BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

মহাপুরুষ শ্রীশ্রীশঙ্করদেব

Bartalipi, বার্তালিপি, মহাপুরুষ শ্রীশ্রীশঙ্করদেব

(৭)

আধুনিক অসমিয়া সমাজ গঠনে অবদান রাখা দুটি প্রধান শক্তি হল আহোম শাসক এবং শ্রীমন্ত শংকরদেব। পরিশীলিত জীবনযাপনের জন্য মানুষকে সুশিক্ষিত করে জাতপাতের ব্যবধান ঘুচিয়ে একটি শক্তিশালী সমাজ তথা একটি শক্তিশালী জাতি গঠনে শংকরদেবের গৃহীত পন্থা এবং ভূমিকা আর সেসবের সুদূর প্রসারী প্রভাব চিরকাল থাকবে। ডঃ শিবনাথ বর্মন তাঁর শ্রীমন্ত শংকরদেবের ‘কৃতি এবং কৃতিত্ব’নামের গ্রন্থে লিখেছেন 'শ্রীমন্ত শংকরদেবের জীবন তৃষ্ণা ছিল প্রবল। বলতে গেলে এই জীবন তৃষ্ণাই তাকে বাধ্য করেছিল মানবীয় জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষণে বিচরণ করার জন্য। বহুকাল ধরে স্থবির হয়ে থাকা অসমিয়া সমাজকে নতুন আদর্শের সার মাটি জুগিয়ে সজীব করে তোলার জন্য তার মন ছিল চির ব্যাকুল। তার যুগের পরিপ্রেক্ষিতে শংকরী ধর্ম ছিল এক বৈপ্লবিক আদর্শ। বিপ্লবী হয়েও তিনি ছিলেন বিনয়ী, নীতিতে দৃঢ় হয়েও তিনি ছিলেন নম্র। সাম্প্রতিককালের শিল্পী-সাহিত্যিকদের যে সমস্ত বৈশিষ্ট্য তিনি সেগুলির উর্ধ্বে ছিলেন। ধর্ম, সাহিত্য, ভাষা-সংস্কৃতি আদি সমস্ত ক্ষেত্রে নবোন্মেষের সৃষ্টি করে  অসমে নতুন জাগরণের সূচনা করেছিলেন এবং অসমিয়া কে একটি নতুন জীবন দান করেছিলেন। মহাপুরুষের সূর্য সদৃশ জ্ঞানের আলো সমগ্র অসমকে  উজ্জ্বল  করে তুলেছিল। ’জাতি  অজাতি, উচ্চ- নিচের ব্যবধান  ঘুচিয়ে  একটি সুস্থ সবল সমাজ গঠনের যে প্রক্রিয়া শংকরদেব আরম্ভ করেছিলেন তা এক সুদৃঢ় জাতিসত্তার পত্তন ঘটিয়েছে। শঙ্করদেব সমাজের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোককে সম মর্যাদা দিয়েছিলেন যদিও, প্রচলিত যে  সমাজব্যবস্থা ছিল সেই সমাজ ব্যবস্থা নির্মূল করতে চাননি। আচার-ব্যবহার রীতিনীতির শিক্ষার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেই জন্য উপযুক্ত হয়ে যোগ্যতা অর্জন করতে পারলে কোনো হীন বা নিম্ন সম্প্রদায়ের লোককে পর্যায়ক্রমে  অর্থাৎ উচ্চ সম্প্রদায়ে  উন্নীত করার অপূর্ব প্রথাটি গুরুজন প্রচলন করে যায়।

