BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

আরও একবার বাবাকে হারালাম

Bartalipi, বার্তালিপি, আরও একবার বাবাকে হারালাম

পারমিতা দেশমুখ্য

জীবনে দ্বিতীয়বারের জন্য বাবাকে হারালাম। বৃহস্পতিবার মুম্বই পবন হংসরাজ শ্মশানে যখন গুরুজির নশ্বর দেহ পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যাচ্ছিলো, তখন ঠিক এটাই ভাবছিলাম আমি। না, শুধু আমি নই, আমরা যারা  পন্ডিত যশরাজের শিষ্য, আমি জানি, আমরা প্রত্যেকেই পিতৃবিয়োগের ব্যথায়  দীর্ণ হচ্ছিলাম। আমরা যারা সেদিন শ্মশানে উপস্থিত ছিলাম, তারা তো বটেই, দেশে ও বিদেশে গুরুজির যে অগুণতি শিষ্য ছড়িয়ে রয়েছেন, তারাও আমাদের মতো ব্যথাতুর আজ। এটাই স্বাভাবিক। পন্ডিত যশরাজের কাছে তার শিষ্য মানেই নিজের সন্তান। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা  তার শিষ্যদের নিয়েই ছিল পন্ডিতজির এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলি।

গত বাইশ বছর ধরে আমি পন্ডিত যশরাজের কাছে সংগীত সাধনা করছি। ১৯৯৬ সালে ডিসেম্বরে গুরুজি শিলচর এসেছিলেন। আমার বাবা প্রয়াত রামেন্দ্র দেশমুখ্যের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হয়।  এরপর ১৯৯৭ সালে তিনি আবার আসেন শিলচরে।  এবার তার গান শুনে আমি নিজেই নিজের কাছে সংকল্প করি যে সংগীত সাধনা যদি করতেই হয় তা হলে পন্ডিত যশরাজের কাছেই করবো। কিন্তু শুধু সংকল্প নিলেই তো হয় না, সেটাকে বাস্তবে রূপায়িত তো করতে হবে। আজ থেকে কুড়ি বছর আগে শিলচর থেকে শুধু গান শেখার জন্য মুম্বই চলে যাওয়া সহজ কথা ছিল না।  তবে আমার ভাগ্য ভালো, ওই সময় আমার দাদা ও কাকা মুম্বইয়ে থাকতেন। আমি তাদের কাছে চলে এলাম।


মুম্বাইয়ের বাড়িতে গুরুজির মরদেহের সামনে পারমিতা।

একদিন দুরুদুরুবক্ষে তার বাড়িতে গেলাম। গুরুজি তখন আন্ধেরির ভার্সোভাতে থাকতেন। আমাকে গাইতে বললেন।  তানপুরা ছিল একটা, আমি পু্রিয়া ধনেশ্রী-তে একটি গান গেয়ে শোনালাম। গুরুজি মন দিয়ে শুনলেন। আমি বুঝতে পারছি না, পরীক্ষায় উতরোতে পেরেছি কি না? গুরুজি বললেন, তিনি কয়েক মাসের জন্য আমেরিকা চলে যাচ্ছেন, যাবার আগে আমাকে দুটো গান দিয়ে যাবেন, ফিরে এসে শুনবেন, আমি ঠিকঠাক তা তুলতে পেরেছি কি না।

দু মাস পর ফিরে এসে আমার গান শুনলেন গুরুজি।  বললেন, তু শুরু কর দে.

তো সেই শুরু। দেখতে দেখতে বাইশ বাইশটি বছর পেরিয়ে গেলো, দু দুটি দশক। আমার পুরো অস্তিত্ব, আমার পুরো জীবন সমর্পণ করে আমি তার কাছে সংগীত সাধনা করেছি।  কিন্তু পন্ডিত যশরাজ এক অনিঃশেষ সমুদ্র, সংগীতের সাগর। এক জীবনে তার কাছে দীক্ষা অসম্ভব।  

আগে  শিষ্যদের বাড়িতে রেখেই তালিম দিতেন গুরু্জি। কিন্তু আমি যখন তার কাছে যাই ততদিনে বাড়ি বদলেছেন তিনি।  নতুন বাড়িতে শিষ্যদের থাকার সংকুলান সম্ভব ছিল না।  ফলে দাদার বাড়ি থেকে এসেই তার কাছে গান শিখতাম আমি। এমনিতে খুব আমুদে মানুষ, কিন্তু তালিম বা রেওয়াজের সময় কোনো ছোটোখাটো ভুল হলেও ভুরু কুঁচকে যেত গুরুজির। তার কাছে তালিম মানে প্রতিদিন পরীক্ষা।  

একদিন গুরুজি বললেন, তু দিল্লি আ সকতি হ্যায় কিয়া? আকেলি? 

