BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

করোনাকালের ডায়েরি (৩)

Bartalipi, বার্তালিপি, করোনাকালের ডায়েরি (৩)

শেখরবাবু ফিরে এলেন বাড়ির বাস্তবে। চারপাশ দেখলেন, শ্যামলীকে চোখে পড়লো না। শ্যামলীকে দেখলেই যেন বুকটা ধক করে উঠবে! ভাস্করের পরিবারের বিষয়ে যদি আরো খারাপ খবর দেয়! এ ছাড়া শ্যামলীর তো দুই বান্ধবী আছেই, যাদের সঙ্গে ওর ফোনাফোনি লেগেই থাকে, ওরা যেন শ্যামলীকে সাপ্লাই দেওয়ার জন্য খবরের ঝুড়ি নিয়ে বসে থাকে!  আর যতসব খারাপ খবর। প্রবালদাকে কী ভাবে বোঝাবেন শেখরবাবু, বাস্তবের এই কঠিন পরিস্থিতিতে যে দুকান বন্ধ রাখা যায় না!

শেখরবাবু লেখার প্যাডটাকে ড্রয়ার থেকে বের করে ওখানে মনোসংযোগ করার চেষ্টা করলেন। একটা লেখা আধাআধি হয়ে আছে, ওটাকে শেষ করতে হবে। ক্যামুর 'দ্য প্লেগ' নিয়ে একটা লেখা দেবেন  বলেছিলেন অনলাইন পত্রিকা 'বার্তালাপ'-এর সম্পাদক প্রিয়ব্রতকে। ওর ফর্মাইস ফেলা যায় না। লেখা শুরু করেন তিনি। এগিয়ে যেতে থাকেন। লিখতে লিখতেই মনের অজান্তে ভাস্করের চেহারাটা ভেসে ওঠে লেখার পৃষ্ঠা জুড়ে। 'দ্য প্লেগে'র ভাবনাটা তো তাঁর মাথায় ঢুকিয়েছে ভাস্করই। বইটির ইংরেজি ভারশানটি  তো ওরই কেনা। শেখরবাবু অনেকটা ছিনিয়ে এনেছেন বইটি ওর কাছ থেকে। বইটি পড়তে পড়তে একদিন কি ঝোঁক চাপলো শেখরবাবুর বাংলায় অনুবাদ করবেন। ওর এই সিদ্ধান্তের কথা ভাস্করকেও জানিয়েছিলেন সঙ্গে সঙ্গে। 

--- এই ভাস্কর ' দ্য প্লেগ ' এর বাংলায তর্জমা করব ভাবছি...

---বাহ, খুব ভালো কাজ হবে, এই সিচুয়েশনে হট কেকের মতো বিক্রি হবে...

--- আরে ধুর অতো ভাবিনি, কেন যেন ঝোঁক চাপলো...

--- হ্যাঁ হ্যাঁ কর কর, অনুবাদ করতে করতে তোর মনের পরিবর্তনও হয়ে যেতে পারে, তুই তো ভীষণ ভয়ে আছিস। এ ছাড়া, ওই সময়ের মহামারীর সঙ্গে এই সময়ের এই অতিমারীর একটা চারিত্রিক মিলও খুঁজে পাবি। অনুবাদে এই মেসেজটাই দিতে পারবি। 

--- তুই বলছিস, আমি পারবো? 

--- অবশ্যই পারবি...

--- আমেরিকান ইংলিশ, অক্সফোর্ড নয়তো ওয়েবস্টার্স নিয়ে বসতে হবে, ফ্রেঞ্চও মেশানো আছে...

--- গুগুল ঘাটলেও পাবি, চিন্তা নেই, শুরু করে দে...

--- শুরু করলে কবে যে শেষ করতে পারব। একটা রিডিং তো দিয়েছি, আরো দুতিনটা রিডিং দিতে হবে...

