রবিবার: আউলিয়াদের বসতবাড়ি

রবিবার:-আউলিয়াদের-বসতবাড়ি
- জয়িতা দাস, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্ববিদ্যালয়, হোজাই, আসাম

মাটি বড় আজব চিজ। মায়াধারী। তাই সহজেই তার বুকে শেকড় গজায়। গাছের, মানুষেরও। আজন্মের পথিক যারা, তারাও কি আর ভুলতে পারে মাটির টান! পথে নেমেও তাই নাড়ির টান থেকেই যায়। মুসাফিরদেরও। রহমদার এক ভিনদেশি ফরিস্তা পুরুষকেও এমনি একদিন মাটি পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছিল তার কাছে, শ্রীহট্টে। শেকড় ছড়ানোর জন্য। এসেছিলেন তিনি এক রূপকথার নগর থেকে। লোকে যাকে মক্কা নামে চেনে। মুরশিদের নির্দেশে তাঁর পথিক হওয়া। আল্লার নাকি তেমনি ইচ্ছে। হিন্দুস্থানে গিয়ে ধর্মপ্রচার করতে হবে তাঁকে। নেক বান্দা বলেই আল্লা তাঁকে এই কাজের জন্য বেছে নিয়েছেন, সেদিন কানের কাছে মুখ এনে বলেছিলেন তাঁর মুরশিদ আহমদ কবির।


অতএব ভিনদেশে পাড়ি। যাত্রার মুহূর্তে, মুরশিদের রহমত যাচ্ঞা করতে গেলে এক আজব তোফা সেদিন তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন কবির। তুলে দিয়েছিলেন এক মুঠো মাটি। খোদ মক্কার মাটি। আর শুনিয়েছিলেন এক দৈববাণী, ‘যেখানেই যাও, বসত কিন্তু তোমার এই মাটিতেই। মক্কার পাক মিট্টি ভিনদেশেও তোমার অপেক্ষায়। তোমায় খুঁজে নিতে হবে শুধু। আর যখন খোঁজ পাবে, তখন তোমার মুঠির মিট্টির সঙ্গে মিলিয়ে নিও এর বর্ণ-গন্ধ-স্বাদ।’ 


এরপরের ইতিহাস পথ চলার। ইয়েমেন ছেড়ে হিন্দুস্থানের উদ্দেশ্যে। সঙ্গী মাত্র বারোজন অনুগামী। চলতে চলতে সেই অনুগামীর সংখ্যা বেড়ে তিনশো ষাট। আর একদিন পায়ে পায়ে দিল্লি পৌঁছে যাওয়া। সেই শুরু। দৈব নির্দিষ্ট ভূমির সন্ধান। তা শেকড়ের মাটি খুঁজে পাওয়া কি এতই সোজা! মুসাফিরের দল সমস্ত ভারত চষে বেড়ান। আর একদিন কত জনপদ, নদ-নদী-অরণ্য পেরিয়ে পৌঁছে যাওয়া সেই সব পেয়েছির দেশে, যে দেশ কিনা মক্কার মাটি দিয়ে গড়া। অবশ্যই স্বাদ-গন্ধ-বর্ণ-- সব পরখ করে নেওয়া হয়েছিল নিশ্চিত হওয়ার জন্য। সওওওব মিলে যায়। খোদ চাশ্‌নি পির দিয়েছিলেন দরবেশকে এই সুখবর। এরপরও কি আর সন্দেহ থাকে! 


চাশ্‌নি পির। মুরশিদের প্রথম বারো জন অনুগামীর অন্যতম। সিলেটের গোয়াইপাড়ায় রয়েছে তাঁর সমাধি। তা এই চাশনি পিরকেই মাটির তবিলদারি সমঝে দিয়েছিলেন মুসাফির। সফর কালে যখনই কোনো নয়া আবাদে পা পড়ত দলটির, সঙ্গে সঙ্গে সেখানকার মাটির স্বাদ চেখে দেখতেন তিনি। মুরশিদের নির্দেশেই। এই কাজই তাঁকে দেয় এই নতুন পরিচিতি-- চাশ্‌নি পির। এহেন চাশ্‌নি পিরের মুখে আল্লা নির্দিষ্ট জনপদের সন্ধান পেয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন শাহজালাল। হ্যাঁ, সুফি সাধক শাহজালালের কথাই বলছি, পূর্ববঙ্গে দরবেশি সাধনার সূত্রপাত যাঁর হাতে। শ্রীহট্টের মাটিতে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন শেকড়ের সন্ধান। কর্মক্ষেত্র হিসেবে তাই এই অঞ্চলকেই বেছে নেওয়া। 


আর তাঁর ছায়াসঙ্গী তিনশো ষাট আউলিয়া? শ্রীহট্টে পৌঁছে তাঁরা তখন শাহজালালের নির্দেশে ছড়িয়ে পড়েছিলেন এদিক-ওদিক। শ্রীহট্ট থেকে ত্রিপুরা, রংপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকা-- পূর্ববঙ্গের সর্বত্র। অবশ্যই ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে। সে চোদ্দ শতকের গোড়ার কথা। তাঁরা বন কেটে বসত গড়েন, মিতালি পাতান স্থানীয়দের সঙ্গে। আর কিছুদিনের মধ্যেই এই আউলিয়ারা স্থানীয় অধিবাসীদের আপনজন। তাদের মসিহা। তাদের বন্ধু, অভিভাবক, মুরুব্বি। 