সত্র নামঘর স্থাপনের দ্বারা শংকরদেব ধার্মিক এবং সামাজিক দিক থেকে সমাজকে একত্রিত করেছেন। আসলে আদর্শ যখন রক্ষণশীল হয় তখন সমাজ সংকুচিত হয় এবং আদর্শ যখন উদার এবং গুণগ্রাহী হয় তখন সমাজ বিকশিত হয়। শংকরী তথা সত্র  সংস্কৃতির  মূল ভিত্তি ছিল গুণগ্রাহীতা। ধর্মের ক্ষেত্রে এই উদার আদর্শকে নানান ধরনের দেব দেবী এবং প্রাচীন পরম্পরাকে অতিক্রম করে সরল-সহজ ধর্মপ্রতিষ্ঠায় এই সত্র সমূহ সক্ষম হয়েছিল। সেইভাবে মানুষের মনে ভক্তি এবং কৃষ্ণের আদর্শের বীজ রোপন করে জনসাধারণের মনোরঞ্জক নাচ নিত্য পদ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। ঐক্য পারস্পরিক বোঝা বুঝির পথ মুক্ত করে ছিল এই সত্রগুলি। অসমিয়া ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতিতে মহাপুরুষ শংকরদেবের অবদান নিঃসন্দেহে অপরিসীম। সর্বভারতীয় মারগ সঙ্গীতের  ধারাটি শক্তিশালী করার জন্য তিনি বরগীত সৃষ্টি করলেন।

সাধারণত বরগীত বললে মহাপুরুষ শংকরদেব এবং মাধবদেবের রচিত কিছু গীতকে বোঝায়।এই ধরনের গীত মূলত উচ্চ নৈতিকতা এবং আধ্যাত্মিক ভাবের উপর প্রতিষ্ঠিত। অনেকেই বরগীত গুলিকে great song এবং holy song  বলেছেন। ডক্টর মহেশ্বর নেওগ বরগীতের পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের কথা কথা বলেছেন। ১.ভাষা ২. বিষয় বস্তুর সংরক্ষণশীলতা ৩. সুর ৪. চৌদ্দ প্রসঙ্গের পরিক্রমায় এর স্থান ৫. সীমাবদ্ধ পবিত্রতা। বরগীত সাংসারিক জীবনের প্রেম কাহিনি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত- আধ্যাত্মিকভাবের উপাসনা-প্রসঙ্গের গীত। শংকরদেব সৃষ্ট বরগীতের উপজীব্য বিষয়ঃ  কৃষ্ণের দৈহিক রূপের বর্ণনা, কৃষ্ণের শক্তি মাহাত্ম্যের বর্ণনা, পারমার্থিক তত্ত্ব প্রধান বিষয়, সংসার -বিরক্তি প্রকাশক বিষয়, নাম মাহাত্ম্য প্রকাশক বিষয়, খেদ প্রকাশক বিষয়, বিরহ বিষয়ক, ভক্তবৎসলতা প্রকাশক বিষয়, বিলাপ বিষয়ক। শংকরদেব প্রথমবার তীর্থ ভ্রমণ করে থাকার সময় বদরিকা আশ্রমে পনেরশো শতকের শেষদিকে ১৪৯০ সনে যে বরগীতটি  রচনা করেন তা হল 'মন মেরি রাম চরণহি লাগু।' বরগীত মূলত কৃষ্ণ কেন্দ্রিক। বরগীতের মধ্যে মহাপুরুষ শংকরদেব দাস্য ভক্তির রূপ  প্রকাশ করেছেন।