এরপর ভাস্কর আর কিছু বলেনি। শুধু একটা ছোট্ট কাশি দিয়েছিল।

ভাবতে ভাবতে কান্না এসে যায় শেখরবাবুর। দু চোখ ভিজে ওঠে। আর লেখায় এগোতে পারেন না। ওই ছোট্ট কাশিটা যে পরে ভাস্করের দুর্মর শ্বাসকষ্টের কাশি হয়ে দাঁড়াবে কেউ তো ভাবতে পারেনি। এত তাড়াতাড়ি তাঁকে যে হতবাক করে ছেড়ে চলে যাবে সে এটাও কল্পনার অতীত ছিল।

এমন সময় মোবাইলটা বেজে ওঠে...। শেখরবাবু মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখেন ডাইনপিট্যার ফোন। সনৎ  সরখেল, কলেজের বন্ধু। ওর বাড়ি ডিফু। এখানে এসে একটি ঘর ভাড়া করে থাকতো আর পড়াশোনা করতো। সহপাঠী থেকে ধীরে ধীরে আড্ডার বন্ধু হয়ে উঠেছিল ও। আড্ডার বন্ধুদের মধ্যে ও-ই ছিল একমাত্র ডানপিটে আর বেপড়োয়া। খেপাটেপনাও ছিল। শ্মশানের সাধুদের সঙ্গে বসে নির্বিবাদে ছিলিম টানতো। কখনো কখনো দেশিও গিলতো। পাড়ার বা পরিচিত কারো আত্মীয়স্বজন মারা গেলে ওর ডাক পড়তোই। কারণ অন্ত্যেষ্টির ক্রিয়াকর্মের সব খুঁটিনাটি ওর জানা ছিল। এ ছাড়া মানুষের যে কোনো বিপদে আপদে ও অনাহূত হয়েই ছুটে যেত। তখন ওকে দেখা যেত কখনো কখনো হাসপাতালে রাত জেগে মুমূর্ষু রোগীর পাহারা দিতে, কখনো কখনো ওই রোগীর সংকট মুহূর্তে রক্ত দেওয়ার জন্য এগিয়ে যেতে। প্রথম থেকেই লক্ষ্য করা গিয়েছিল সনতের ভেতর যে একটা সেবামূলক মন আছে। ওর বন্ধু-বান্ধব অথবা পাড়া-পড়শির যত ঝামেলার কাজ ও যেচে নিয়ে নিত। কাউকেই মনমরা হতে  দিত না। করে দিত কাজটা। কিন্তু ওর বদভ্যাসটা ছাড়তে পারেনি সনৎ। ওই গোপনে শ্মশানে গিয়ে ছিলিম টানা আর দেশি গেলা। ওর এই নেশার কথা শেখর আর ওর আড্ডার বাকি বন্ধুরা ছাড়া আর কেউ জানত না। একবার সনৎ জোর করে শেখরবাবু দের নিয়ে গিয়েছিল শ্মশানের সাধুদের ওই ছিলিম টানা আর দেশি গেলার আসরে। বাড়িতে ফিরে সে রাতটা যে কী ভাবে কেটেছিল ভাবলে এখনো গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে শেখরবাবুর!  

এতো হুজ্জতির মধ্যেও কিন্তু সনৎ কলেজের সব পরীক্ষায় উতরে যেত। ওর মাথাটা পরিষ্কার ছিল। অল্প পড়লেই মনে রাখতে পারত। ও সারা বছর জুড়ে ভালো ছাত্রদের মতো পড়াশুনা করত না বা পড়ার সুযোগ পেত। ক্লাসও মিস করত বলে নন-কলেজিয়েট হয়ে ফাইন দিয়ে পরীক্ষার ফিস জমা দিত। ও শুধু পরীক্ষার আগের তিন মাস রাত জেগে পড়াশোনা করতো। ওতেই কেল্লাফতে করে দিত। টাইম আর স্টার সাপোর্টও করেছে ওকে।