হ্যাঁ, আরবি ‘অলি’ শব্দের অর্থ বন্ধুই। অভিভাবকও। বহুবচনে আউলিয়া। তা এই আউলিয়ারা তাঁদের স্বভাবগুণেই এখানকার নিম্নবর্গীয় মানুষদের বন্ধু, মুরুব্বি হয়ে উঠেছিলেন। খানদানি পরিবারের সন্তান সব। দেখে, মেলামেশা করে অবশ্য বোঝার উপায় নেই। এতই সাধারণ তাঁদের জীবনচর্যা। আর খুব দরদি। গরীব-গুর্বোর জন্য তাঁদের জান কোরবান। উচ্চবর্ণীয়দের হেনস্থা, অত্যাচারে অভ্যস্ত যারা, তারা আউলিয়াদের এহেন ব্যবহারে অবাক হয়েছিল। এর আগে এমন করে এভাবে কেউ তাদের বুকে টেনে নেয়নি যে! অতএব, কিছুদিনের মধ্যেই এই পিরেরা তাদের রক্ষাকর্তা, তাদের মুরুব্বি হয়ে উঠেছিলেন। তাদের নিয়ে মুখে মুখে তৈরি হয় কিস্‌সা। সেই কিস্‌সা তাঁদের অলৌকিক কারনামার কথা বলে। বলে, এমনই তাঁদের অলৌকিক ক্ষমতা যে, বনের পশুরাও তাদের সামনে বশ। বশ পাহাড়, নদী, জঙ্গলও। ফলে  জীবৎকালেই তাঁরা কিংবদন্তী। ক্রমে সেই কিংবদন্তীপুরুষরা লাভ করেন দেবতার আসন। 


সেই ধারা মেনেই করিমগঞ্জেও আবির্ভূত হয়েছিলেন লোকদেবতারা। তিনশো ষাট আউলিয়াদের মধ্যে অনেকেরই যে কর্মস্থল ছিল এই অঞ্চল। আর হ্যাঁ, করিমগঞ্জও তখন সিলেটের অংশ। এর পাঁচশো বছরের মধ্যেই, ইংরেজ আমলে করিমগঞ্জ হয়ে উঠবে শ্রীহট্ট জেলার অন্যতম সাবডিভিশন। ৬ মে, ১৮৭৬ সনের ‘আসাম গেজেট’-এর একটি নোটিফিকেশন দিচ্ছে এই তথ্য-- “The District was divided into the four following subdivisions:-- (1) The Sadr, or Headquarters; (2) Sonamganj; (3) Laskarpur; (4) Latu, or Karimganj.”  


রাজনীতি সিলেটিদের বাঁধন আলগা করতে চেয়েছিল। পারেনি। আর পারেনি বলেই করিমগঞ্জসহ সমগ্র বরাক উপত্যকাবাসীর শেকড় আজও সিলেটের মাটিতেই প্রোথিত। সিলেটি, এই পরিচয় আজও বরাকবাসীর গর্ব, তাদের অহংকার। সিলেটি, এই পরিচয় এখানকার হিন্দু-মুসলমানকে এখনও এক সূতায় গেঁথে রাখে। সিলেটি মানেই আত্মার আত্মীয়-- উপত্যকার মানুষ এই আপ্ত বাক্যে বিশ্বাসী। সুফি দরবেশ শাহজালাল তাই তাদের খুব কাছের মানুষ। হিন্দু-মুসলমান, উভয়ের কাছেই। হ্যাঁ, ভিন দেশি মানুষটা হিন্দুদের মনও জয় করে নিয়েছিলেন। ধর্ম ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও। প্রবীণেরা তাঁদের এই আদরের দুলালের স্মৃতি যত্নে আগলে রাখেন। মাটির টানই যে আসল সত্য, এর ওপরে কিছু নাই। প্রাকৃতজনের সাধ্য কী মাটির সেই স্বাদ-বর্ণ-গন্ধের যোগকে অস্বীকার করে! স্মৃতির বাহারি কৌটোয় মুরশিদ ধনকে তাই তারা এত যত্নে আগলে রাখে। 


সুতরাং এই অঞ্চলের হিন্দু ছানাপোনারাও বড় হয় দরবেশ শাহজালালের গল্প শুনে। বলতে গেলে এই গল্পকথাগুলির মধ্য দিয়েই তাদের ইতিহাসচর্চায় হাতেখড়ি হয়। তারা জানে, অচিন পাখির মতো এই দরবেশকে ঠাঁই দিতে হয় মনের খাঁচায়। তাঁকে ভালবাসতে হয়। শ্রদ্ধা করতে হয়। মনের বেড়ি কি আর এমনি খুলে! এর কাছে যে ধর্মের দোহাই তুচ্ছ। প্রবীণদের মুখে শুনেছে তারা, শাহজালাল কখনও হিন্দুর মন্দির ধ্বংস করেননি। এর সমর্থন পাওয়া যাবে ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্তেও। যেখানে অচ্যুতচরণ বলছেন, “কেহ কেহ বলেন যে, শ্রীহট্টের গ্রীবাপীঠ নষ্ট করতঃ শাহজালাল তৎস্থলে দরগা প্রস্তুত করেন। ইহা নিতান্ত অমূলক কথা। শাহজালাল হিন্দুতীর্থ বিনষ্ট করিলে, মোসলমান লেখকগণ-- বিশেষতঃ সুহেল-ই-এমনের গ্রন্থকার তদীয় জীবন চরিতে তাহা সগৌরবে ঘোষণা করিতেন।” 

     

