BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর
Wednesday, 21 Apr 2021  বুধবার, ৭ বৈশাখ ১৪২৮
Bartalipi, বার্তালিপি, Bengali News Portal, বাংলা খবর

BARTALIPI, বার্তালিপি , Bengali News, Latest Bengali News, Bangla Khabar, Bengali News Headlines, বাংলা খবর

বাংলা খবর

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাংলা নিউজ পোর্টাল

তখন রোদ্দুরের দিকে তাকাতেও আমার ভয় হত

Bartalipi, বার্তালিপি, তখন রোদ্দুরের দিকে তাকাতেও আমার ভয় হত

কখনও, কখনই শেকড় থেকে বিচ্যুত হবেন না। দেখুন, সুশান্তের মতো আমিও স্মল টাউন থেকে এসেছি। অল্পবিস্তর স্টারডম আমিও পেয়েছি। কিন্তু ভাগ্যিস, আমি কখনও আমার শেকড়টাকে ছিন্ন করিনি। বরং কমলা আলোর আড়ালেও ওই শেকড়টাকেই সবার অজান্তে আঁকড়ে ধরে রেখেছি। হ্যাঁ, আমি ডিপ্রেশনে ছিলাম।

দেবজিৎ সাহা

আমার তখন রোদ্দুরের দিকে তাকাতেও ভয় হত। নিজেকে কেমন যেন রিক্ত, নিঃস্ব মনে হত। মনে হত, জীবনটা হঠাৎই থমকে গেছে, এই জীবন থেকে আমার আর পাওয়ার কিছু নেই। শেষহীন এক অন্ধকারের মতো, ময়াল সাপের মতো এক ভয়ংকর ডিপ্রেশন আমাকে ক্রমশ যেন কোণঠাসা করে ফেলছিল।

সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যা মায়ানগরীর অন্ধকার দিকটি সবার সামনে নিয়ে এসেছে। সুশান্ত স্টার ছিলেন, তাই তাঁর অকাল মৃত্যু নিয়ে এতো বিতর্ক। কিন্তু স্বপ্ননগরীতে প্রতিদিন স্বপ্নভঙ্গের দুঃসহ ব্যথা নিয়ে কত শত অজানা সুশান্ত অকালে ঝরে যাচ্ছে, না, এর খবরটুকুও কোনও মিডিয়ায় আসে না।

স্টারডম আসলে এক যেন এক ফাঁদ। চক্রব্যূহ। সুশান্তের মৃত্যু নিয়ে সেদিন মুকেশ খান্নার কথা শুনতে শুনতে তা-ই মনে হচ্ছিল। মুকেশ বলছিলেন, ছোট শহর থেকে যাঁরা বলিউডে আসেন, তাঁরা গোড়াতেই একটা ভুল করে ফেলেন। কী ভুল? না, তাঁরা যে সেতু পেরিয়ে মুম্বাই আসেন, মায়ানগরীতে পা দিয়ে প্রথমেই সেই সেতুটাকেই পুড়িয়ে ফেলেন। নিজের শেকড় থেকে বিচ্যুত হয়ে যান তাঁরা। আর একবার যদি স্টারডম ছুঁয়ে ফেলা যায়, তা হলে তো আর কথাই নেই। পুরো লাইফস্টাইলটাই পালটে যায়। বিশাল বাংলো, বিলাসী মার্সিডিজ, নাইট লাইফ। মুশকিলের বীজটা ঠিক এখানেই শেকড় ছড়াতে শুরু করে। স্টারসুলভ এই লাইফস্টাইল মেনটেন করতে গেলে চাই দেদার টাকা, এই টাকা পেতে গেলে চাই লাগসই  কাজ। কিন্তু কাজ যদি আর না আসে! তা হলে? ডিপ্রেশন এই বিন্দু থেকেই অক্টোপাসের মতো পেঁচিয়ে ধরা শুরু করে দেয়। শেকড়ের সেতু তো আগেই নিজের হাতে পুড়িয়ে দিয়েছেন, মানসিক সমর্থনের যাবতীয় পথ তো ততদিনে নিজেই বন্ধ করে দিয়েছেন। 