... সনৎ আর ফিরে যায়নি ডিফু। কারণ, কলেজ পাশ করে বসে থাকতে হয়নি ওকে। ওই স্টারের জোরে  সরকারী ট্রেজারি অফিসে গুযাহাটিতেই চাকরি হয়ে গিয়েছিল ওর। গাড়ি বাড়ি বিয়ে থা সব এখানেই করেছে, উলুবাড়িতে। মা-বাবাকে এখানে নিয়ে এসেছে। এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে ভরা সংসার। সনতের অবসর নেওয়ার আগেই যে ওর ছেলেমেয়ে দুটো স্বনির্ভর হয়েছে শেখরবাবু শুনেছিলেন কয়েক বছর আগেই। সনতের ইচ্ছে ছিল অবসরের পর দেশ-ভ্রমণে বেরোবে স্ত্রীকে নিয়ে। কিন্তু নিস্তার পায়নি সনৎ। ওর কাঁধে এখন 'এন-আর-সি'র সার্কেল-অফিসারের দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ...ওর চোখের সামনে   যথার্থ প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অন্যায়ভাবে কী ভাবে বাঙালিদের নামগুলো বাদ দেয় ওর উপরওয়ালারা সে -কথা ও মাঝে মাঝে মোবাইলে দুঃখ করে বলে। প্রতিবাদ করতে পারে না। প্রতিবাদ করলেই তো হুমকির পর হুমকি আসবে ওর মোবাইলে।

শেখরবাবু মোবাইলটা অন করে সাড়া দেন ---

--- হ ক ডাইনপিট্যা ক্যামন আছছ?

ওপারে সনৎ চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর মুখ খোলে, অনেকটা কাঁপা কাঁপা গলায় জানতে চায়, কি শুনতাছি, ভাস্কর বলে নাই?

--- ঠিকই শুনছস রে সনৎ...

--- ক্যামতে হইল!

--- আর ক্যামতে, কোভিড...

--- শ্যাষম্যাস কোভিডেই নিল ভাস্কররে!

বলতে বলতে কেঁদে ফেলল সনৎ। মোবাইলের ওপারে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে সনৎ যে কাঁদছে।

একটু প্রসমিত হয়ে নিজেকে একটু সংযত করে আবার জিজ্ঞেস করে সনৎ, বডি দিছে?

--- না রে, বডি ত দিব না, মর্গে ফালাইয়া রাখছে, কবে যে...

আর বলতে পারেন না শেখরবাবু। গলা যেন বসে গেল।

ওপারে সনৎ নির্বাক। একটু বাদে স্যাঁতসেঁতে গলায় জিজ্ঞেস করে, ভাস্করের পোলা-মাইয়া দুইটা কী করে রে শ্যাখর?

শেখর জবাবে বলে, হেরা অ্যাসটাব্লিসড, পোলা রাহুল এএসইবি-র ইঞ্জিনিয়ার, মাইয়া তাপসী সৈদ্য এমবিবিএস পাশ করছে...

ওপারে সনৎ উচ্ছ্বাসে বলে ওঠে, বা বা যৈগ্য বাপের যৈগ্য পোলা-মাইয়া... ভাস্কর আমার বন্ধু আছিল বইলা গর্ব হইত রে শ্যাখর, হগ্গলরে কইতাম হের কথা...

বলে একটু থামে সে। তারপর আবার বলে, তুই, অঞ্জন, মানিকও আমার গর্ব... অঞ্জন ত বেংকক আছে হের পোলার লগে, কি জানি ক্যামন আছে ব্যাটায়, অনেকদিন কুনো যুগাযুগ নাই, তুই জানস নেকি কিছু?

শেখরবাবু বলে ওঠেন, অঞ্জনের মাইয়া বিপাশা ত গুযাহাটিতেই থাকে, ব্যাংকে কাম করে, অর জামাই বিশুও একি ব্যাংকে, মাজে মাজে দেখা হইয়া যায় পানবাজারে, অর লগে নয়ত বিশুর লগে, তখন অঞ্জনের খবর পাই, মাজে নাকি প্রস্টেটের একটা অপারেশন হইছে অর, অখন ভালই আছে...

--- আর মানিক ত মানিকই, বিন্দাস আছে, অর স্পোর্টসম্যান স্পিরিট অখনও রইয়া গেছে, পাড়ার পোলাপানগুলার লগে অখন-অ ক্রিকেট খ্যালে, কিন্তু ব্যাটায় কানে কম শুনে, মোবাইলে কথা কয়োন যায় না, অর বৌ বিনিতার থিকা অর খবর লই...