শাহজালালকে হিন্দুরা তাই শ্রদ্ধার চোখে দেখে। ভিন মুলুকের এই ফরিস্তা তাদের বড় আদরের। আদর করে তারা আউলিয়াদেরও। এঁদের মধ্যে অনেকেরই বসত ছিল এই অঞ্চলে। এখানকার নদী-গ্রাম-রাস্তার পাশে আজও শেষ শয্যায় শুয়ে আছেন তাঁরা। কখনও চলার পথে এই আউলিয়াদের সমাধির মুখোমুখি হলে তাঁদের মাজারে মাথা ঠেকানোর কথা হিন্দু ছানাপোনাদের শিখিয়ে দিতে হয় না। প্রাচীনদের দেখেই তো তাদের বড় হওয়া। অতএব, মাথা তাদের এমনিতেই নত হয়। পারিবারিক-সামাজিক অভ্যেসে। 


এই অঞ্চল এভাবেই এই ফরিস্তাদের ধারণ করে। আচারে, সংস্কারে, ধর্মে। এমনকি স্থাননামেও। বদরপুর যেমন। সৈয়দ বংশের পুরুষ হজরত শাহ বদর। এই বদর শাহ্‌ থেকেই বদরপুর। বরাকের তীর ঘেঁষে ছিল তাঁর আস্তানা। বদরপুর দুর্গের পাশেই। বরাকের ভাঙন গ্রাস করেছে সেই মাজার। গ্রাস করেছে সিকন্দর শাহের দরগাও। রয়ে গেছে শুধু আদম খাকির মাজার আর শাহ্‌ আবদুল মালিকের দরগা। বদরপুরেই। জিয়াউদ্দিনের মাজারও ছিল এখানেই। একই অঞ্চলে পাঁচ পাঁচ জন আউলিয়া। সমস্ত করিমগঞ্জ জুড়ে এমনি কত আউলিয়া ছড়িয়ে পড়েছিলেন। বদর শাহ্‌, সিকন্দর শাহ্‌র মতো অনেকের মাজারেরই এখন আর কোনো চিহ্ন নেই। 


 

বদরপুরের কেল্লার পেছনে বরাক নদী। এখানেই কোথাও ছিল বদর শাহ্‌র মাজার।


মাজার গেছে। তাই বলে কি আর লোকের মন থেকে মুছে গেছে তাঁদের স্মৃতি। বরং তাঁদের নিয়ে লোকমুখে শোনা যায় কত না কিংবদন্তী। বদর শাহ্‌ যেমন। জনমত, মাঝিরা যে দোহাই পাড়ে বদরের নামে, এই বদর শাহ্‌ই সেই দোহাইয়ের উৎস। আবার আর এক দলের মতে শাহজালালের অন্য এক অনুগামী, চট্টগ্রামে যাঁর মাজার রয়েছে, সেই বদরউদ্দিন আউলিয়ার নাম রয়েছে এর মূলে। দুই ব্যক্তিত্বের মধ্যে কার ভূমিকা যে এক্ষেত্রে কাজ করছে, এই ব্যাপারে এত বছর পর কি আর নিশ্চিত হয়ে কিছু বলা যায়? যায় না বটে, তবে অমোঘ সত্য হচ্ছে এই যে, জলযাত্রায় যে বদরের দোহাই পাড়ে মাঝিরা, সেই বদর ছিলেন এই তিনশো ষাট আউলিয়াদের মধ্যেই একজন। বরাক উপত্যকার প্রাচীনেরা বলে থাকেন, বদরপুরে বরাকের তীর ঘেঁষে বদর শাহের যে দরগা ছিল, সেই জায়গা পার হওয়ার সময় মাঝিরা চিৎকার করে বদরের রহমত মাঙ্‌ত। 


তা এই দুই বদরই ছিলেন শাহজালালের খুব কাছের লোক। তাঁর প্রথম বারোজন অনুগামীর অন্যতম। শুধু গৌড় গোবিন্দের সঙ্গে যুদ্ধেই নয়, তরফের রাজা আচাক নারায়ণের সঙ্গে যুদ্ধের সময়ও সিপাহসালার নাসিরুদ্দিনের পাশে ছিলেন এই দুজনই। ছিলেন শাহজালাল-ঘনিষ্ট অন্য দশ আউলিয়াও। 


 

বদরপুরে শাহ্‌ আদম খাকির মাজার 


তা বদর শাহের মতো আরও কত কত শাহজালাল ঘনিষ্ট আউলিয়ার বিচরণক্ষেত্র ছিল এই করিমগঞ্জ। মুরশিদের নির্দেশে এঁরা সবাই ছড়িয়ে পড়েছিলেন করিমগঞ্জের দুর্গম অঞ্চলে। গভীর অরণ্যে বসত গড়েছেন, মোকাবিলা করেছেন অরণ্যচারী পশু ও মানব-- উভয়েরই। আর সে সাহস আর বুদ্ধিমত্তার সঙ্গেই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে অবশ্য শাহজালালের শরণ নিতেন কেউ কেউ। জিয়াউদ্দিন যেমন। তাঁকে পাঠানো হয়েছিল বুন্দাশিলে। বদরপুরেরই একটা অংশ এই বুন্দাশিল। তৎকালীন গৌড় রাজ্যের পূব-প্রান্তের শেষ সীমা। সেখানে তখন ‘দেও’দের মস্ত উৎপাত। রাতবিরেতে ঝাঁপিয়ে পড়ত এরা। প্রস্তুতির বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়ে। তারপর যা হয়। অবাধ লুটপাট, হত্যা। ফলে একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। এতটাই যে, লোকে লড়াইর কথা ভাবতেই পারত না। এই পরিস্থিতিতে একজনের কথাই মনে পড়েছিল জিয়াউদ্দিনের। অতএব, তাঁকেই চিঠি লেখা। 


