BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

বাংলামিডিয়াম (১০)

Bartalipi, বার্তালিপি, বাংলামিডিয়াম (১০)

আমাদের ভুটু ব্যাঙ্কার। আমাদের মানে আমার প্রাক্তন ছাত্র। ঠিকই ধরেছেন, প্রতিষ্ঠিত না হলে আমার ছাত্র ছিল, বলে দাবি করে কোন বেয়াকুব! প্রকৃত প্রস্তাবে একজন শিক্ষকের দীর্ঘমেয়াদি চাকরি জীবনে দাবি করার মতো প্রচুর প্রতিষ্ঠিত ছাত্রছাত্রী জুটেই যায়। এবং ইচ্ছে করলে এঁদের উপর প্রতিশোধ তোলার মওকাও জুটে যায়। ছাত্রাবস্থায় এঁরা নিত্যনতুন প্রশ্নে "আসি যাই মাইনে পাই" জীবনটাকে অতিষ্ঠ করে তোলে। তখন ভাবতেও পারে না, মাস্টার মাত্রই অঙ্কে ভালো, হিসাবে পাক্কা। একদিন গুনে গুনে শোধ তুলবে। -- ভুটু, আমার সিবিল স্কোর কত? ভুটু, নেট ব্যাঙ্কিং কীভাবে করে? ভুটু, এটিএম কার্ড হারিয়েছে, কী করব? ভুটু, পার্সোনাল লোনের ইন্টারেস্ট রেট কত চলছে? -- ভুটু সব উত্তর দেয়, আর মনে মনে ভাবে, কেন যে সাবজেক্ট চয়েজের সময় বাংলা নিয়েছিলাম! ভাবে, তবে বুঝিয়ে উত্তরও দেয়। ছেলেটার রসবোধ পাকা, কথা বলতে ভালোই লাগে। বললাম, ভুটুরে, ব্যাঙ্ক থেকে ফোন করেছিল, ক্রেডিট কার্ড নিলে নিতে পারি বলল, তুই কী বলিস? ভুটু বলল-- নিতে পারেন, প্রয়োজন না পড়লে ব্যবহার না করলেই হলো। তারপর হঠাৎ বলল, জানেন, আমার দাদুর একটা ক্রেডিট কার্ড ছিল। যেখানে যেতেন, সঙ্গে নিয়ে যেতেন। যখন খুশি নগদ। বললাম, মস্করার মেজাজে আছিস দেখছি। বলল, না না সিরিয়াস। দিদিমার কথা বলছি। হাতে কানে গলায় মিলিয়ে কম করে বিশ ভরি। আজকের বাজারদরে মোটামুটি ১০ লাখ। একবার দাদু শ্বশুর বাড়ি গেছেন, শুনলেন বড়াল বাড়ির ছয় বিঘের পুকুরটা বিক্রি হবে। তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত। গোপাল মহুরির কাছে দিদিমার গয়না বাঁধা দিয়ে নগদ টাকায় পুকুর কিনে ফেললেন। বাড়ি ফিরে টাকার বন্দোবস্ত করে সে গয়না ছাড়িয়েও আনলেন মাস খানেকের মধ্যে। ভুটু বলে চলে, আমিও একটা নিয়ে রেখেছি। নিয়ে নিন। আর পুকুর কেনার ইচ্ছে থাকলে বলবেন, খবর নেব।
ভুটু পুকুর কেনার প্রস্তাব দেয়, আমাদের সুরজিৎ ধানের জমি কিনতে বলে, ছেলেগুলোর হলো কী! আমাদের সুরজিৎ বললাম, কারণ ওই। প্রাক্তন ছাত্র এবং প্রতিষ্ঠিত। দুচাকা, চার চাকার ডিলার। সহকর্মীদের বাক্যবাণে অতিষ্ঠ হয়ে একদিন ওর শোরুমে গেছিলাম ইএমআই এর খবর নিতে। বলল, গাড়ি কেনে বোকারা। কোনো দরকার নেই। আপনিতো নিজে চালাতে পারবেন না। ড্রাইভার লাগবে। মাসে ৬ হাজার। গ্যারেজ চাই। ভাড়া বাড়িতে থাকেন, এবার থেকে গ্যারেজ ভাড়া হাজার দেড়েক যোগ হবে। এর সাথে মেন্টেনেন্স আর তেল খরচা। তার চেয়ে একেকদিন এক একটা নতুন গাড়ি ভাড়া নেবেন। ফালতু ইনভেস্ট করবেন কেন? বরং ওই টাকায় কয়েক বিঘা ধান চাষের জমি কিনুন। বললাম, ওটাই বাকি আছে। চাকরিবাকরি ছেড়ে মাঠে হাল বাই আর কি! বলল, তা কেন, বছর চুক্তিতে ভাড়া দেবেন। লকডাউনে সব গ্ৰামে ফিরেছে। পাগলের মতো কাজ খুঁজছে। মাটিতো আপনারই থাকল। দিনদিন দাম বাড়বে। টাকা মাটি, মাটি টাকা। কী বুঝলেন?