সুশান্ত এই চাপটা নিতে পারেননি। শুনতে খারাপ লাগবে, কিন্তু বাস্তব হচ্ছে, এই না-পারাটা পুরোপুরি তাঁর নিজের ব্যর্থতা। সুশান্তের মৃত্যুর জন্য স্কেপগোট খোঁজার হিড়িক পড়ে গেছে। বলিউডের বিগশটদের টার্গেট করা হচ্ছে, বলা হচ্ছে, তাঁদের স্বজনপোষণের শিকার হয়েছেন সুশান্ত। লবিবাজি। নেপোটিজম। যেন এই বিগশটরা একেকজন মাফিয়া!  যাঁরা সোশ্যাল মিডিয়া তোলপাড় করে দিচ্ছেন, তাঁরা একবার বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, লবিবাজি বা স্বজনপোষণ কোথায় নেই। এমন একটি পেশা দেখা পারবেন যেখানে লবিবাজি হয় না? আরে, গ্ল্যামারের দুনিয়া ছাড়ুন, পাড়ার মুদির দোকানেও লবিবাজি হয়। স্বজনপোষণ হয়। চৌকশ কর্মীর মাথার ওপর মালিক তার গবেট পুত্রকে বসিয়ে দেয়। এটাই জীবনের দস্তুর, এটা মেনে নিয়েই পেশার জগতে লড়াইটা চালাতে হয়। স্যরি টু সে, সুশান্ত সিং রাজপুত এই লড়াইটা চালিয়ে যেতে পারেননি, এটা আসলেই তাঁর ব্যর্থতা। পাশাপাশি এ কথাও বলতে হবে যে সুশান্ত ডিপ্রেশনের জোনে চলে গিয়েছিলেন। এটা এক ধরনের রোগ। এটা না সারাতে পারলে জীবন থমকে যায়। যেতে পারে। 

কথা হল, এই রোগ থেকে নিরাময়ের পথটা কোথায়? এখানেই আসে মুকেশ খান্নার ওই কথাগুলো। কখনও, কখনই শেকড় থেকে বিচ্যুত হবেন না। দেখুন, সুশান্তের মতো আমিও স্মল টাউন থেকে এসেছি। অল্পবিস্তর স্টারডম আমিও পেয়েছি। কিন্তু ভাগ্যিস, আমি কখনও আমার শেকড়টাকে ছিন্ন করিনি। বরং কমলা আলোর আড়ালেও ওই শেকড়টাকেই সবার অজান্তে আঁকড়ে ধরে রেখেছি। হ্যাঁ, আমি ডিপ্রেশনে ছিলাম।

চার পাঁচ বছর ওই জোনে ছিলাম। নিজের মধ্যেই কেমন যেন কুঁকড়ে থাকতাম, মনে হতো আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। এক অদ্ভুত রিক্ততা সারাটা দিন আচ্ছন করে রাখত। সূর্যের দিকে, রোদের দিকে, আলোর দিকে তাকাতে ভয় হত। ছোট শহর থেকে এসেছি, মায়ানগরীতে নিজের একটা আইডেন্টিটি গড়ে তুলেছি। কিন্তু একসময় আমি বুঝতে পারছিলাম, ওই আইডেন্টিটি গড়ে তোলা যত কঠিন, তার চেয়ে অনেক অনেক কঠিন, কমলা আলোয় মোড়া ওই আইডেন্টিটি ধরে রাখা। যশ আসলে এক ধরনের ইনসিকিউরিটি বয়ে আনে। এই নাম-ডাক, স্টারডম যদি হারিয়ে যায়, তা হলে কী হবে, এই একটি ভয় আমাকে ডিপ্রেশনের চোরাবালিতে আস্তে আস্তে তলিয়ে দিচ্ছিল। 