এখন প্রশ্ন হল কারা এই ‘দেও’? ‘সুহেল-ই-ইয়েমেন’। শাহজালালের জীবনী। লেখক নাসিরুদ্দিন হায়দর। তিনি ‘দেও’ শব্দটিকে আক্ষরিক অর্থেই গ্রহণ করেছেন। বলেছেন, আসলে এ ছিল জিন, ভূত বা প্রেতাত্মাদের উৎপাত। পরবর্তীতে ইতিহাস অবশ্য শব্দটির স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছে। সেই ব্যাখ্যা অনুযায়ী শ্রীহট্টের এই সীমান্ত অঞ্চলে তখন পার্বত্য উপজাতিদের মস্ত দৌরাত্ম্য। হয়ত রাতের অন্ধকারে অতর্কিতে হানা দিত বলেই এদের ‘দেও’ বলা হয়েছে।


তা ‘দেও’ বলা হচ্ছে যাদের, তাদের মোকাবিলা কি আর সাধারণ লোক করতে পারে! একমাত্র দেবদূতই পারেন তাদের শায়েস্তা করতে। তাই শাহজালালকে চিঠি লেখা। মুশকিল আসানের জন্য। নিরাশ হতে হয়নি। পত্রপাঠ শাহজালাল চলে এসেছিলেন বুন্দাশিল। এবং দুরন্ত ‘দেওরাই’দের শায়েস্তা করে শান্তি ফিরিয়ে এনেছিলেন এই অঞ্চলে। দেওরাইল নাম সেই ইতিহাসের সাক্ষী বহন করছে আজও। 


শাহজালালের এ এক অলৌকিক কারনামা। কেন বলছি? বৃটিশ আমলের পুরনো গেজেট ঘাঁটলেই পাওয়া যাবে এর উত্তর। সাড়ে চারশো বছর ধরে এই পার্বত্য উপজাতিরা একইভাবে জ্বালাতন করে গেছে শাসকদের। দিল্লি দরবার থেকে বৃটিশ শাসকদের প্রতিনিধি, কাউকেই স্বস্তিতে থাকতে দেয়নি। এতটাই যে তাদের রুখতে শেষ অব্দি বুন্দাশিলে কেল্লা তৈরি করতে হয়েছিল। বদরপুরে সেই দুর্গের ভগ্নাবশেষ রয়ে গেছে আজও। 


এসব অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিককার কথা। শ্রীহট্টের নতুন নবাব-ফৌজদার হয়ে এসেছিলেন এক মিরাট-তনয়। অ্যালেন সাহেব যাঁকে মুহম্মদ নবাব বলে উল্লেখ করেছেন। তা এই নবাব সাহেব দূরদর্শী লোক। একেবারে প্রস্তুত হয়েই এসেছিলেন। গোলন্দাজবাহিনী সহ।  সেই বাহিনীতে মুসলমান, খ্রিস্টান (সম্ভবত পর্তুগিজ) উভয় দলই ছিল। বোঝাই যাচ্ছে, সীমান্ত প্রহরার ব্যবস্থা বেশ পোক্ত করে তুলেছিলেন তিনি। এরপরও চোরাগোপ্তা হানা হত। ইংরেজ ঐতিহাসিকদের লেখায় পাওয়া যাবে সেই সব তথ্য। 


বোঝা গেল নিশ্চয়ই, এই দুর্ধর্ষ হানাদারদের জব্দ করার জন্য জিয়াউদ্দিনকে কেন  শাহজালালের শরণ নিতে হয়েছিল। দুর্গ তৈরিরও প্রায় চারশো বছর আগেকার কথা বলছি। রাজা পাল্টালে কি আর প্রজার নসিব পাল্টায়? পাল্টায় না বলেই গৌড় গোবিন্দের পরাজয় থেকেও সাধারণ মানুষের ওপর এমনতর ঘটনা বেশি প্রভাব ফেলেছিল। দরবেশের একের পর এক অদ্ভুত সব কারনামা দেখে তারা তখন নিশ্চিত, এই লোক তো লোক নয়, দেবতা নিশ্চয়ই। 

 

‘দেও’রাইদের হানার সাক্ষী বদরপুরের কেল্লার ভগ্নাবশেষ  


এই সময়কালে একের পর এক অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী থেকেছে বদরপুরের মানুষ। সুরমার কথাই ধরি না কেন! দেওরাইলের দেওদের শায়েস্তা করার পর বেশ কিছুদিন এখানেই থেকে গিয়েছিলেন শাহজালাল। জনশ্রুতি, সেই সময় সুরমার জল মোটেই সুপেয় ছিল না। তা দরবেশের ক্যারিশ্মায় দেখতে দেখতে সুরমার জল সুপেয় হয়ে ওঠে। 


ঐতিহাসিকরা অবশ্য এর অন্য এক যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, দেওরাইলের খুব কাছেই বরাক দুভাগে ভাগ হয়ে গেছে। সুরমা আর কুশিয়ারা, এই দুই নামে। সুরমার তখন ভরাভরতি যৌবন, আর কুশিয়ারা ছিল শান্ত ছিপছিপে এক কিশোরী। উদ্দাম বরাক তাই মজেছিল সুরমাতে। তার পাগলপারা স্রোতে সুরমাও বানভাসি। আর একদিন, বরাকের খেয়ালে কুশিয়ারাও যুবতী হয়। বরাকের স্রোতসোহাগে বাড়ে তার দুরন্তপনা। কমলা মেখলা জড়িয়ে ভেসে যায় স্রোতে। আর সুরমা? স্রোতের বাহুল্য খসতেই শান্ত-সুনীলা সে। সে এক মোহিনী রূপ। যে রূপে মজেছিলেন খোদ ইবন বতুতা। এতটাই যে, সেই সুনীলসুন্দরীকে উপহার দিয়েছিলেন এক নতুন নাম, নহর-উল আজরক-- নীল নয়না নদী। 