আমার অত টাকা কোথায়! ইনভেস্টমেন্ট প্লাস ইন্সুরেন্সের প্রিমিয়ামে সব বেরিয়ে যায়। এর অনুরোধে ওর অনুরোধে একগাদা পলিসি হয়েছে। কোনো কোনো মাসে ধার করে প্রিমিয়াম দিতে হয়। বাধ্য হয়ে দুটো সারেন্ডার করেছি। সাত বছর ধরে টাকা জমিয়ে ফেরৎ পেলাম জমা টাকার চেয়েও কম। কী লাভ! তাই ব্রজগোপাল নতুন পলিসি বোঝাতে এলে সাফ না করেছি। তবু ছাড়ে কই? প্রাক্তন ছাত্র, খারাপও লাগে, বুদ্ধি করে ওকে সুজনের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। আমাদের সুজন। ডিটিও অফিসে চাকরি করে। গত মাসে ওর ছেলে হয়েছে। সেই সুজনের সঙ্গে রাস্তায় দেখা। বলল, ব্রজরে আপনে পাঠাইছিলেন না? আমি বুঝছি। পলিসি করতে কয়, বাচ্চার নামে। করি নাই। বললাম, হ্যাঁ, আমিই পাঠিয়েছিলাম। করলি না কেন? বাচ্চাটার নামে একটা করে রাখতিস, ভবিষ্যৎ নিশ্চিত, ওরও কিছু কমিশন হতো। বলল, বাচ্চার ভবিষ্যৎ নিয়া টেনশন নাই। ব্যবস্থা কইরা ফেলছি। বস্তিতে দাদুর তিন বিঘা মাটি আছিল, সেগুন গাছ লাগায়া থুইলাম। বাচ্চা বড়ো হইব, গাছও বড়ো হইব। টেনশন নাই। পলিসি কইরা কয় টাকা পামু! ততদিনে ওই টাকার কোনো ভ্যালু থাকব না। ব্রজরে কইলাম, তরে দুইটা ছাগল কিন্যা দেই, পাল। তগো বস্তিতে ছাগল ছাইড়া পালতে পারবি। একলগে তিনটা বাচ্চা দিব। কমিশন দিয়া কয়দিন খাইবি। পাঁঠার মাংস ৭০০ টাকা কিলো। হে দেখি আমার উপরে ফায়ার। তার প্রেস্টিজে লাগছে।
সুজনের যুক্তিটা মনে ধরেছে। ষাট বছর পরে যখন ম্যাচুরিটির টাকা হাতে পাব, তখনকার বাজার দরে ওই টাকায় কোনো স্বপ্নই পূর্ণ হবে কী? ভাবতে ভাবতে ঘরে ফিরে এলাম। রুনুর মার কাজ শেষ হয়নি এখনো। বললাম, দিদি, ব্যাঙ্ক পোস্টাপিস এলআইসিতে টাকা জমাও না তুমি? রুনুর মা বলে, না দাদা, আমার ওইসব কিছু নাই। ধানের জমি আছে দেড় বিঘা, অল্প সোনা আছিল, ভাইঙ্গা মেয়ের বিয়া দিছি, আর গোরু আছে দুইটা। আর একটা গাই দেখছি, কিনুম। এই মাসে আমারে কিছু টাকা দিবেন। পরে মাসে মাসে কাইটা লইয়েন। গাইটা ভালো জাইতের। যত্ন দিলে ভালো দুধ দিব। আমরা পুরানা দিনের মানুষ, আমাগো এনআরসি (এলআইসি) কইতে এইগুলানই। বাবায় কইত, দোন দোন ধান ধন, আর ধন গাই / কিঞ্চিৎ ধন সোনা, আর সব ছাই। আমাগো ব্যাঙ ছ্যাঙ নাইগা দাদা।
