BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Sunday, 28 Feb 2021  রবিবার, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৭
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

পৃথিবী বাউলের না হোক, একদিন মানুষের হবে

Bartalipi, বার্তালিপি, পৃথিবী বাউলের না হোক, একদিন মানুষের হবে

আমাদের রণেশদার গানের ঘরটা জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। এ আমাদের জন্য বিরাট ধাক্কা। রণেশদা আমাদের গানের মানুষ। আমাদের মায়ার মানুষ। আমাদের মাটির মানুষ। আমাদের আব্দুল করিমকে ধারণ করা মানুষ হলেন এই রণেশ ঠাকুর। তাঁর বাদ্যযন্ত্রে করিমের স্পর্শ লেগেছিলো...

রণেশ ঠাকুরের সঙ্গে নাগরিক মানুষের পরিচয় হয়েছিলো শাহ আব্দুল করিমের মাধ্যমে, যিনি জনমানসে করিম-করিমশাহ-করিম পীরসাব নামে পরিচিত ছিলেন। সেই আব্দুল করিমের সাথে সন্তানের মতো যুক্ত ছিলেন রুহী ঠাকুর ও রণেশ ঠাকুর নামের দুই ভাই। দুজন সহজ মানুষ। পৃথিবীতে বিনীত মানুষের তালিকা করার সুযোগ পেলে এই দুজনকে প্রথম দিকে রাখবো আমি। এমন একজন মানুষের গানের ঘর পুড়িয়ে দেওয়া হতে পারে, সেটা কেউ কল্পনাও করতে পারার কথা নয়।

পৃথিবী ক্রমশ অশান্ত হয়ে উঠছে। দেশে দেশে পশ্চাদপদতার মিছিল চলছে। বড় গণতন্ত্র থেকে বড় মানবাধিকার কেউই নিজেদের ধরে রাখতে পারেনি। ধর্মের আগাছায় ভরে যাচ্ছে শ্যামল প্রান্তর। সৈয়দ ওয়ালি উল্লাহ বলেছিলেন, ''শস্যের চেয়ে টুপি বেশী, ধর্মের আগাছা বেশি।'' সত্যিই তাই। মানুষ এমন অন্ধকারে ডুবে গেছে যে, সে আর সুর সহ্য করতে পারে না। সে মুক্ত মতকে সহ্য করতে পারে না। সে আগুনে পুড়িয়ে দিতে চায় বিরুদ্ধ মতকে। আর বাউলরাতো সারা জীবন মুক্ত মতেরই আরাধনা করে চলেছেন।

রণেশ ঠাকুরের গানের ঘর পুড়িয়ে দেওয়া তাই কোন সাধারণ বিষয় নয়। এ যেকোন ঘর পুড়িয়ে দেওয়াও নয়। কিংবা বছর বছর চলে আসা ধর্মীয় দাংগার সাথেও এর পার্থ্যক্য আছে। ফি বছর পূজো এলে, কিংবা ঈদের সময় এখানে ওখানে হামলা হয়। সুযোগ নিতে তৎপর তস্কররা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকে এমন উপলক্ষের। সেটা থেকে এই আগুন একেবারে ভিন্ন। এই আগুন আসলে বাংলা সংস্কৃতি পুড়িয়ে দেবারই অপচেষ্ঠা। হামলার লক্ষ্য হলো আবহমান বাংলার উদার সংস্কৃতি। যে সংস্কৃতি মূলতঃ অসাম্প্রদায়িক বাংলার কথা বলে, যে চর্চ্চার জোরে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি এখনও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নষ্ট রাষ্ট্রের তালিকার বাইরে থাকতে পেরেছে।

রাষ্ট্র কাঠামোর হিসাবে হয়তো বাংলাদেশ এখনও ঠিক পথে আছে। কিন্তু ভেতরটা আর আগের মতো নেই। এজন্যই আগুনে পুড়ে যায় গানের ঘর। বাউলের আসর বাধাগ্রস্থ হয় কিংবা বাউল গানের আসরে চলে তাণ্ডব। এ সবই ক্ষয়ে যাবার লক্ষণ। ঠুনকো হয়ে যাবার সংকেত। স্মরণকালে এমনতরো কিছু ঘটনায় শুভবোধের মানুষেরা তাই অস্বস্থিতে আছেন। প্রবল সামাজিক ধাক্কার শঙ্কাও জাগছে অনেকের মনে।

রণেশ ঠাকুরের প্রতিবেশ নিয়ে যদি ভাবতে বসি, ভয় তখন কিছুটা পেতেই হয়। সিলেটের এই ভাটি অঞ্চল সেই আদি যুগ থেকেই আউল বাউলের দেশ হিসাবে পরিচিত। ময়মনসিংহ গীতিকার যে অনিন্দ সুন্দর পালা বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ বলে চিহ্নিত, সেতো এই ভাটি বাংলার জল ও হাওয়া থেকে উৎসারিত। রাধারমণ দত্ত, শানুরশা (শাহনূর শাহ) হয়ে রণেশ ঠাকুর পর্যন্ত যে লোকগান বা বাউল গানের ধারা, তাওতো সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় এতো শক্ত ভিত পেয়েছে। তাহলে আজ কেনো এই দৌরাত্ম্য? এর অর্থ হচ্ছে গ্রামের কোমল মানুষের মাঝে আলগোছে পৌঁছে গেছে দুর্বৃত্ত। ঘাপটি মেরে বসে আছে সকলের মাঝে, আর সুযোগ পেলেই সে পুড়িয়ে দিচ্ছে শত বছরের ঐতিহ্য। চল্লিশ বছর ধরে একজন মানুষ, একজন সাধক তিল তিল করে জমিয়েছিলেন যে অমূল্য সম্পদ, এক রাতের মাঝে তা ছাই হয়ে গেলো। এই ছাইয়ে বিলীন হয়ে গেলো এক অনন্য সাধকের হাতের স্পর্শ।

রণেশ ঠাকুরের পোড়া ভিটায় আবার ঘর উঠবে। আবার আসর বসবে, আসবে নতুন নতুন বাদ্যযন্ত্র। কিন্তু ওতে করিমের স্পর্শ থাকবে না। রণেশ ঠাকুর যে স্মৃতিহারা হলেন, সেই স্মৃতি আর কখনো ফিরে পাবেন না। যে বিভীষিকার মুখোমুখি হলেন তিনি ও তার সংগীরা, সেটা কোনদিন ভুলতে পারবেন না। শংকাটা আসলে এখানেই। মানুষ যখন ভয় পায়, যখন সে অনিরাপদ বোধ করে, যখন সে বুঝতে পারে, সুদিন বিগত হয়েছে, তখনই তার সৃষ্টিশীলতা বাধাগ্রস্থ হয়। আমাদের বাউলরা কী তাহলে আস্তে আস্তে থেমে যাবেন? তারা কী স্বতস্ফূর্ততা হারাবেন?

শাহ আব্দুল করিম আশা করতেন, এই পৃথিবী একদিন বাউলের হবে। গণমানুষের এই বাউল সারা জীবন সাম্যের পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে গেছেন। মানুষের অধিকার নিয়ে পদ রচনা করেছেন। তাঁর পরম্পরা নিয়ে মানুষের জন্য গান করছেন রণেশ-নূর জালালরা। এর বাইরে আরো অসংখ্য গান পাগল সরল মানুষ করিমের গান ও ভাব দর্শন ধারণ করে আছেন বলেই আমাদের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসে ভর করে আমরা হয়তো আশাবাদী হতে পারি। এই পৃথিবী বাউলের না হোক, একদিন মানুষের হবে। শুধুই মানুষের।