এটা অঙ্কের প্রশ্ন, নাকি প্রশ্নটা বাংলার?

এই যাওয়া আসাটা স্বাস্থ্যকর। আজকাল মাল্টি ডিসিপ্লিনারি/ ইন্টার ডিসিপ্লিনারি নলেজের কথা চর্চিত। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে বাংলামিডিয়ামকে এর অন্তর্গত বলে স্বীকার করতে সিংহভাগই অসম্মত। প্রতিষ্ঠিত জনমত হলো, বাংলা মানেই গল্প কবিতা। প্রশ্ন বলতে ওই ধরা বাঁধা খানকয়েক-- সারমর্ম, নামকরণের সার্থকতা, নায়ক বিচার, সমাজচিত্র, নারী চরিত্র, সাহিত্যমূল্য, সন্ধি-সমাস-পদ পরিবর্তন- কারক বিভক্তি, প্রবন্ধ রচনা। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আম জনতার এই মানসগঠনে বাংলা মিডিয়ামই বহুলাংশে দায়ী। অথচ ভাষা সাহিত্যের মতো এমন দিগন্তজোড়া গমনাগমন অন্য ডিসিপ্লিনে কোথায়? ধ্বনি বিজ্ঞানের সম্যক ধারণা ছাড়া বর্ণপরিচয় পর্ব কতটা অসম্পূর্ণ সেকথা এই আলোচনার প্রথম তিনটি পর্বে সবিস্তারে বলা হয়েছে। ছন্দের স্ট্রাকচারাল নলেজ (যা মিউজিকের প্রাথমিক শিক্ষা, আর্কিটেকচারেরও নয় কি?) ছাড়া কবিতা বিশেষ করে ছড়ার শুদ্ধ পাঠ অসম্ভব। প্রতিটি শব্দ জাতির সামাজিক অর্থনৈতিক তথা রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতিবিম্ব যেন। একইরকম ভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রবাদ প্রবচনগুলি। এতো শুধু ভাষা শিক্ষার প্রাথমিক অধ্যায়। আর সাহিত্যের বাংলামিডিয়াম?

বৌদ্ধ যুগের সমাজ ইতিহাস এবং তন্ত্র সাধন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছ ধারণা ছাড়া চর্যাপদ-এর পাঠ অসম্ভব। মঙ্গলকাব্য পড়তে হলে অবশ্যই জানতে হবে সামন্ততান্ত্রিক ভারতবর্ষের কথা, অবশ্য তার আগে ভারতবর্ষে এরিয়ানাইজেশনের ফলশ্রুতিটাও বুঝে নিতে হবে। মাইকেলকে বুঝতে এনলাইটমেন্ট আর গফুর মিঞাকে বুঝতে শিল্প বিপ্লব জানা একান্ত আবশ্যক। চাইল্ড পেডাগগি ঘেঁটে ঢুকতে হবে লীলা মজুমদারে। প্রফেসর শঙ্কুকে সামলাতে ন্যূনতম বিজ্ঞান জানা চাই। ইন্ডিয়ান ফ্রিডম স্ট্রাগল মাথায় না নিয়ে গোরা, ঘরে বাইরে, জাগরীর পাতা না ওল্টানোই ভালো। পদ্মা নদীর মাঝি, আরণ্যক আর জগদীশ গুপ্তের গল্প কলনিয়ালিজম, ইকোলোজি এবং ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের আকর। তালিকা অনন্ত অবধি বর্ধিত হতে থাকবে তবু বাংলা মিডিয়ামের কপালে উপেক্ষার উল্কি বিন্দুমাত্র ম্লান হবে না। এতদিন হয়নি, ভবিষ্যতে আরো হবে না। জ্ঞানের জন্য শিক্ষার ধারণাটিকে দুমড়ে মুচড়ে আসছে দিনে শিক্ষাকে উৎপাদনের যন্ত্র হিসাবে নির্মাণ করা হচ্ছে। একথা সবাই জানে যে, যন্ত্র হিসাবে বাংলা মিডিয়াম কোনকালেই উৎপাদনক্ষম ছিল না। বরং যন্ত্রী হিসাবে সে চিরকালই দড়।

যুগের ফেরে যন্ত্রী আজ যন্ত্র হয়ে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টায় আকুল। টিকে থাকার বাসনায় বাংলা মিডিয়াম ফেরিওয়ালার মতো চিৎকার জুড়েছে -- আসুন, আমাদের যন্ত্রে ঢুকে পড়ুন, টাইপিস্ট হয়ে, প্রুফ রিডার হয়ে, সংবাদ পাঠক হয়ে, চিত্রনাট্যকার হয়ে, অনুবাদক হয়ে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হউন। তবু ছেলেপুলেরা আসছে না, তারা স্কিল্ড হইতে চায়। শিক্ষাক্ষেত্রে দিনদিন হীনবল হয়ে পড়ছে ভাষা সাহিত্যের অবয়ব।

এই অসময়ে বিভিন্ন উদাহরণে এই যে নিত্যদিন বাংলা মিডিয়ামে আকর্ষিত করার চেষ্টা, জানি তা বিরক্তিকর। তবু মনে রেখো, যে হেরে গেছে, সে কিন্তু ফুরিয়ে যায়নি। মিথ্যেও হয়ে যায়নি। সত্যের শক্তিতেই যেকোনো দিন ফিরে আসতে পারে। যে প্রাসাদে বাগিচা নেই, যে শাসক প্রেমে পড়েন না বারবার, যে রাজার সভাকবি নেই; ইতিহাস শিখিয়েছে তাঁদের প্রতিষ্ঠাকে সন্দেহের চোখে দেখতে। এক সুর বাজাতে বাজাতে ক্লান্ত যন্ত্রদের একদিন যন্ত্রীর কাছে ফিরতে হবেই।

না না, ইংরেজির বিরুদ্ধে সামান্য সমরেও সম্মতি নেই। বাংলা মিডিয়ামের চূড়ান্ত সৃষ্টিশীল মেধাটি যখন ইন্টার ন্যাশনাল কনফারেন্সে কেবল ভাষার অভাবে নির্বাক বসে থাকে, আর অন্য একজন ভুল ব্যাকরণে এগিয়ে গিয়ে চেঁচিয়ে ভুলভাল বকে বাহবা কুড়োয়, খুব কষ্ট হয়। 

তবু বলছি,আবারও বলছি, তপোব্রতদের মাঝে মধ্যে বাংলা মিডিয়ামে পাঠানো হোক। রবি ভট্টের অঙ্কে ভুল নেই। তাঁর অসংখ্য সত্তায় পুনর্জন্ম প্রার্থনা করি। (ক্রমশ)

(লেখক টংলা কলেজের বাংলার অধ্যাপক)