BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

মহাপুরুষ শ্রীশ্রীশঙ্করদেব

Bartalipi, বার্তালিপি, মহাপুরুষ শ্রীশ্রীশঙ্করদেব

(৯)

মহাপুরুষ  শংকরদেবের অন্তিম নাটক ‘শ্রীরাম বিজয় নাট’।কোচবিহারের রাজা  নরনারায়ণের ভ্রাতা শুক্লধ্বজের পৃষ্ঠপোষকতায় মহাপুরুষ শ্রীশংকরদেব শ্রীরাম বিজয় নাটক রচনা করে নাটকটি পরিবেশন করেন। ১৫৬৮ খ্রিস্টাব্দে এই নাটক রচনা করেন। রামানন্দ দ্বিজ তাঁর গুরুচরিত পুথিতে এই নাটকের নাম দিয়েছেন ‘সীতা স্বয়ম্বর’। সর্বসাধারণের মধ্যে এই নামেই নাটকটি পরিচিত। কোনো কোনো প্রসঙ্গে ‘হরধনু ভঙ্গ’ নামেও নাটকটি পরিচিত। শঙ্করদেব জীবনের শেষের দিক কোচবিহারে ছিলেন। শুক্লধ্বজ ফুলবাড়িতে একটি সত্র নির্মাণ করে দেন। এইসত্রে বাস করার সময়েই মহাপুরুষ শংকরদেব ‘শ্রীরাম বিজয় নাট’কটি রচনা করেন। নাটকটিতে শুক্লধ্বজের নাম সংযোজন করা হয়েছিল এবং পৃষ্ঠপোষক স্বরূপ স্বীকৃতি দিয়ে একটি শ্লোক রচনা করা হয়েছিল। নাটকটি শুক্লধ্বজের কাছে পাঠানো হলে তিনি নাটকটি পাঠ করে অতিশয় খুশি হন।  নাটকটি মঞ্চস্থ করার নির্দেশ দেন এবং নাটকের অভিনয় প্রদর্শন করা হলে অভিনয় দেখে শুক্লধ্বজ অত্যন্ত মুগ্ধ হন।