তা ঐতিহাসিকরা যাই বলুন, এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ কিন্তু বিশ্বাস করেছিল দরবেশের ক্যারিশ্মাতেই সুরমার এমন পরিবর্তন। তার জল এমন মিষ্টি, সুপেয়। শাহজালালের এমনি আরও কত কারনামার খবর আসে তাদের কানে। এরপরও কি আর সময় নষ্ট করতে হয়? নিশ্চিন্তে, আগ্রহের সঙ্গে নিম্নবর্গীয়রা গ্রহণ করেছিল ভিনদেশি ফরিস্তার ধর্ম। এই নতুন ধর্ম জাতপাতের ঊর্ধ্বে তাদের দিয়েছিল এক নতুন পরিচয়। নতুন ধর্ম। কিন্তু সুফিবাদের সহজিয়া সাধন পদ্ধতি, এর উদারতা তাদের সামনে এমন এক পরিসর তৈরি করেছিল যে খুব সহজেই নতুন ধর্মের সঙ্গে একাত্ম বোধ করেছিল তারা। কারণ এই নতুন ধর্ম প্রাচীন ধর্মের সংস্কার পালনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি, বরং কিছুটা প্রশ্রয় দিয়েছে। 


হ্যাঁ, প্রশ্রয় ছিল। ছিল উদারতাও। ছিল আরও কিছু বাস্তব কারণ। ইসলামের জন্মস্থান থেকে অনেক অনেক দূর দেশে এসে, বাংলার মুসলমানদের স্বদেশ বিচ্ছিন্ন জীবনে তখন ভিনদেশের জল-মাটি-হাওয়ার ছায়া পড়তে শুরু করেছিল। বিজেতা যদিও, তবু ভিন্ন সংস্কৃতির ধারকদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা গাঢ় হয় ক্রমে। মুষ্টিমেয় তারা। হাতে তলোয়ার ছিল, কিন্তু বৈরির সংখ্যাও ছিল অগুন্‌তি। অতএব স্থানীয় বিশ্বাস আর প্রথার বিরোধীতার কথা তেমন ভাবা হয়নি। তাই বলে ধর্মান্তীকরণ বন্ধ ছিল না। বরং জোর দেওয়া হয়েছিল প্রচারে। এতে কাজ হয়েছিল। নবির শরণ নিতে শুরু করেছিল নিম্নবর্ণের হিন্দুরা। প্রাচীন সংস্কার আর বিশ্বাসও অনুগামী হয় তাদের। না, নতুন ধর্মের পথ প্রদর্শকদের একবারও মনে হয়নি এ অপরাধ। ওয়াহাবি আন্দোলনের আগে অব্দি এটাই ছিল স্বাভাবিক। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতাকে কেউ বড় করে দেখেনি। এই ধর্মের কথা বুঝিয়ে বলে, গাঁ-গেরামে তেমন কেউ ছিলও না। পিররা সব আপন ভোলা। সেবা ধর্ম সার তাদের। সহজিয়া পথ ধরেই তাদের পথ চলা। মৌলবিরাও তখন গেরামে দূর অস্ত। সুতরাং মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করেও আচার-বিচার-সংস্কারে তারা আসলে হিন্দুই ছিল। 


ছিল গুরুবাদে বিশ্বাসী। পিরদের উপাসনার ক্ষেত্রে সেই গুরুবাদের ছায়া পড়ে। তাঁদের প্রতি আস্থা, বিশ্বাস, ভরসা থেকে আরোপিত হয় দেবত্ব। অবশ্যই ইসলাম ধর্মের মোড়কে। এর পুষ্টিলাভ গ্রামীণ সমাজেই। যে সমাজে বর্ণহিন্দুর উপস্থিতি তখনও প্রায় শূন্য। আর শূন্য বলেই এই সমাজ মুক্ত ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু সংস্কার থেকেও। তাই কোনো কোনো অঞ্চলের কালীবাড়িতে মুসলমান উৎসজাত লৌকিক দেবতারও ঠাঁই হয় সহজে। কেউ আপত্তি তোলে না। বরং হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ই তাঁকে মাথায় তুলে রাখে। আর রাখে বলেই সত্যপিরের পাঁচালিতে লেখা হয়, ‘হিন্দুর দেবতা হইল মুসলমানের পীর।/দুই কুলে লয়ে সেবা হইল জাহির।।’ হিন্দু-মুসলমান মিশ্র সংস্কৃতি এমনি কত লোকদেবতার জন্ম দিয়েছে। শ্রীহট্টে শাহজালালের অনুগামী আউলিয়ারাই লাভ করেছিলেন এমন লোকদেবতার আসন। অবশ্যই তাঁদের অলৌকিক কারনামার জন্য। তাঁদের নিয়ে তৈরি হয়েছে মিথ। 


