BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

ক্যালাইডোস্কোপ

Bartalipi, বার্তালিপি, ক্যালাইডোস্কোপ

                                                                                  ॥ ৫॥  

                                                                                       স্মৃতি

কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, কি চেয়েছ জীবনে ? বলব,  স্নিগ্ধ ও পরিচ্ছন্ন একটা জীবন বাঁচতে চাই, যে-জীবনে, আর কিছু না থাক , থাকবে না কোনো কপট ছলনা , কিংবা কোনো মিথ্যার আড়াল থাকবে না। তিন মাস হয়ে গেল, কবিতা লিখতে পারছি না। আত্মমগ্ন হয়ে শব্দের কুহকে ডুবে, ডুবুরির মতো, নাকি উজ্জ্বল মাছের মতো, লাজুক বিস্ময়ে, অপলক চেয়ে দেখা, জলের গভীরে, অতলে ডুবে থাকা, আম গাছের ডালের গায়ে, কালচে-সবুজ শ্যাওলা আর ডালে পেঁচিয়ে, জড়িয়ে থাকা জিম ধরা সাপ। কাঁকড়া খুটে খাচ্ছে মাটি। গোত্তা মেরে উঠে গেল কাংলা মাছ,-ধারাল , রূপোলী,মসৃণ সেই উত্থান। এই যে পুকুরের কথা লিখছি, এটা কোথাকার ? আমাদের বাড়িতে তো পুকুর নেই আর। পুকুর ছিল যেটা, বিক্রি হয়ে গেল, খানিকটা জমি সমেত, ছোড়দির বিয়ের সময়। আনিল দেব বড়ো সজ্জন লোক। বাবার এটাই ছিল আশঙ্কা। জমি কিনে ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হবে যে, যদি সে রগচটা লোক হয়, পান থেকে চুন খসলে, পায়ে পা লাগিয়ে, উচ্চগ্রামে ঝগড়া করতে শুরু করে, বা যদি সে অর্থবলে মশমশ করে  আর বাড়ি বয়ে এসে, ছড়িয়ে যায় প্রতিপত্তির উত্তাপ, বাবা তবে খুব অস্বস্তি বোধ করবেন। আমরা তো খুবই সাধারণ লোক। বাবা তো ইস্কুল মাস্টার। বোনের বিয়ে দিতে পুকুর বেচতে হয়। আমরা নতুন কাপড় কিনি পুজোয়,তাও এক প্রস্থ। খুব সাধারণ দোকান থেকে কেনা হয়, যাতে দোকানে বাকি না পড়ে। শুধু পয়লা বৈশাখে আমরা দু’ভাই আর বাবার জন্য নতুন গেঞ্জি, মা’র আর বোনের জন্য ঘরে পরার শাড়ি, তাও চৈত্র মাসের রিডাকশন সেলে কেনা হয়। সব দোকানেই সস্তায় দাগ লাগা, বিক্রি না হওয়া কাপড়, কম দামে বেচে দেয়।  দোকানে খুব একটা ভিড় হয় না। আমাদের মত স্বল্পবিত্ত পরিবারের মানুষরাই , খুঁজে খুঁজে এসব দোকান থেকে কাপড় কেনে। সাদা কাপড়ে বড় করে লাল রঙে লেখা থাকে ‘ রিডাকশন সেল’। অনেক বড় দোকান, নামি-দামি দোকান, যেমন, রামকৃষ্ণ, বাসন্তী, কিছু মারোয়াড়ি দোকান, এদের সাইন বোর্ডে লেখা থাকে,-‘অভিজাত বস্ত্র বিপণি’, যেখানে আমাদের অন্য সময় যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, আমাদের মত মানুষেরা কাপড় কিনতে ঢুঁ মারে। আমি অবশ্য স্বস্তি পাই না, এইসব দোকানে গেলে। যতই আন্তরিক ব্যবহার করুক, কি একটা হীনমন্যতা , কেন যে আমার মনে , কাঁটা হয়ে বিঁধে থাকে। খালি মনে হয়, অনধিকারীর মত এসেছি। আমাদের পুরো পরিবারের বাজেট থাকে তিন-চারশো টাকা। বাবা গুনে গুনে টাকাটা মায়ের হাতে দেন। আমি মা আর বোনকে নিয়ে রিক্সা করে যাই। আমি যাই সাইকেলে।  