নাটকটি রামায়ণের কাহিনির রাধারে রচিত হয়। শংকরদেবের বাকি পাঁচটি নাটক রচিত হয়েছে শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণকে কেন্দ্র করে। আলোচ্য নাটকটি রামায়ণের আদি কান্ড বা বালকান্ডের কথাবস্তু দিয়ে রচনা করা হয়েছে। নাটকের প্রয়োজনে নাট্যকার মূলকথা বস্তুকে অনেকটাই সংক্ষিপ্ত করে নিয়েছেন। তাড়কা রাক্ষসীর সঙ্গে অন্যান্য রাক্ষসেরা জগতের কল্যাণের জন্য অনুষ্ঠিত যাগযজ্ঞে নানা ধরনের বাধা বিঘ্ন সৃষ্টি করায় সুচারুরূপে যজ্ঞ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে বাধাস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ঋষি বিশ্বামিত্র দশরথের কাছে গিয়ে তার পুত্র রাম লক্ষণকে  রাক্ষসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সাহায্য চাইলেন। রাজা দশরথ ঋষি বিশ্বামিত্রের সঙ্গে রাম লক্ষণ কে যজ্ঞ রক্ষা করার জন্য পাঠিয়ে দিলেন। মাঝপথে আক্রমণ কারিনী তাড়কা রাক্ষসীকে রামচন্দ্র শর প্রহার  করে বধ করেন। বিশ্বামিত্র খু্শিমনে আশ্রমের যজ্ঞ আরম্ভ করলেন। রাম লক্ষণ রক্ষক রূপে পাহারা দিতে থাকলেন। মারীচ এবং সুবাহু  নামে দুই রাক্ষস যজ্ঞের কাজ পণ্ড করার জন্য এগিয়ে এল। রাম তীক্ষ্ণ শর প্রহার করে সুবাহুকে মহাসাগরে এবং এবং মারীচকে জীবন্ত অবস্থায় লঙ্কায় নিক্ষেপ করলেন। বিশ্বামিত্র ঋষি নির্বিঘ্নে যোগ্য সম্পন্ন করলেন। এদিকে রাম লক্ষণকে সঙ্গে নিয়ে ঋষি বিশ্বামিত্র রাজা জনকের কন্যা সীতার স্বয়ম্বর সভায় উপস্থিত হলেন। ঋষি বিশ্বামিত্রের  নির্দেশে রামচন্দ্র হরধনু ভঙ্গ করে সীতাকে পত্নীরূপে লাভ করলেন। সংক্ষেপে এটাই নাটকের কাহিনি। মূল রামায়ণের সঙ্গে এই নাটকটির কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। প্রথমত, মূল রামায়ণে আছে যে রাজগুরু বশিষ্ঠের নির্দেশে রাজা দশরথ বিশ্বামিত্রের সঙ্গে রাম লক্ষণ কে পাঠিয়েছিলেন। নাটকটিতে কিন্তু বশিষ্ঠের প্রসঙ্গের কোনো উল্লেখ নেই।দ্বিতীয়ত, বাল্মিকী রামায়ণে রাম মারীচ এবং লক্ষণ সুবাহ কে পরাজিত করে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। রাম বিজয় নাটকে  মারিচ এবং সুবাহ দুজনকেই রামচন্দ্র তাড়িয়ে নিয়ে যায়। অহল্যার শাপমুক্তি সম্পর্কে নাটকে কোনো ধরনের সংকেত বা আভাস লক্ষ্য করা যায় না। রামায়ণের প্টভূমিতে  নাটকটির কাহিনি রচিত হলেও মহাপুরুষ শংকরদেবের মৌলিকতার যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। চরিত্র চিত্রণের প্রসঙ্গেও নাট্যকার মৌলিকতার পরিচয় দান করেছেন।নাটকে বিশ্বামিত্রকে রাম লক্ষণের অভিভাবক রূপে দেখানো হয়েছে।নাটকের  অন্যতম চরিত্র হল শ্রী রামচন্দ্র। তিনি কবির দৃষ্টিতে এবং অন্যান্য চরিত্রের দৃষ্টিতেও অবতার পুরুষ। ধর্ম সংস্থাপনের জন্য এবং ধার্মিকদের রক্ষা করার জন্য এই অবতার রূপ গ্রহণের অন্যতম কারণ। নাটকের শ্রীরামচন্দ্র উত্তমরুপে অঙ্কিত হয়েছে। তিনি তাড়কাকে বধ করেছেন, মারীচকে লঙ্কায় নিক্ষেপ করেছেন।বিপক্ষীয় রাজা-মহারাজাদের অবহেলায় পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছেন। তার শৌর্যবীর্য প্রশংসনীয় ভাবে  উপস্থাপন করা হয়েছে। আলোচ্য  নাটকের গতি প্রগতির পরিণতিতে বিশ্বামিত্রের ভূমিকা সন্দেহাতীতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।কুশিক ঋষির পুত্র বলে তিনি কৌশিক নামে পরিচিত। সমগ্র জগতের তিনি মিত্র বলে তার অন্য একটি নাম বিশ্বামিত্র। তিনি ছিলেন ক্ষত্রিয়। তপের প্রভাবে তিনি ব্রাহ্মণত্ব লাভ করেন। বিশ্বামিত্র বলেন যে তিনি যোগের সাহায্যে জানতে পেরেছেন যে সীতা পূর্বজন্মে অনেক বছর তপস্যা করে বিষ্ণুকে স্বামী রুপে পেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার আশা পূরণ হয়নি। জাতিস্মর সীতা আগের জনমের মনোকামনা নিয়ে এই জন্মে সীতা রূপে জন্মগ্রহণ করেছেন। সীতা  নিরন্তর রামের বিরহে বিরহদগ্ধা হয়ে আছে বলে সীতার রূপগুণের পরিচয় দিয়ে রামচন্দ্রের কাছে বিশ্বামিত্র ব্যাখ্যা করেন। সীতার রূপলাবণ্যের বর্ণনা রামের মনে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এভাবে দেখা যায় কৌশিক বিশ্বামিত্র রাম সীতার প্রতি পূর্বরাগ সৃষ্টিতে অনেকটা সক্ষম হয়েছিলেন। 