ছাই! একজনের কথা মনে পড়ছে। অবসরের টাকা থেকে ধুমধাম করে বড়ো মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। হিসেব করে ছোট মেয়ের বিয়ের টাকা জমিয়ে রেখেছেন। সময়মতো মেয়ের বিয়ে ঠিক হলো। ২০১১ সাল। টাকা তুলবেন তুলবেন করছেন এমন সময় কোম্পানি লাটে উঠল। চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি। সর্বস্ব হারালেন তিনি। আঘাত সইতে পারলেন না। মেয়েটার বিয়ে এক বছর পিছল। বিধবা মা গয়না বেচে মেয়ের বিয়ে দিলেন। সমবেদনার জোব্বার নিচে ভদ্রলোকের পরিকল্পনাহীনতার সমালোচনায় অংশ নিলেন পড়শিরা। কেউ জানলেনই না কোথায় ভরাডুবি হলো। রক্ষা যে সোনাটুকু ছিল। -- ছাই, বাকি সব ছাই।
কিছুতো নেই কোথাও। পৈতৃক কৃষি জমি, বসতবাড়ি বিক্রি করে মধ্য শহরে সাত তলার শূন্যে বাসা। একটা ভূমিকম্প পথে বসার জন্য যথেষ্ট। থাকার মধ্যে প্রতিশ্রুতির কয়েকটি কাগজ। ১৫ বছর, ২০ বছর পর সমৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি। যদি ব্যাঙ্ক দেউলিয়া হয়ে যায়! যাচ্ছে তো। বিমা কোম্পানি যদি কথা না রাখে! ধরা যাক রাষ্ট্র ভবিষ্যনিধির সমস্ত টাকা লভ্যাংশের শর্তে বিনিয়োগ করে দিল এবং সেই বিনিয়োগ লাভের মুখ দেখল না, তখন? ছোট্ট একটা গোয়াল ছিল আমাদের। লকখি, লালি আর লকখির মেয়ে। কৈশোর পেরোনোর আগেই ঝামেলা চুকেছে। ঠাকুরদাদার অবশ্য গোয়াল ভরা গরু আর পুকুর ভরা মাছ ছিল। স্মৃতিতে। তাঁর উদ্বাস্তু জীবন তবু যে কোনোক্রমে শেকড় ছড়িয়েছিল, এখন বুঝি, সেটা ভুটুর দাদুর ক্রেডিট কার্ডের গল্পের অন্য এক সংস্করণই হবে। চুরি ছিনতাইয়ের ভয়ে সেই ক্রেডিট কার্ডের জায়গা দখল করেছে ইমিটেশন।
করোনা অতিমারির কবলে জিডিপি যখন মেরু উষ্ণতায় নিথর, অর্থনীতিতে ধান মাছ গোরু মাটি ও সোনার সাবেকি স্তম্ভগুলির পুনর্নির্মাণ তখন একমাত্র বিকল্প। বাকি সব ছাই।
একদিকে রুনুর মা সনাতনকে আঁকড়ে থাকতে চাইছে, আর অন্যদিকে ভুটু সুরজিৎ সুজনরা ঐতিহ্যের কাছে ফিরে যেতে উদ্যোগী, তাই আশা জাগে। সঙ্গে ভাষা শিক্ষকের একটি দুরাশাও। একদিন যদি বাংলামিডিয়ামেও আবার সবাই...
(ক্রমশ)
(লেখক টংলা কলেজের বাংলার অধ্যাপক)