বলতে বলতে একটু স্মিত হেসে ওঠে সনৎ।

ওই অবসরেই শেখরবাবু শুধোবার সুযোগ খোঁজে, তর আর তর ঘরের খবর কী ক অখন? 

সনৎ হাসতে হাসতে জবাব দেয়, মা কালীর দয়ায় ভালই...

--- তর মাইয়া-পোলা দুইটাই ত বেংগালোরে, হেরা ক্যামন আছে?

--- ভালই, হেরা অখন অগ ঘরে থাক্যাই অন লাইনে অফিসের কাম করে, চাকরিটা যায় নাই এই রক্কা, কম্পানি অখন অগ আধা বেতন দেয়...

--- হ, প্রাইভেট কম্পানিগুলা ত এরমি করতাছে, আধা ব্যাতন দেয় নয়ত ছাটাই করে... অখন ক তর সময় ক্যামতে কাটে?

সনৎ সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয় না। যেন একটু দম নিল। তারপর অনেকটা বিরক্তির সুরে বলে উঠলো, আর কী ভাবে সময় কাটামু রে শ্যাখর, অখনও মাজে মাজে এই করনার মইধ্যেও এন-আর-সি অফিসে যাইতে হয়, হেরাই গাড়ি কইরা লইয়া যায়, মাজে মাজে যাইতে হয় ট্রাইবুনাল অফিসেও, ওইখানে আমারে শালা ভ্যাড়া বানাইয়া লয়, ভাল খাওন দাওন দেয়, আসল কামটা হেরাই কইরা লয়, বেশি ভ্যা ভ্যা করলে জবাই করার ভয় দেখায়... ইলেকশান আইতাসে না, হেগ তৎপরতা ত বাড়বই...

বলতে বলতে হেসে ফেলে সে। ওই হাসি নিয়েই এবার অনেকটা হেঁয়ালি সুরে বলে ওঠে, আমার কথা বাদ দে, অখন ক তর ক্যামতে কাটতাছে, গল্প-উপন্যাস ল্যাখ্তাছস ত?

--- ধুর, আর কত লেখুম, আমি না লেখলে বাংলা সাহিত্যের কুনো ক্ষতি হইব না...

---ওই শালা, কে কইছে বাংলা সাহিত্যের কুন ক্ষতি হইব না, আমি কইতাছি হইব, তর লেখন লাগব...

শেখরবাবু মনে মনে হাসেন। তিনি জানেন সনৎ কথাটা বলছে অত্যন্ত আবেগে, তাঁর প্রতি ভালোবাসার টানে।

--- চাইর পাশের যা অবস্থা দ্যাখ্তাছি হেতে কি লেখায় মন বসান যায় ক, রাইতে ঘুম আসে না, চ্যাষ্টা ত করি...

--- হ ল্যাখ, প্যানিক হইস না, এই করোনা পরস্থিতিতে তুই যা দ্যাখ্তাছস, যা শুনতাছস হে নিয়াই ল্যাখ... তুই ত কইতি লেখার মূলে থাকে আনন্দ, অখন ত হেই আনন্দ নাই, নিরানন্দর থিক্যাই তরে মালমসলা লইতে হইব...

সনতের এই কথায় শেখরবাবু চমকে উঠলেন। এ কথাটা তো তাঁর আগে মাথায় আসেনি!

--- ঠিকই কইছস সনৎ, এই আইডিয়া টা আমার আগে মনে আহে নাই, মেনি থ্যাংকস সনৎ... আমি লেখুম, আমার মনে হয় এতে কইরা একটু রিলিফ পামু... কাঁটা দিয়া কাঁটা তুলন যাইব....

--- হ ল্যাখ ল্যাখ শ্যাখর ল্যাখা, ভয় পাইয়া কি হইব, মরতে তো হইবই একদিন, তার আগে যে কামটা আমাগ করনের, হেইটা কইরা লওনেই ভাল, কী কছ ঠিক না? তবে শ্যাস কথা হইল ভাল থাকবি, সাবধানে থাকবি হগ্গলরে লইয়া...

বলতে বলতে সনৎ ওপারে মোবাইলটা বন্ধ করে দেয় ।

(পরবর্তী অংশ আগামী সপ্তাহে)