শ্রীচৈতন্যদেব বঙ্গদেশের একজন ধর্ম প্রচারক। পিতা জগন্নাথ মিশ্র, মাতা শচীদেবী। তাদের আদি নিবাস ছিল শ্রীহট্ট। পরবর্তীকালে  নবদ্বীপ চলে আসেন। নবদ্বীপে ১৪৮৫ সনে শ্রীচৈতন্যের জন্ম হয়।১১ বছর বয়সে চৈতন্যদেবের পিতার মৃত্যু হয়।১৬ বছর বয়সে তিনি টোলের পন্ডিত নিযুক্ত হন। সেই একই বছরে চৈতন্যদেবের বিবাহ হয়। স্ত্রীর নাম ছিল লক্ষ্ণী। কিন্তু সর্পদংশনে লক্ষ্মী দেবীর অকাল মৃত্যু হয়। তখন বিষ্ণুপ্রিয়ার সঙ্গে তার দ্বিতীয় বিবাহ হয়।তেইশ বছর বয়সে চৈতন্য প্রথম তীর্থ যাত্রা করেন। তিনি প্রথম গয়া গিয়েছিলেন। সেখানে মাধবেন্দ্র পুরী সন্ন্যাসীর শিষ্য ঈশ্বর পুরীর কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণ করেন। তারপর গৃহে ফিরে এসে কৃষ্ণ চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে দিন কাটাতে শুরু করেন।চব্বিশ বছর বয়সে চৈতন্যদেব সন্ন্যাস গ্রহণ করেন এবং নানা তীর্থ ভ্রমণ করে তিনি পরিশেষে পুরীতে এসে আঠারো বছর সেখানে বসবাস করে মৃত্যুবরণ করেন।১৫৩৩ সনে তার মৃত্যু হয়। তখন তার বয়স ছিল মাত্র আটচল্লিশ বছর।  চৈতন্যদেব নিজে কিছু রচনা করেন নি। তার মৃত্যুর পরে ১৬১৬ সনে  কৃষ্ণদাস কবিরাজ নামে একজন বৈষ্ণব চৈতন্যচরিতামৃত রচনা করেন। এটিই চৈতন্য জীবনের আধার গ্রন্থ। চৈতন্য বাদের মতে  চৈতন্যের শিষ্য অদ্বৈত এবং নিত্যানন্দ হলেন বিষ্ণুর অবতার। অদ্বৈতের বাড়ি বাড়ি ছিল শান্তিপুরে আর নিত্যানন্দ নবদ্বীপের একজন ব্রাহ্মণ ছিলেন। এরা দুজনই চৈতন্য মতের প্রধান প্রবক্তা ছিলেন।এই দুজন ছাড়াও   রূপ, সনাতন,জীব, রঘুনাথ ভট্ট, রঘুনাথ দাস এবং গোপাল ভট্ট এই ছয়জন গোস্বামী চৈতন্যমতের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। এই মতের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য ব্যক্তিরা হলেন শ্রীনিবাস,শ্রীস্বরূপ,গদাধর পন্ডিত,রামানন্দ,হরিদাস প্রভৃতি।শংকরদেবের মতো চৈতন্যদেবও জাতিভেদ মানতেন না। কথিত আছে যে শ্রীচৈতন্য পাঁচজন পাঠানকে মন্ত্র দিয়ে বৈষ্ণব করেছিলেন। চৈতন্যের নিজের ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয় –

