BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

বাংলামিডিয়াম (৯)

Bartalipi, বার্তালিপি, বাংলামিডিয়াম (৯)

হালে একটা প্রতিযোগিতা খুব জনপ্রিয় হয়েছে। তিন মিনিট কেবল বাংলা শব্দ ব্যবহার করে ভাষণ দিতে হবে। সে নাকি অসম্ভবের থেকেও এক দাগ কঠিন। আমি কিন্তু তেমন মনে করি না। কেউ চাইলেই পরীক্ষা দিতে প্রস্তুত।

নিরবচ্ছিন্ন বাংলায় আমি স্বচ্ছন্দ, কারণ আমি নিয়ম করে খবরের কাগজ পড়ি। শিরোনাম থেকে শ্রেণীবদ্ধ বিজ্ঞাপন পর্যন্ত সমান মনোযোগ দিয়ে পড়ি। স্থানীয় সংবাদদাতার খবর কখনই বাদ দিই না। যদিও আমার বিশেষ আকর্ষণ থাকে সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায়। বিশেষ করে উত্তর সম্পাদকীয়। পররাষ্ট্র নীতি থেকে স্বাস্থ্য বিমা, পেট্রোপণ্যে ভর্তুকি থেকে মহার্ঘ ভাতা, জৈব-বৈচিত্র্য থেকে অন্তর্বর্তী নির্বাচন এমনকী মহাকাশ গবেষণা পর্যন্ত মাতৃভাষায় চর্চা করি।

এই অনুচ্ছেদটা লিখে খানিকটা বিশ্রাম নিতে হল। বউ খাবার টেবিলে ডাকছে। ব্রেকফাস্ট রেডি। ছেলে একটু পরে এসে যোগ দিল। (আচ্ছা, "যোগ দিল" কি বাংলায় মান্য? কে জানে!) ছেলে বসতে বসতে বলল, "কলাম লিখছিলে? আজ অনুবাদ নিয়ে লিখছ, না?" বললাম -- "না না, অনুবাদ নয়, বিশুদ্ধ বাংলা চর্চা নিয়ে লিখব। বাংলা ভাষাটা ধীরে ধীরে ইংরেজি আর হিন্দি মেশানো জগাখিচুড়ি হয়ে যাচ্ছে। অসহ্য হয়ে উঠছে দিনকে দিন।" ছেলে উঠে গিয়ে আমার লেখার খাতাটা নিয়ে এল। বলল-- "এটা বিশুদ্ধ বাংলা হতেই পারে না। বড়জোর ইংরেজির সরাসরি অনুবাদ বলতে পার। তুমি এইমাত্র যা লিখে এলে তা একবার দেখো।" এরপর ছেলে বলে চলল-- খবরের কাগজ হলো নিউজ পেপার, শিরোনাম হেড লাইন, শ্রেণীবদ্ধ বিজ্ঞাপন ক্লাসিফায়েড অ্যাডভারটাইজমেন্ট, স্থানীয় সংবাদদাতা লোকাল করেসপন্ডেন্ট, সম্পাদকীয় পৃষ্ঠা এডিটোরিয়াল পেজ, উত্তর সম্পাদকীয় পোস্ট এডিটোরিয়াল, পররাষ্ট্র নীতি ফরেন পলিসি, স্বাস্থ্য বিমা হেল্থ ইন্সুরেন্স, পেট্রোপণ্য পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট, ভর্তুকি সাবসিডি, মহার্ঘ ভাতা ডিয়ারনেস অ্যালাউন্স, জৈব বৈচিত্র্য বায়ো ডাইভার্সিটি, অন্তর্বর্তী নির্বাচন মিডটার্ম পোল, মহাকাশ গবেষণা স্পেস রিসার্চ, মাতৃভাষা মাদার টাঙ্।

