BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

ক্যালাইডোস্কোপ

Bartalipi, বার্তালিপি, ক্যালাইডোস্কোপ

                       ।।৬।।


                  কবির প্রতীক্ষা 


একে তো সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশ, তার ওপর আশেপাশে চেনা পরিচিত কেউ নেই। বাবলুর কথা খুব মনে পড়ছিল দিপুর। আজই ঘরে ফিরে একটা চিঠি লিখতে হবে। কলেজের পাশেই একটা পোস্ট অফিস আছে। খুবই সুন্দর পোস্ট অফিস। দুই ক্লাসের মধ্যবর্তী ফাঁকে কয়েকটা পোস্টকার্ড কিনে আনে দিপু। ভাবল, আজই বাবলুকে একটা চিঠি লিখতে হবে। ওরও ক্লাস আজ থেকে শুরু হয়েছে। এই নির্বান্ধব পরিবেশে , প্রায় গ্রাম্য পরিবেশে লালিত দিপু,-রেল কলোনি তো এক ধরনের গ্রাম্যতার কচুরিপানায় ভরা,- ভেতরে ভেতরে সিঁটিয়ে আছে। একেকজন অধ্যাপক আসছেন, নিজের বলছেন, কোন বিষয় পড়াবেন, সেটা জনিয়ে দিচ্ছেন। ফিজিক্স ক্লাসে একজন এলেন। কালো মতো, মোটা, মাথায় চুল কম। কালো ব্ল্যাক বোর্ডে চক দিয়ে লিখলেন, টু ডে ক্যাশ, টুমরো ক্রেডিট। লিখে ঘুরে দাঁড়ালেন। তাঁরা সবাই ইংরেজিতে পড়ান। স্যারদের কথা বুঝতে দিপুর সমস্ত মনোযোগ একাগ্র করে রাখতে হচ্ছে। আর মনে মনে ফেলে আসা স্কুলের ক্লাসের সঙ্গে মিলিয়ে নিচ্ছে পার্থক্যগুলো। কলেজের স্যারদের সঙ্গে , স্কুলের স্যারদেরও তুলনা করছে মন। স্কুলে তো বিজ্ঞান যিনি পড়াতেন, কোনও ক্লাসে তিনিই অঙ্ক করাতেন। এখানে তা নয়।

বায়োলজির আবার দু’জন স্যার। একজন জুলোজি পড়ান, অন্যজন বোটানি। অঙ্ক পড়ান চার জন স্যার। সেদিন যিনি অঙ্ক পড়াতে এলেন, কে যেন বলল, উনি খুব ভালো পড়ান। সঙ্গে সঙ্গে দিপুর মনে পড়ে গেল , স্কুলের তারা শঙ্কর স্যারের কথা। স্কুলে স্যার একবার বুঝিয়ে দিলে মাথায় গেঁথে যেত। ট্রিগনোমেট্রি পড়ানোর সময় স্যার একটা টোটকা শিখিয়ে ছিলেন। সাম পিপল হ্যাড কার্লি ব্ল্যাক হেয়ার টার্নড পারমানেন্টলি ব্রাউন। কলেজে এখন যিনি পড়াচ্ছেন, তিনি আর তারা শঙ্কর স্যারকে হারাতে পারলেন না। লিমিট এক্স টেনডস টু জিরো, হুইচ ইজ ভেরি নিয়ার টু জিরো, বাট নট ইক্যুয়াল টু জিরো। এই গোলোকধাঁধায় ঢুকে দিপুর মাথা একেবারে ঘেঁটে গেল। যেন সে গোবরে পা পিছলে পড়ে গেছে, বদরপুরে যা প্রায়ই হত তার সাথে। ওখানে প্রচুর গরু রাস্তায় ঘুরত। সুধীর স্যারের কথা মনে পড়ে গেল। স্যার কাউকে বকতে হলে প্রায়ই বলতেন, রাস্তার গরু। যেন ওটাই সব চেয়ে হীনতম তুলনা। স্যারকে ভালবাসতে শুরু করে , যখন জানল, স্যারের ছোট ভাই নকশাল আন্দোলনে মারা যায়, পুলিশের গুলিতে। স্যারের কড়া নজর থাকত, যাতে ওরা নকশাল রাজনীতির সংস্পর্শে যেতে না পারে। বড় ক্লাসে ওঠার পর অনুভব করতে পারত স্যারের মমতা। স্যারের বাইরেটা যত কঠিন, অন্তরটা ততই নরম। ম্যাট্রিকের ফল বেরনোর পর, স্যারের পা ছুঁয়ে প্রণাম করার পর, স্যার যে মাথায় হাত বুলিয়েছিলেন, সেই স্পর্শে মমতার সজলতা মিশে ছিল, যা পরমাত্মীয়ের স্পর্শে পাওয়া যায়। 