শ্রীহট্টের অংশ ছিল যখন, তখন করিমগঞ্জেও এর ছায়া পড়বে না, সে কি হয়? হয় না বলেই বদর শাহ্‌কে নিয়ে কিংবদন্তী তৈরি হয়। কিংবদন্তী তৈরি হয় সইজা বাদশাকে নিয়েও। হ্যাঁ, বাদশা। মালিক। অধীশ্বর। এই দুনিয়ার যত অরণ্য, পাহাড়-- সব, সওওব তাঁর অধীন। তাই তো তিনি বাদশা। গাঁ-গেরামের লোক কি আর দিল্লির বাদশাকে চেনে? তাঁরা চেনে এই সইজা বাদশাকে। এই বাদশা তাদের দেখভাল করার মালিক। অতএব, তারা তাঁর খাতিরদারি করে, পূজা করে। এই বাদশা তাদের নিজের লোক, আপনজন। ভিনধর্মী, তবে সেই পরিচয় ভরসা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং আদর করে তারা তাঁকে ঠাঁই দেয় তাদের পবিত্র ভূমিতে। 


হ্যাঁ, পবিত্র ভূমি। যে ভূমিতে তারা একদা স্থাপিত করেছিল দেবী কালীকে। সেই দেবীর মন্দিরের পাশেই ঠাঁই হয় তাঁর। বাদশার। না, তাঁর জন্য কোনো মন্দির তৈরি হয় না। ইট আর মাটি দিয়ে তৈরি হয় উঁচু বেদী। বাদশার উৎস পরিচয়ের কথা ভেবেই। পিরের মাজার যেমন হয়, তেমনি বাদশার ঠাঁই। মাজারের মতো দেখতে যদিও, তারা কিন্তু ‘থান’ই বলে। দেবতার ঠাঁইকে যে তারা ‘থান’ বলতেই অভ্যস্ত, অতএব বাদশার মাজারও ‘থান’। সেই থানে কোনো বিগ্রহের প্রতিষ্ঠা হয় না। নিরাকার তিনি। সেও ইসলামের ঐতিহ্য মেনেই। বাদশা অধিষ্টিত কালীবাড়িগুলিও সেই থেকে লাভ করে এক নতুন পরিচয়-- মোকাম। মানে বাসস্থান। বাদশার বাসস্থান। কালীবাড়ি মোকামও বলেন কেউ কেউ। 


হিন্দু দেবদেবীদের মধ্যে কালীই বুঝি সবচেয়ে বেশি ভয়ঙ্করী। সেই দেবীর মন্দির-আঙিনায় কত সহজে ভিন ধর্মের উৎসজাত এক দেবতাকে জাঁক করে এনে বসানো হলো। কোনো হুলুস্থুল হয়নি। ধর্মীয় আবেগ এতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বাদশা যেমন মুসলমানের, তেমনি হিন্দুরও-- এই বিশ্বাস, এই আবেগ এহেন অসম্ভব সহাবস্থানকে সম্ভব করে তুলেছিল। 


এমনই বাদশার ক্যারিশ্মা। তা কে ছিলেন এই সইজা বাদশা? সরকারি নথি বলছে, “In the Pratapgarh pargana, to the south of  Karimganj, there are several Mukams which are said to have been founded by one of the Badshahs of Delhi, who turned fakir and settled in that lonely spot.”  অচ্যুতচরণ আপত্তি তুলেছেন। যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করেছেন এই মত। বলছেন, এত বড় একটা ঘটনা, অথচ লোকমুখে এর কোনো ইতিহাস থাকবে না, সে কি হয়! বলছেন, “... লোকে সহিজা বাদশাহর নামই উল্লেখ করিয়া থাকে, দিল্লীর কোন শাহজাদা বা বাদশাহর উল্লেখ করে না।”  সত্যিই তো, নবাব কিংবা বাদশাজাদা ফকির হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, এমন ঘটনা তো আর রোজ রোজ ঘটে না। আর ঘটে না বলেই তেমন কিছু হলে লোকে এই নিয়ে গান বাঁধত, কিস্‌সা শোনাত। কই, তেমন কিছু তো হয়নি! 


তাহলে? এর জবাব দিচ্ছেন অচ্যুতচরণই। তাঁর দাবি, শাহজালালের শিষ্য তিনি। তিনশো ষাট আউলিয়াদের একজন। তাঁর আসল নাম, শহিদ হামজা। পাঁচশো বছরের বিবর্তনে যা দাঁড়িয়েছে সইজাতে। শহিদ হামজা থেকে শহিদামজা, শহিদাজা, সহিজা থেকে সইজা।  এই শহিদ হামজার বশ ছিল বনের বাঘও। শোনা যায়, বাঘের পিঠে চেপে শ্রীহট্টে এসেছিলেন তিনি। ‘শ্রীহট্টদর্পণ’ বলছে এই জনশ্রুতির কথা। বোঝাই যাচ্ছে, জীবিত থাকতেই তিনি কিংবদন্তী, আর মৃত্যুর পর দেবতা। যে সে দেবতা নয়, একেবারে বাঘের দেবতা। সুন্দরবনের দক্ষিণ রায় কিংবা বড় গাজি খান যেমন। প্রাকৃতজনদের বিশ্বাস, এই সইজা বাদশার ভক্তরা বাঘের অবধ্য। তাই তাঁর মোকামে পুজো না দিয়ে ব্যবসায়ীরা কক্ষনো কাঠ সংগ্রহ করতে জঙ্গলে যেত না। সইজা বাদশাকে নিয়ে এমনি কত গল্প। এও শোনা যায়, মোকামে পড়ে থাকা বাদশার পুজোর উপচার চেখে দেখতে নাকি রাতবিরেতে বাঘ এসে হাজির হত। কখনও এমন হয়েছে, কোনো ভক্ত হয়ত রাতে আশ্রয় নিয়েছে মোকামে, কিন্তু বাঘ তার কোনো ক্ষতি করেনি, আমল দেয়নি তার অস্তিত্বে। 