সেকি!! তবে কি অনূদিত বাংলায় কথা বলি আমি? মাতৃভাষায় কথা বলার অহংকারটা এতটাই বায়বীয়? এই যে মাতৃভাষা, এটাকে অনুবাদ বলছে কেন ও? আমার মায়ের ভাষা-- এই অর্থে মাতৃভাষা। ঠিক কখন, কোথায়, কে প্রথমবারের জন্য বাংলামিডিয়ামে 'মাতৃভাষা' শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন জানি না। যা জেনেছি সেটা হলো, পনেরো শতকের প্রথম দিকে ক্যাথলিক মঙ্কেরা চার্চের বেদিতে দাঁড়িয়ে যে ভাষায় কথা বলতেন, ল্যাটিনেতর সেই ভাষাই মাদার চার্চের ভাষা অর্থাৎ মাদার টাঙ্ হিসাবে প্রথম আখ্যায়িত হয়। পরে উপনিবেশের হাত ধরে আমাদের ভূখণ্ডে শব্দটির প্রবেশ ঘটে। ততদিনে শব্দটি তার ধর্মীয় পরিমণ্ডল হারিয়েছে। বিবর্তিত অর্থ দাঁড়িয়েছে ভাব প্রকাশের নিজস্ব ভাষা, মুখের ভাষা, প্রাণের ভাষা, নিজের ভাষা, ঘরের ভাষা। তাহলে দাঁড়াল এই যে, উপনিবেশের সংস্পর্শে এসে "Mother tongue" ধারণাটির প্রতি-প্রকাশক একটা শব্দের প্রয়োজন হলো। প্রশ্ন এখানেই যে, প্রথম পছন্দেই চট করে একটি অনুবাদ শব্দ তৈরির প্রবণতাটি কি হার এক্সেলেন্সির প্রতি প্রগাঢ় আনুগত্য প্রসূত? চিহ্নায়নের প্রক্রিয়াটি তো বৈশিষ্টবহই হওয়ার কথা ছিল। অথচ গুরুত্ব পেল অনুকৃতিতে পাশে বসার চেষ্টা। এবং অঘটনটিকে ঘটনাবহুল করতে এর সাথে জোড়া হলো মায়ের মুখে সন্তানের প্রথম ভাষা শিক্ষার ধারণাটিকে। এই অর্থারোপ নিঃসন্দেহে ভাষাশরীরে উজ্জ্বল সংযোজন, কিন্তু তাতে অনুবাদ কাতরতা ঢাকা পড়ে না। এই শব্দটি সৃষ্টির আগে বাংলা শব্দভাণ্ডারে 'মাতৃভাষা'র বিকল্প প্রকাশ ছিল নিশ্চয়। সেটা কি, নিশ্চিত ভাবে জানা নেই। মুখের ভাষা, প্রাণের ভাষা, নিজের ভাষা, ঘরের ভাষা সেইরকমেরই কয়েকটি অনুমান মাত্র। ভাষাশরীরে একটা নতুন শব্দের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে বিন্দুমাত্র আপত্তি থাকতে পারে না। থাকলে সেটা ভাষার স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর। তবে হ্যাঁ, একটি আগন্তুক শব্দের সর্বময় কর্তৃত্বে পূর্বপ্রচলিত সমার্থক শব্দগুলি অপসৃত হতে আরম্ভ করলে কষ্ট হয় বৈকি। 