র‍্যালির সাইকেল। কলেজে ওঠার পর কিনে দিয়েছিলেন বাবা। বাড়িতে দুটো সাইকেল। আমার আর দাদার। বাবা হেঁটেই চলেন বেশীর ভাগ সময়। কোথাও যাবার খুব তাড়া থাকলে , তবেই রিক্সা চড়েন। আমরা রিক্সা ছেড়ে দিই কোনো একটা দোকানের সামনে এসে। তারপর এ-দোকান , সে-দোকান ঘুরে ঘুরে কাপড় দেখা হয়। পছন্দসই কাপড়ের দাম বেশি হলে, আমরা ছলনার আশ্রয় নেই। দোকানদার একটার জায়গায় দশটা শাড়ি নামায়। এগুলো আমাদের অস্বস্তি বাড়ায়। মা'কে অসহায় দেখায়। আমাদের বাজেট তিন-চারশো টাকা। তবু কেন যাও এসব দোকানে ? জিজ্ঞেস করেছিলাম মা’কে। মা বলেন, বড় দোকানে অনেক সময় সস্তায় দামি ভালো কাপড় পাওয়া যায়। পাড়ার কোন মাসিমা নাকি কবে সাতশো টাকার শাড়ি মাত্র তিনশোতে পেয়েছিলেন। এসব যেন লটারি পাওয়ার মতো ঘটনা। আমাদের ভাগ্যে কখনও ঘটেনি। বাবা তো হিসেব করে ওই কটা টাকাই দেন। তবু মা বছরে একবার , রিডাকশন সেলের বাজারে সব বড় দোকান ঘুরে ঘুরে দেখবেন। সব দোকান ঘোরা হয়ে গেলে, জানিগঞ্জের , আমাদের বাঁধা দোকান, মহেশ পালের দোকান থেকে দুটো সব সময় পরার, মানে ঘরে পরার দুটো শাড়ি কিনবেন। আর তিনটে নতুন গেঞ্জি। এরপরও হাতে কিছু টাকা বেঁচে যায়। হেঁটে হেঁটে মা ক্লান্ত । ক্ষিদেও পায়। আমরা ভারতী সুইটসে রসগোল্লা, সিঙ্গারা, চা খাই। বোন ক্ষীরতোয়া ভালোবাসে। ওটা এক বাটি পাঁচ তিন টাকা। মা কিছুতেই খাবেন না। ইচ্ছে থাকলেও না। আমি জানি সেটা। ওই যে তিন টাকা বেঁচে গেল, ওটা ফেরার রিক্সা ভাড়া। পুজোর কাপড় বাবাই কিনে আনেন, মহেশ পালের দোকান থেকে। এনে বলে দেন, পছন্দ না হলে, ওই দামের মধ্যে বদলে আনতে। কিন্তু মা কিম্বা বোন, কখনই বদলাতে যায়নি। শুধু দাদা আর আমি নিজেদের পছন্দ মত কাপড় কিনে দর্জির দোকানে বানাতে দিয়ে আসতাম। তবে ওই মহেশ পালের দোকান থেকেই কিনতে হত। ওই দোকান থেকে বাবা ধারে কাপড় কিনতেন। মহেশ পাল বাবার স্কুল জীবনের বন্ধু। সুতরাং বাবার যা স্বভাব, বন্ধুর দোকান থেকেই কিনবেন, অন্য কোনো দোকানে  যাবেন না। বাড়ির জন্য যত কম দামের কাপড় কিনুন না কেন, বিয়ের উপহার হিসেবে বেশ দামি শাড়ি কিনে আনবেন। আর পয়লা বৈশাখে সব বাকি চুকিয়ে দেন। সেটাই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। আর সেই বাকির পরিমাণ বেশ কয়েক হাজার টাকা হয়। এত টাকা বাকি হলে , সংসারের খরচ অন্য দিকে কমাতেই হবে। আর বাবা কখনই টাকার বিনিময়ে ছাত্র পড়ান না। আমার ঠাকুরদাও শিক্ষক ছিলেন। ঠাকুরদার বাবা ছিলেন সংস্কৃত টোলের পণ্ডিত। বাবা সেই সুবাদে সংস্কৃতটা খুব ভাল জানেন। স্কুলে আমরা ভাই-বোন সবাই সংস্কৃত পড়েছি। আর পড়তে হত বাবার কাছে। সেটা ছিল এক বিভীষিকাময় অধ্যায়। বাবা খুব রাগী। সামান্য ভুল হলেই বেত পড়ত পিঠে – হাতে। মা কিছু বলতেন না। শুধু চুপ করে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন। যেন এটাই মায়ের নীরব প্রতিবাদ। সংস্কৃত শিখতে গিয়ে আমরা ভাই-বোন কেউই বাবার মার থেকে রক্ষে পাইনি। আর মা'কে দেখতাম নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে। যেন তিনি এসে দাঁড়ালে বাবার রোষ কিছুটা লাঘব হবে। বাবাও তেমনি মায়ের উপস্থিতিকে গ্রাহ্যই করতেন না। তখন তিনি বাবা নন। শুধুই যেন শিক্ষক, যিনি অমনযোগী ছাত্রকে শাসন করছেন। আমাদের ঘর বলতে ঠাকুরদার বানানো বিশাল দুটো আলাদা ঘর। এক ঘরে আমি আর দাদা। অন্য ঘরে মা, বোন এক খাটে শোন, অন্য খাটে বাবা। ঘর দুটো আলাদা। মাঝে উঠোন। বৃষ্টি