চরিত-পুথি অনুসারে শংকরদেব নিজের বারো কুড়ি  গীত রচনা করেছিলেন কিন্তু আজ পর্যন্ত প্রকাশিত ছাপা পুথিগুলিতে শংকরদেবের মাত্র ৩৪টি  বরগীত পাওয়া যায়। চরিত-পুথিতে  উল্লেখ রয়েছে যে কমলা গায়ন নামে একজন ভক্ত বরগীতগুলি গাইবার জন্য নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলে তার বাড়িতে আগুন লেগে সমস্ত গীতগুলি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। গুরুর আদেশ অনুসারে মাধবদেব নয় কুড়ি ১১টা গীত রচনা করেন বলে চরিত পুথিতে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু ছাপা পুথিতে মাধব দেবের সাত কুড়ি সতেরোটা গীত পাওয়া যায়। শংকরদেব এবং মাধব দেবের মিলিত বরগীতের সংখ্যা  ১৯১টি। এখানে বরগীতের ভাষা সম্পর্কে দু'একটি কথা বলা যেতে পারে। শংকরদেবের এবং মাধব দেব তাদের নাটকে একটি কৃত্রিম সাহিত্যিক ভাষা ব্যবহার করেছিলেন যা ব্রজবুলি নামে পরিচিত।  এই ভাষা কোনো বিশেষ জায়গার ছিল না, আসলে এটি একটি মিশ্রিত ভাষা। কোনো কোনো পন্ডিত  মৈথিলী ভাষাকে এর ভিত  বলে মন্তব্য করেছেন। অসম, উড়িষ্যা  এবং বঙ্গদেশের বৈষ্ণব কবিরা এই ভাষায় তাদের সুললিত কাব্য রচনা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে  শংকরদেবের দেহাবসানৈর সঙ্গে সঙ্গে অসমে ব্রজবুলি ভাষার গতি  রুদ্ধ হয়েছে বলা যেতে পারে। শংকরদেবের সংরক্ষিত ৩৪টি বরগীতের মধ্যে আমরা তাকে একজন গীতিকার এবং সঙ্গীতকার রূপে দেখতে পাই।  তার কবি প্রতিভার কথা অনেকে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। উত্তর ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত এবং দক্ষিণ ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে প্রচলিত রাগ সমূহের নামের সঙ্গে  বরগীতে প্রচলিত রাগ সমূহের নামের মিল দেখা যায়।

শংকরদেব এবং মাধব দেবের বরগীত গুলির বিষয়বস্তু, ভাব, রস আদির দিক থেকে এই গীতগুলিকে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়। রাজ মোহন নাথ বিষয়বস্তু, ভাব, রস ইত্যাদির দিক থেকে বরগীত গুলিকে  আট  ভাগে ভাগ করেছেন। যেমন বন্দনা, শান্তভাব অবতার, রূপ মাধুরী, দাস্য  ভাব, সখ্য ভাব, বাৎসল্য ভাব এবং মধুর ভাব। সন্দেহ নেই এই শ্রেণিবিভাজন বঙ্গীয় বৈষ্ণব পদাবলীর আদর্শে করা হয়েছে। নববৈষ্ণব পরম্পরার প্রতি দৃষ্টি রেখে সত্যেন্দ্রনাথ শর্মা বরগীত গুলিকে মোট ছয়টি ভাগে ভাগ করেছেন। পরম পুরুষের অবতারী লীলা, কৃষ্ণের বিদায়ে যশোদা  এবং ব্রজবাসীর  বিরহ-বিচ্ছেদ,  পরমা র্থিক তত্ত্ব,  বিরক্তি,  চৌর এবং চাতুরী। শংকরদেবের বরগীতে বাল গোপালের লীলা-খেলার  বর্ণনা থাকলেও তাঁর বেশিরভাগ বরগীতই  পরমার্থ বিষয়ক। মাধবদেব ও  পরমার্থিক বিষয়ক বরগীত লিখেছেন তবে তার বেশিরভাগই  বাল গোপালের লীলা খেলা বিষয়ক। শংকরদেব এবং  মাধব দেবের বরগীতে  ভগবান কৃষ্ণের দুমুখো ব্যক্তিত্বের সুন্দর প্রকাশ ঘটেছে। একদিকে কৃষ্ণ অবতার পুরুষ অন্যদিকে  দশ জনের মধ্যে একজন। শংকরদেবের প্রায় বরগীতই প্রার্থনা বা স্তুতি সূচক।