বদরপুরের কলোনি-জীবনের অলিগলি ঘুরতে ঘুরতে, কখন যে অন্যমনস্ক হয়ে গেছিল, টেরই পায়নি দিপু। সম্বিত ফিরল, ক্রিং করে ক্লাস শেষের বেল বাজতে। স্যার ডাস্টার, রোল কলের খাতা নিয়ে চলে যাচ্ছেন। আর সেদিন দিপু যেটা বুঝতে পারেনি, সেটা তার এক  অবশ্যম্ভাবী নিয়তির ইসারা। লাগাতার ক্লাস চলছিল। দিপু জানত না রুটিন কোথায় পাওয়া যায়। অনেকেই রুটিন লিখে এনেছিল। ওদের কাছ থেকে লিখে নিতে পারে। কিন্তু, দিপু এবার যেন নিজেকে নতুন করে চিনতে পারছে। সে টের পায়, চট করে মেশার ক্ষমতা তার নেই। তার মধ্যে একটা নিভৃতচারী মন লুকিয়ে ছিল। কেউ বলল, অফিস রুমের নোটিস বোর্ডে রুটিন আছে। সেও নীরবে ওদের অনুসরণ করে। জালের আড়ালে আঠা দিয়ে সাঁটা রুটিন খাতায় লিখে নিল। তার মানে আজ পরের ক্লাস তিনটে পঁয়তাল্লিশে। ক্লাসের উল্টো দিকে একটা চা- বিস্কুটের দোকান আছে। খিদে পেয়েছে। অনেকের মত, সেও এক কাপ চা আর দুটো বিস্কুট নিল। চায়ের নেশা তার নেই। বাড়িতে তাকে চা খেতে দিতেন না মা। সে খেতো দুধ। এখানে নিষেধ করার কেউ নেই। নিষেধ ভাঙার মধ্যেও আনন্দ আছে, এটা তো জানত না! চায়ে চুমুক দিয়ে বিস্কুটে কামড় বসিয়েছে, এমন সময় কানে এল, একটা ছেলে বলছে, এই কলেজে তো শক্তিপদ ব্রহ্মচারী পড়ান। আমাদেরও ক্লাস পাবেন। নামটা শোনা মাত্র শিহরিত হয় কর্ণকুহর। নামটা তো চেনা। বাড়িতে ‘অমৃত’  আসত। ওতে শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর কবিতা পড়েছে। সে ভাবত , উনি নিশ্চয় কলকাতার কবি। ছাপার অক্ষরে যার নাম পাওয়া যায়, তাঁকে চোখের সামনে আগে কখনো দেখেনি। শেষ ক্লাস বাংলা। সেই ছেলেটাই আবার বলল, আজকের বাংলা ক্লাস এসপিবি আসবেন। শোনামাত্র শিহরিত হয় পুনর্বার। মাঝের বোটানি ক্লাস সেই পুলকে মাঠে মারা গেল। তাছাড়া, স্যারের পড়ানোর ধরনটাও বেশ অন্যরকম। বাংলা ক্লাসে  যিনি এলেন, ধুতি পাঞ্জাবি পরা। ভীষণ শ্রুতিসুখকর তাঁর বলার ধরন। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতে হয়। উনি পড়াচ্ছেন, চন্দ্রগুপ্ত। দ্বিজেন্দ্র লাল রায়ের নাটক। আর প্রথম ক্লাসেই উনি বুঝিয়ে দিলেন, যে উনি আমর্ম রবীন্দ্রানুরাগী। পড়াচ্ছেন দ্বিজেন্দ্র লাল, কিন্তু বাক্যে বাক্যে সমালোচনা করছেন নাট্যকারেরই। আর প্রতিতুলনায় উদাহরণ হিসেবে অনর্গল উদ্ধৃত করে যাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। এত ভাল বাংলা ক্লাস দিপু স্কুলে পায়নি। মনে মনে সকলেই ধরে নিয়েছে, উনি শক্তিপদ ব্রহ্মচারী না হয়ে যান না। ক্লাস শেষ হল। সকলে যখন প্রায় নিশ্চিত, তবু জিজ্ঞেস করে উঠল, স্যার আপনার নামটা কি ? একমাত্র তিনিই ক্লাসে এসে নিজের নাম বলেননি। প্রশ্ন শুনে, একটু দাঁড়ালেন। বললেন, লিখে রাখো জেআরসি। পুরো নামও বলেননি। শুধু ওই জেআরসি। যে ছেলেটি প্রত্যয়ের সঙ্গে বলেছিল, আজ শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর ক্লাস হবে আজ, সে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন হেসে উঠল। দিপুও একটু হতাশ হল। ছাপার অক্ষরে দেখা নামের কবির দেখা পাওয়া গেল না। কবির জন্যএই এক-দেড় ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত  প্রতীক্ষাও যে তার জীবনে আরেক অবশ্যম্ভাবী নিয়তির ইশারা, দিপু  টের পেলো না। (ক্রমশ)