তা হঠাৎ এই অঞ্চলে বাঘের দেবতা! অ্যালেন সাহেবের গ্যাজেট বলছে, করিমগঞ্জের প্রান্তভাগে তখন গভীর জঙ্গল। আর জঙ্গল রয়েছে অথচ বাঘের উৎপাত থাকবে না, সেকি হয়! স্থানীয়রা অবশ্য ভয় পায়নি। তারা লড়াই করেছে। টিকে থাকার লড়াই। এই লড়াইয়ে মনের বল একটাই, বাদশার ছায়ায় আছে তারা। ফলে মোকাবিলা অনেকটাই সহজ হয়েছে। বাঘ আর মনুপুত্রদের লড়াইয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে বাঘ। বাদশার বরে তারা সব কুশলী শিকারী তখন। এতটাই যে, বাঘের ডেরা খুঁজে বের করে রীতিমতো তাকে আক্রমণ করত তারা। দল বেঁধে অবশ্যই। খোদ অ্যালেন সাহেব দিয়ে গেছেন তাদের এই বাঘ শিকারের বর্ণনা।  


আর একটা জিনিস লক্ষ্য করার মতো, বাদশার সব মোকামই কিন্তু ছিল করিমগঞ্জের সীমান্ত অঞ্চলে। যেখানে গভীর অরণ্য। বাঘের ডেরা থেকে অক্ষত শরীরে ফেরা চাই তো! আর তা নিশ্চিত করতেই সীমান্ত প্রান্তে, অরণ্য-লাগোয়া অঞ্চলে তাঁর ঠাঁই। সে ছাগল মোহার মোকামই হোক কিংবা চড়া টিকর মাজার। এর মধ্যে প্রথম মোকামটি রয়েছে করিমগঞ্জের দক্ষিণ প্রান্তে পাথারকান্দিতে, আর দ্বিতীয়টি উত্তরপূর্বে কালাইনের কাছে বরইতলিতে। খাতায় কলমে পাথারকান্দি অবশ্য তখন প্রতাপগড়। এদিকে পূব সীমান্তে ছিল চরগোলা আর লামাজুয়ারের বাদশাবাড়ি। পশ্চিমে বেতাইল কালীবাড়ি মোকাম, আর দক্ষিণপূর্ব প্রান্তে শনবিল কালীবাড়ি মোকাম। 


আরও আছে। তবে লোকশ্রুতিতে এগুলির উল্লেখই বেশি। করিমগঞ্জের বাইরে বাদশার মোকাম রয়েছে একটাই। হারাঙ্গাজাওতে। সে উনিশ শতকের কথা। বদরপুর-গৌহাটি রেল লাইনের কাজ শুরু হয়েছে তখন। জঙ্গল কেটে লাইন বসানোর কাজ চলছে। সেই সময় প্রতি রাতেই শ্রমিকদের ডেরায় এসে হানা দিত বাঘ। বৃটিশ কর্তৃপক্ষের বন্দুক সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট ছিল না। অতএব, অগতির গতি বাদশার ওপর নিজেদের সুরক্ষার ভার দিয়ে নিশ্চিত হয়েছিল শ্রমিকরা। বাদশা এসে হাজির হয়েছিলেন হারাঙ্গাজাও। তাঁর জন্য তৈরি হল মোকাম। সেই মোকাম আজও আছে। এখন তিনি স্থানীয় ডিমাসাদেরও উপাস্য দেবতা। 


কেন মজেছিল মানুষ? কেন পির বা আউলিয়াদের নিয়ে এমন উন্মাদনা দেখা দিয়েছিল সেকালীন সমাজে? কেন বাঘের দেবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন তারা? ঐতিহাসিক-সমাজতত্ত্ববিদদের মনে স্বভাবতই এই প্রশ্ন জেগেছে। এর উত্তরও খোঁজার চেষ্টা করেছেন তাঁরা। জগদীশ নারায়ণ সরকার যেমন বলছেন, “The masses of the people believed that the Sufis and the pirs possessed supernatural powers. At the beginning of the nineteenth century this faith assumed vast proportions among the Indian Muslims. They solicited the aid and favours of the pirs and sought to avoid danger with the talismans and amulets given by them. Both the communities, Hindu and Muslim, used to regard tigers and cheetahs as symbols of the pirs.”  ‘Hindu-Muslim Relations in Bengal’ বইয়ে রয়েছে তাঁর এই মন্তব্য। 


এভাবেই পিরেরা, আউলিয়ারা দেবতায় উন্নীত হন। জুড়ে যান বাঘের সঙ্গে। ভক্তরা তাঁদের নিয়ে গান বাঁধে, পাঁচালি লেখে। ফকিরদের এক নতুন ধারা প্রচলিত হয়। ‘মৌজুম’ নামে পরিচিতি লাভ করে সেই শাখা। এই ‘মৌজুম’রা বাদশার নাম গান শুনিয়ে ভিক্ষে করত। আবার ভিক্ষে সংগ্রহ করে গাঁ-গঞ্জের রাখাল বালকরাও। বাদশার গান গেয়েই। সে অবশ্য বছরে একবার, পৌষ-মাঘ মাসে। এই ভিক্ষার আয় থেকে বাদশার বাৎসরিক পুজোর আয়োজন হয়। আর সে হয় ওই মাঘ মাসেই। না, এর কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নেই। ওই মাঘ মাস, ব্যস ওইটুকুই। সেই পুজোয় ডাক পড়ে না কোনো পুরোহিতের। প্রয়োজন পড়ে না মন্ত্রের। সিন্নি, দুধ, কলা, ফল, গাঁজা আর গজার মাছ-- পুজোর উপকরণ বলতে এটুকুই। আর সন্ধ্যেবেলায় জ্বালিয়ে দেওয়া হয় মোমবাতি। নেই আর কোনো বাহুল্য। মোমবাতি আর গজার মাছ, ইসলামি সংস্কৃতির অবদান। হিন্দুদের কাছে এই মাছ অভক্ষ্য। এতেই প্রমাণিত, বাদশার উৎস মুসলমান সংস্কৃতি। 