ছেলে যে শব্দগুলিকে চিহ্নিত করল, তার বেশিরভাগটাই আমাদের দেশে সংবাদপত্র প্রচলনের পরবর্তীকালে সৃষ্ট শব্দ। তবে নিউজ পেপারের ধারণাটি নতুন হলেও আমাদের সমাজে বার্তা আদান প্রদানের প্রচলন সুপ্রাচীন। যুগের প্রয়োজন মেটাতে নতুন শব্দ চাই। এই নতুন শব্দ তৈরির প্রাথমিক সুযোগ এবং অধিকার দুটোই কিন্তু আমাদের হাতে ছিল। দৃশ্যত আমাদের কেউ অনুবাদ শব্দ তৈরি করতে বাধ্য করেনি। প্রচলিত শব্দের উত্তরাধিকারকে আশ্রয় করে চরিত্রবৈশিষ্টের ইঙ্গিতবহ নতুন শব্দ জুড়ে নেওয়া যেত। উত্তর সম্পাদকীয়র পরিবর্তে অতিরিক্ত সম্পাদকীয়, অথবা শ্রেণীবদ্ধ বিজ্ঞাপনের পরিবর্তে সারিবদ্ধ বিজ্ঞাপন করাই যেত। ব্যবহারিক দিক থেকে ক্লাসিফায়েড ধারণাটি কিন্তু পুরোপুরি অনুসৃত নয়। বিষয়ভিত্তিক শ্রেণীর বদলে আমাদের সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপনগুলি শ্রেণী নির্বিশেষে সারিবদ্ধ ভাবেই ছাপা হয়ে থাকে। এ বিষয়ে প্রথম আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন নগাঁও কলেজের অধ্যাপক সঞ্জয় দে। পরবর্তী অর্থে পোস্ট শব্দটির বদলে সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় ছাপা হওয়া নিবন্ধকে অতিরিক্ত সম্পাদকীয় করাই যেত। যায়নি যে তার একটা প্রধান কারণ বোধকরি মানসিক দাসত্ব। সেই ট্র্যাডিশন এখনো চলছে। এই যে বউ ব্রেকফাস্ট করতে ডাকল, প্রাতরাশ অথবা জলযোগ অথবা নাস্তা কিন্তু অবহেলায় আরো খানিকটা গুটিয়ে গেল। এটাই বিস্মরণের পথ। এতগুলো নিজস্ব প্রতিশব্দের বিনিময়ে একটি বিদেশি শব্দের সওদা লাভজনক নয় নিশ্চয়। নেহাত "উপোস ভাঙা"র মধ্যে জনমানসে প্রতিষ্ঠিত একটা ধর্মাচরণের ছবি প্রকট, নইলে বাংলা মিডিয়াম অনেক আগেই ব্রেকফাস্টকে "উপোস ভাঙা" করে নিত। রামবাবু রহিমবাবুকে বলতেন -- নিন, এবারে দাঁত ঘষে উপোস ভাঙবেন চলুন। অথচ অনেক বেশি তাৎপর্যবহ প্রাতরাশ উপেক্ষিতই থাকত।

এই অনুবাদ-কাতরতার দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল বাংলা মিডিয়ামের জন্য মোটেই স্বস্তিদায়ক নয়। আমরা শব্দের পর শব্দ হয় প্রতিবর্ণীকরণ করে চলেছি, নয়তো অনুবাদ। সৃজনশীল মননের প্রকাশ স্তব্ধ প্রায়। শুধুতো শব্দ নয়, বাক্যের পর বাক্যের মানস অনুবাদে মুখরিত বাংলা মিডিয়াম। একটু খেয়াল করে দেখলে ভাষান্তরের নন্দিত অঙ্গন, অনুবাদ সাহিত্যের ক্ষেত্রেও কিন্তু আক্ষরিক অনুবাদ আদৃত নয়। ট্র্যান্সলেশনের পরিবর্তে ট্র্যান্সক্রিয়েশনে গুরুত্ব দেওয়া হয়। তেমন হলে মন্দ হয় না। চেতনে অবচেতনে তেমন হয়েছেও। হওয়াটাই স্বাস্থ্যের। Born with a silver spoon... কেমন অবচেতনে সোনার চামচ হয়ে গেছে খেয়াল করেছেন! রূপা নয়, সোনাই তো হওয়ার কথা ছিল। আমাদের রোদ সোনার, ফসল সোনার, সোনার ছেলে, স্বপ্নও সোনার, সৌভাগ্যসূচক চামচটা রূপার হয় কী করে? সোনার চামচ তাই সফল অনুকৃতি। তবে হ্যাঁ, সোনার চামচের সর্বময় কর্তৃত্বে বিস্মরণের গর্ভে তলিয়ে যাওয়া "লগনচাঁদা" --শক্তিক্ষয় নিশ্চিত।

আরও একটা কথা, সেই নতুন প্রতিযোগিতার মতো একটা একেবারে নতুন কথা বাতাসে পাক খাচ্ছে -- ইংরেজিটা ভালো করে জানলে বাংলাটা না শিখলেও চলে, ও আপনাআপনি এসে যায়! সত্যি?

(ক্রমশ)

(লেখক টংলা কলেজের বাংলার অধ্যাপক)