আমি দেখেছি, গুরুজি সব সময় হ্যা বা না-তে উত্তর শুনতে ভালোবাসতেন।  শিলচরের মেয়ে আমি, সেভাবে বাইরে তো কখনো যাইনি। তবু প্রত্যয়ের সঙ্গে বলে দিলাম, যাবো।


শিলচরে পন্ডিত যশরাজ। বাবা রামেন্দ্র দেশমুখ্যের সঙ্গে পারমিতা।

সেই প্রথম গুরুজির সঙ্গে একমঞ্চে বসে অনুষ্ঠান।  দিল্লি, হরিদ্বার, কলকাতা। আরো কত কত জায়গায়। তারপর বিদেশ তো রয়েইছে। আমরা তার শিষ্যরা মঞ্চে বসে তাকে সঙ্গ দিতাম।  বা বলা ভালো, দোহার দিতাম। প্রতি বছর নভেম্বরে হায়দ্রাবাদে গুরুজি আমাদের নিয়ে যেতেন। গুরুজির বাবা পন্ডিত মতিরাম হায়দরাবাদের নিজামের দরবারে গান গাইতেন।  ৩০ নভেম্বর তার জন্মদিনে মতিরামকে সম্মান জানানোর বিশাল আয়োজন হয়েছিল। কিন্তু ওই দিনই সম্মান গ্রহণ করার আগে হঠাৎ মারা যান মতিরাম। যশরাজের বয়স তখন মাত্র  চার বছর।  এরপর বড় ভাই মণিরামের কাছে গান শেখা শুরু যশরাজের।  জীবনের শেষদিন অবধি যে সাধনা চলেছিল অবিরাম। 

বিদেশে বিশেষ করে আমেরিকায় গুরুজির অসম্ভব জনপ্রিয়তা।  নিউ ইয়র্কে তার নামে অডিটোরিয়াম রয়েছে। গোটা আমেরিকা জুড়ে তার বেশ কয়েকটি স্কুল রয়েছে।  আটলান্টার স্কুলটি চালান হাইলাকান্দির দুই ভাই প্রীতম ও পৃথবীরাজ ভট্টাচার্য।  সেই আমেরিকাতেই মারা গেলেন গুরুজি। নিউ জার্সি-তে। ওই সময় তার সঙ্গে ছিলেন দুই শিষ্য কীর্তি মুখার্জি ও সুমন ঘোষ।  দুপুর দেড়টা নাগাদ। বাথরুম থেকে ফিরেই হার্ট এটাক। শুধু বলেছেন, শরীরটা কেমন যেন লাগছে। তারপর জোরে জোরে তিনবার শ্বাস নিয়েছেন শুধু। ব্যাস, এরপরই থেমে যায় হৃদস্পন্দন, যে হৃদ্স্পন্দনেও ছিল সুরের ছন্দ।  

আমি খবর পাই বিকেল চারটে নাগাদ। কেমন শূন্য লাগছিলো সব কিছু। চারপাশে যেন অনন্ত এক রিক্ততা।

বুধবার গুরুজির মরদেহ মুম্বই নিয়ে আসা হয়। তার বাড়িতেই অন্তিম শয়ানে শোয়ানো হয় তাকে।  বৃহস্পতিবার সকালে ভক্তদের জন্য মরদেহ বাইরে নিয়ে আসা হয়। কেমন শান্ত সমাহিত দেখাছিলো গুরুজিকে। আমার মনে পড়ে যাচ্ছিল কত কত কথা।  কত কত স্মৃতি।  এই তো এই বছরই মুম্বইয়ে তার নব্বই বছরের অনুষ্ঠানে আমরা একমঞ্চে ছিলাম। আজ তার নিথর দেহ আমার সামনে। ৩১ তোপধ্বনিতে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হলো সরকারিভাবে।  পবন হংসরাজ শ্মশানে তখন শাস্ত্রীয় সংগীতের অনেক দিকপাল ব্যক্তিত্বরা। আস্তে আস্তে চিতার আগুনে বিলীন হয়ে গেলো তার নশ্বর দেহ। আমার মনে হলো, মাথার ওপর থেকে ছাদটুকু হারিয়ে গেলো। না, শুধু আমার নয়, আমরা যারা পন্ডিত যশরাজের শিষ্য, আমরা পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি না কেন, আমি জানি, আমরা প্রত্যেকেই পিতৃবিয়োগের ব্যথায় দীর্ণ হচ্ছি. হ্যা, তিনি আমাদের পিতাই ছিলেন. গুরজি সাব সময় বলতেন, তোরাই আমার পরিবার।