‘ঈশ্বরের কৃপা জাতি কুল নাহি মানে।’ শংকরদেবের দাস্য ভাবের পরিবর্তে চৈতন্যদেব মাধুর্যভাব অনুসরণ করেছিলেন। এই মাধুর্য ভাব প্রেমের পাঁচ ভাবের একটি। গুরুবাদকে চৈতন্য উচ্চ আসন দান করেছেন। গুরুর পদাশ্রয় তার জন্য শ্রেয় সাধনা। তাই এই ধর্মে গোস্বামীরা সমাজের উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। এই সুবিধা নিয়ে তারা শিষ্যদের ওপরে নানা ধরনের অত্যাচার চালিয়েছিলেন। আমাদের অসমে বলা হয় যে কলিযুগে নাম ধর্ম প্রচারের জন্য শ্রীশংকরদেব আবির্ভূত হয়েছিলেন। কিন্তু চৈতন্য দেবের আবির্ভাবের কারণ হিসেবে বলা হয়ে থাকে তিনি নাকি রাধার প্রেমের মাহাত্ম্য আস্বাদন করার জন্য মানব রূপে আবির্ভুত হয়েছিলেন। চৈতন্য হল রাধা কৃষ্ণের মিলিত রূপ। চৈতন্যের মতো শ্রীশঙ্করদেব নিজেকে কখনও  বিষ্ণুর অবতার বলে মনে করেন নি। অথবা তিনি কোথাও কৃষ্ণকে ত্যাগ করে তাকে ঈশ্বর বলে মেনে নিয়ে পুজো করতেও বলেন নি। শংকরদেব মহাপুরুষ, ভগবান নন। শংকরদেবকে কখনও  শ্রীকৃষ্ণ শংকরদেব বলা হয় না। যেভাবে চৈতন্যদেব কে বলা হয় শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য দেব। তাই চৈতন্য পন্থীদের অনেকেই শংকরদেবের বৈষ্ণবত্ব সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করে। চৈতন্য পন্থীরা শংকরদেব কে নির্বিশেষবাদী আখ্যা দিয়ে তার উপরে নিরীশ্বরবাদিতা বা নাস্তিকতার দোষারোপ করে। চৈতন্য পন্থীর সঙ্গে শ্রীশংকরদেবের ধর্মের অন্য একটি পার্থক্য চোখে পড়ে। ‘চৈতন্যচরিতামৃতে’ বলা হয়েছে যে শ্রীচৈতন্যের কাজ যুগধর্ম প্রবর্তন নয়। কিন্তু নাম ধর্ম প্রচারের দ্বারা শংকরদেব আসামে যুগান্তর এনেছিলেন। শ্রী শঙ্করদেব পরবর্তীকালে সন্ন্যাস গ্রহণ করেননি। শংকরদেব বুঝেছিলেন যে ভগবানের নাম নেবার জন্য সন্ন্যাসী হওয়ার প্রয়োজন নেই। গৃহী হয়েও ভগবানের নাম নেওয়া যেতে পারে।চৈতন্য পন্থায় শৃঙ্গার রসের প্রাচুর্য অনেক বেশি। শৃঙ্গার রসের প্রবর্তক ঈশ্বরপুরীর কাছ থেকেই চৈতন্য এই রসের বীজ গ্রহণ করেছিলেন। তাই তিনি বলেছিলেন-‘সব রস হৈতে শৃঙ্গারে অধিক মাধুরী’।এইজন্যই রাধা কৃষ্ণের প্রেমে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। এই রসের বশবর্তী হয়েই তিনি পরকীয়া প্রেমের উপরে গুরুত্ব দান করেছিলেন এবং বলেছিলেন ‘পরকীয়া ভাবে রতি রসেরে উল্লাস’। চৈতন্যচরিতামৃতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে রাধার ভাব নিয়ে চৈতন্যের অবতার হল এবং সেই ভাবে নিজের বাঞ্ছা পূরণ করলেন।–

সেই রাধার ভাব লৈঞা চৈতন্যাবতার।

যুগধর্ম নাম প্রেম করিল পরচার।।

সেইভাবে নিজ বাঞ্ছা করিল পূরণ।

অবতারের এই হেতু  মূল যে কারণ।।

এভাবে দেখা যায় চৈতন্য ধর্মে পরকীয়া প্রেমাস্বাদনের দর্শনে ভক্তি প্রচারের ব্যবস্থা রয়েছে যা শঙ্করের ধর্ম মতে নেই। শঙ্কর দাস্যভাবের দর্শনের দ্বারা ভক্তি ধর্ম প্রচার করেছিলেন। চৈতন্যের মতো শংকরদেব শৃঙ্গার রসকে প্রাধান্য দেন নি। শংকরদেব যে চৈতন্যের শিষ্য ছিলেন না,বা চৈতন্য পন্থীদের কোনো প্রভাব যে অসমের বৈষ্ণবধর্মে পড়েনি তার জ্বলন্ত উদাহরণ হল শংকরদেব এবং মাধব দেবের পুঁথিতে চৈতন্যের কোনো নাম উল্লেখ নেই। তাই চৈতন্য প্রচার করা ধর্মের আগেই অসমে মহাপুরুষীয়া  বৈষ্ণবধর্ম প্রচারিত হয়েছিল।পরবর্তীকালে চৈতন্য পন্থীদের পুথিতেও শংকরদেবের কোনো উল্লেখ নেই। চৈতন্যপন্থীদের পুথিতে চৈতন্যের অনেক নগণ্য শিষ্যের নাম পাওয়া যায় কিন্তু শংকরদেবের নাম পাওয়া যায় না।