হলে ভিজে ভিজে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যেতে হয়। টিনের চাল। কাঠের খুটি । ঝড় বৃষ্টি মনে হয় এই বুঝি পড়ে যাবে ঘরটা। রাতে টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে কখন যে ঘুম এসে যায়, বুঝতেই পারি না। আমি ছোট থাকতে রান্নাঘর ছিল বাঁশের। মাটির উনুনে ,লাকড়ি দিয়ে রান্না করতেন। পুকুরে বাসন মাজতেন। পরে বাবা পাকা রান্নাঘর বানান। তবে আজও আমরা মাটিতে পিড়ি পেতে বসে খাই। টেবিল চেয়ার পেতে ,বসে খাবার মত জায়গা নেই রান্না ঘরে। আসলে সময় সময়ের মত আগাম জানান না দিয়ে পালটায়। বাবার মত অ-সংসারী মানুষের পক্ষে সেটা বোঝা সম্ভব নয়। রান্নাঘরটা সামান্য বড় করে বানালেই হত। তবু কত বদল হল আমাদের বাড়িতে। বাঁশের বাথরুম পাকা হল। স্যানিটারি পায়খানা হল। জলের কল এল। গ্যাসের উনুন হল। তখন মা’কে নিয়ে আমরা খুব চিন্তায় থাকতাম। টানা একমাস  মা’কে দাদা আর আমি ট্রেনিং দিলাম, কি করে গ্যাস জ্বালাতে হয়, নেভাতে হয়। মা খুব ভুলো মনের মানুষ। হয়তো গ্যাসের চুলোর নব ঘুরিয়ে গ্যাস ছেড়ে , দেশলাই জ্বালাতেই ভুলে গেলেন। তবে এক মাস লাগেনি শিখতে। তবু আমরা দেখভাল করতাম, মায়ের অর্জিত বিদ্যা কতটুকু সফল হয়েছে। মা শেষের দিকে বিরক্তই হতেন। বলতেন, যা তোরা। আমাকে আর শেখাতে হবে না। প্রতিদিন রান্নার পর কাপড় দিয়ে উনুন মুছে ঝকঝকে করে রাখতেন। রাতে বড় একটা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতেন। অনেকদিন পর্যন্ত রাতে ঘুমোবার আগে আমরা দেখে নিতাম সিলিন্ডার বন্ধ হয়েছে কি না। একটা সময় পাড়ায় সিলিন্ডার চুরি শুরু হল। বাবা একটা লোহার শিকল কিনে আনলেন। দেওয়ালে মিস্ত্রি ডেকে লোহার হুক বসানো হল। এবার ,শিকল দিয়ে সিলিন্ডার সেই হুকের সাথে তালা মেরে রাখা হত। ভাগ্যিস বাবা শিকলটা বেশ বড়ই এনেছিলেন। না হলে তো আমাদের কাজ বাড়ত। রোজ সিলিন্ডারে শিকল পড়ানো, আর সকালে শিকল খুলে উনুনে লাগানো। গ্যাসের উনুন আনা নিয়ে মায়ের আপত্তি ছিল। সেটা অবশ্য খরচ বেড়ে যাবার আশঙ্কায়। মা’কে বোঝানো হল যে এতে খরচ কমবে এবং মায়ের রান্নার ঝক্কিও কমবে। গ্যাসের উনুনের পেছনে পেছনে এল প্রেসার কুকার। সেটার ঢাকনা লাগানো শিখতেও মায়ের অনেক দিন লেগে গেল। ডান-বাম করে করে যেদিন মা প্রথম সাফল্যের সঙ্গে প্রেসার কুকারের ঢাকনা লাগিয়ে ফেললেন, সেদিন মায়ের মুখের হাসিতে এভারেস্ট জয়ের গর্ব মিশে ছিল। 


একদিন আমাদের বাড়িতে এল সাদাকালো ছোট একটা টেলিভিশন। মায়ের আনন্দ সেদিন দেখে কে। আমরা দু’ভাই মিলে বাঁশের মাথায় অ্যান্টেনা লাগিয়ে, সেটাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সিগন্যাল ঠিক করে নিলাম। বাবা অবশ্য টিভি দেখতেন না। তেমন সময়ও বাবার নেই। বাবার একটা ছোট হাত রেডিও ছিল, ওটা হাতে নিয়ে শোনা হত বলে আমরা হাত রেডিও বলতাম,   মারফি কোম্পানির ; চারটে টর্চের ব্যাটারি লাগত। বাবা ওটা নিয়ে , বিছানায় আধশোয়া হয়ে খবর শুনতেন। এভাবেই আমাদের দিনগুলো রাতগুলো ছোট ছোট আনন্দের মধ্য দিয়ে কেটে যাচ্ছিল। শুধু একদিন আমাদের পুকুরটা চলে গেল। আর তার কিছুদিন পর, আমাদের বোনটাও চলে গেল শ্বশুর বাড়ি। খাঁ খাঁ করত মনটা। অনেকদিন। ( ক্রমশ )