দুই সংস্কৃতির মেলবন্ধন হয়। বাদশাকে কেন্দ্র করে। তাঁর প্রতাপে সব থরহরি কম্প। এমনকি এলাকার দেওয়ানও। বলছি, চরগোলার নবাব উপাধিধারী রাধারামের কথা। বাদশার আশীর্বাদেই তাঁর উত্থান, লোককথা এমনই ইঙ্গিত দেয়। শ্রীহট্টের তালতলা থেকে এসে চরগোলার বাদশার মোকামে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি, বাকিটা ইতিহাস। এমন প্রভাবশালী বাদশার মাজারে যে ভক্তরা হুমড়ি খেয়ে পড়বে, এ আর আশর্য কি!


হ্যাঁ, বাদশার কৃপাতেই সামান্য অবস্থা থেকে রাধারামের দোর্দণ্ডপ্রতাপ জমিদার হয়ে ওঠা। বোঝাই যাচ্ছে, বাদশা শুধু ব্যঘ্র দেবতা ছিলেন না। তিনি বনের বাঘের অধীশ্বর যেমন, তেমনি ঐশ্বর্যেরও দেবতা। উত্তরবঙ্গের সোনা গাজি কিংবা সোনা রায়ের মতো। আবার গৃহপালিত পশুরও মালিক তিনি। মুর্শিদাবাদের মানিক পির যেমন। 


বাঘের উৎপাত কবেই খতম হয়েছে। বাদশা কিন্তু আজও রয়েছেন। তাঁর মোকামে, স্বমহিমাতেই। গাঁ-গেরামে বর্ণহিন্দুদের অধিকার কায়েম হওয়ার পরও। ব্রাহ্মণ্য-সংস্কৃতির ছায়ায় গ্রামীণ মানুষের ধর্ম-ভাবনার জগত পাল্টে গেছে অনেকটাই। কিন্তু বাদশার প্রতি তাদের বিশ্বাসে এর কোনো ছায়া পড়েনি। আজও কালীবাড়ি প্রাঙ্গণেই বাদশার বসত। সেখান থেকে তাঁকে স্থানান্তরিত করার কথা কারো মনে হয়নি। নিরুপদ্রবে সহাবস্থান করেন তাঁরা। একই বসতভিটেতে। 


বসত করেন তাঁরা হিন্দুর মনেও। সে শাহজালাল থেকে সইজা বাদশা, আদম খাকি, বদর শাহ্‌-- প্রত্যেকেই। এক মুঠি মাটি সম্বল করে পথে নেমেছিলেন শাহজালাল। সেই সম্বলই দিয়েছে তাঁকে পথের হদিশ। পা রেখেছিলেন তিনি শ্রীহট্টে। দীর্ঘ যাত্রার শেষে পরিচিত মাটিতে পৌঁছে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর মোকাম, তাঁর বসতভিটে। মক্কার পাক্‌ মিট্টির সঙ্গে সিলেটের মাটির মিল দেখে সেদিন তাঁর মনে জেগেছিল আহ্লাদ। সেই উল্লাস ছুঁয়েছিল হিন্দুর হৃদয়ও। মক্কার মাটির মতোই পবিত্র সিলেটের মাটি-- এ যে তাদেরও গর্ব, তাদেরও অহংকার। দুই বিরুদ্ধ শক্তিকে, দুই বিরুদ্ধ সংস্কৃতির শেকড়কে ধারণ করে আছে এই মাটি। মুরশিদের মুলুক বলেই তা সম্ভব হয়েছে। এই বিশ্বাস হিন্দুরও। যদিও সেই মুলুকের বুক চিড়ে আজ কাঁটাতারের বেড়া, তবু আলগা হয় না পুরনো শেকড়। মাটির রূপকথা আদরে আঁকড়ে থাকে তাকে। কে।



Bartalipi Digital Desk

Bartalipi Digital Desk

Bartalipi Digital Desk

Total 29 Posts. View Posts


About us

প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার যুগে খবরের সত্যতাটির পক্ষপাতদামুক্ত উদ্যোগ / দীক্ষা প্রয়োজন। ক্লান্তিকর সংবাদগুলি আর সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। অভ্যন্তরীণ খবরে বৈশ্বিক কোণ থেকে বর্ণিত করার লক্ষ্যে, "বার্তালাপি ডিজিটাল" ডিজিটাল সাংবাদিকতার মাঠে প্রবেশ করেছে। শিরোনামের মিশ্রণটি তার লক্ষ্য এবং লক্ষ্যটির স্ব-ব্যাখ্যামূলক। বৈশিষ্ট্যগুলি, নিউজফ্ল্যাশগুলি এর মাধ্যমে একটি প্ল্যাটফর্মে সমস্ত সিঙ্ক করা হয়, এটি বারাকের নেটিজেনদের একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আভা দেয়। বার্তালাপি ডিজিটাল তাই ডিজিটাল ভারসাম্য পূরণের প্রতিশ্রুতি দেয় যা এটি ডিজিটাল বিবর্তনের যুগে একটি সংবাদ সংস্থা হিসাবে চিহ্নিত করবে




Follow Us