শংকরদেবের কোনো কোনো বরগীতে ভক্ত নিধি মুরারি বিষ্ণুর দৈহিক সৌন্দর্যের মধুর বর্ণনা পরিবেশন করা হয়েছে। ভক্তের পরম ধন মুরারির রাতুল চরণ যুগলে কবি মন-প্রান সমর্পণ করেছেন।-

মধুর মুরতি মুরারু।

মন দেখো হৃদয়ে হামারু।।

রূপে অনংগ সঙ্গ তুলনা তনু।

কোটি সুরুয উজিবারু।।

দুই একটি বরগীতে শংকরদেব ব্রহ্মরূপী শ্রীকৃষ্ণের লীলা-মহিমার বিস্ময়কর বর্ণনা উপস্থাপিত করেছেন। কবির ভাষায় –

দেখু সখি মধুর মূরুতি হরি।

ধরি অধরে পূরে মূরুরী।।

মায়াময় মোহাচ্ছন্ন এবং বাসনাজর্জরিত সংসারে যে মানবমন নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত দুরূহ, হরিভক্তি অবিহনে যে সংসার সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া যায়ন, তার হৃদয়সংবাদী এবং প্রভাবশীল বর্ণনা শংকরদেবের একাধিক বরগীতে দেখা যায়।–

এভব গহন বন                 অতি মোহপাশে ছয়

তাতে হামু হরিণা বেড়াই।

ফান্দিলো মায়ার পাশে              কাল ব্যাধে ধায়া আসে

কাম ক্রোধ কুত্তা খেদি খাই।।

দশ ইন্দ্রিয়, কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ-মদ মাৎসর্য এই ছয় রিপু বা বৈরী যে হরিভক্তির প্রধান অন্তরায় এবং প্রভু গোপালের চরণাশ্রয় বিনা যে লোভ-মোহের জাল ভেদ করা যায় না সেই বিষয়েও শংকরদেব একাধিকবার বিভিন্ন বরগীতে উল্লেখ করেছেন। 

জরা-মরন নিরাবরণের একমাত্র উপায় যে হরি-ভক্তি, রাম নাম যে মুক্তি-বিধায়ক, তীর্থভ্রমণ- ব্রত যাগযজ্ঞের চেয়ে যে রামনাম উত্তম, হরি-গুণ শ্রবণকারী জনই যে প্রকৃত পন্ডিত, ভক্তিপথ যে অতি সহজ পথ ইত্যাদি বিভিন্ন পরমার্থিক তত্ত্ব শংকরদেব রচিত বরগীতের মধ্যে পল্লবিত হয়ে উঠতে দেখা যায়। সংসার যে মায়ার দ্বারা রচিত, ধন-জন-পুত্র-পরিবার যে অলীক এবং অসার, হরি ভক্তিই যে সংসার সমুদ্রে একমাত্র ধ্রুবতারা এই ধরনের দার্শনিক মনোভাব শংকরদেব রচিত বরগীতে দেখা যায়। 

কৃষ্ণের বর্তমানে যে চন্দ্র, চন্দন, মৃদুমন্দ মলয় গোপিকাদের অপার্থিব আনন্দ লাভ করেছিল, কৃষ্ণের বিদায়ে সেগুলি যেন গোপিকাদের দেহে বিষ বর্ষণ করছে। এই বিরহের মাত্রা কোকিলের কূজন আরও দ্বিগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। কৃষ্ণ বিরহদগ্ধা গোপীদের করুণ অবস্থা চিত্রনে মহাপুরুষ শঙ্করদেব এখানে মধ্যযুগের কবিদের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছেন। কবির ভাষায়-

‘চান্দ চন্দন মন্দ মলয় সমীরে।

কেশব বিনে বিষ বরিষে শরীরে।।

ঘন ঘন হানয় মদন পঞ্চবাণ।

কোকিল কুহু কুহু লেহু মেরি প্রাণ।।

পঙ্কজ পাত অহিত হিম বারি।

মধুকর নিকর করয় মহামারী।।