আমি এই ফেজটা ওভারকাম করেছি। করতে পেরেছি, একটাই কারণ, কারণ আমি রুটেড ছিলাম। আমাদের ফ্যামিলি বন্ডেজটা পুরোপুরি মধ্যবিত্ত পরিবারের ভ্যালুজের ওপর দাঁড়িয়ে। বন্দনা, আমার স্ত্রী, আমার দুই সন্তান তো আছেই, পাশাপাশি শিলচরে আমার পরিবার, আমার ভাইয়েরা, পালংঘাটে আমার স্বজনরা, ওরা প্রতি মুহূর্তে মেন্টাল সাপোর্ট জুগিয়ে গেছে।  আমি যদি শেকড়টা উপড়ে ফেলে দিয়ে শুধু স্বপ্নের পেছনে ছুটতাম, তা হলে, এতদিনে আমিও তলিয়ে যেতাম। স্টারডম আসলেই এক চোরাবালির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, যে চোরাবালির ওপরটা চোখ ঝলসানো কমলা আলোয় মোড়া।

গত ক'মাস ধরে গোটা ইন্ডাস্ট্রি হাত- পা গুটিয়ে বসে আছে, লকডাউন, ফলে কাজ নেই কারোর। আমার খুব ভয় হয়, আরও কতো স্ট্রাগলার, শুধু স্ট্রাগলারই বা কেন, অনেক প্রতিষ্ঠিত শিল্পীও এই ধাক্কায় আর্থিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে তলিয়ে না যান। একটি ফিল্ম তৈরির সঙ্গে হাজার হাজার মানুষ জড়িত। সুপারস্টার থেকে শুরু করে স্পটবয়, পিরামিডটা চুড়ো থেকে যত নেমেছে, ততই বিস্তৃত হয়েছে। ছড়িয়েছে। প্রচুর আর্টিস্ট রয়েছেন যাঁরা ডেইলি বেসিসে পারিশ্রমিক পান। এঁরা পুরোপুরি বেকার গত ক'মাস ধরে। আমাদের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতেও অসংখ্য শিল্পী রয়েছেন, যাঁরা অনুষ্ঠান ভিত্তিক টাকা পান। তারপর ফরেন টু্র রয়েছে, এটাও পুরোপুরি বন্ধ। বিদেশ যাত্রা কবে ফের শুরু হবে, তা পুরোপুরি অনিশ্চিত। আমরা যাঁরা পারফর্মার, আমাদের যাবতীয় কারবারই গ্যাদারিং নিয়ে। ভিড় আমাদের অস্তিত্বের মাপকাঠি। সেই ভিড়ই যদি হারিয়ে যায়, তাহলে আমাদের অস্তিত্বও তো,  খুব স্বাভাবিক, সংকটে পড়বে। পড়বে কেন বলছি৷ পড়ে তো গেছেই। কলকাতা থেকে অনেকে যোগাযোগ করেছেন, আমি আমার সাধ্যমতো সাহায্য করেছি। এখনও মানুষকে খানিকটা সাহায্য করার মতো সঙ্গতি আমার রয়েছে, কারণ, ওই যে আগে বললাম, আমি শেকড় থেকে বিচ্যুত হইনি। মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে আমি যখন সাফল্য পেলাম, তখন কিন্তু আমি তাতে গা ভাসিয়ে দিইনি। আমি খুব হিসাব করে পা ফেলেছি। দশ পা ফেলার হলে, আমি সাত পা ফেলেছি, তিন পা হোল্ড করে রেখেছি। যা উপার্জন করেছি তার অন্তত চল্লিশ শতাংশ সঞ্চয় করে রেখেছি। এবং রেখেছি বলেই আজ এই সংকটেও আমাকে হাত পাততে হয়নি। গুয়াহাটির ফ্ল্যাট থেকে ভাড়া পাচ্ছি, এটাও ওই সময়ে ইনভেস্ট করেছিলাম বলেই সম্ভব হয়েছে। ভালো লাগছে, মানুষের বিপদের সময় কারোর কারোর কাজে আসতে পেরেছি। পালংঘাটের দুশো পরিবারকে সাহায্য পাঠাতে পেরেছি। প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীর ফান্ডে থোক টাকা দিতে পারতাম, তা অবশ্যই কাজে লাগত। কিন্তু আমার পালংঘাটের মানুষরা হয়তো তা সরাসরি পেতেন না। তাই আমার খুড়তুতো ভাইদের দিয়ে দুশো পরিবারকে কিছুটা ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছি। 

আসলে এভাবেই মাটির সঙ্গে, শেকড়ের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রাখছি সবসময়। মায়ানগরীতে এটা ভীষণ প্রয়োজন। না হলে কোনও সংকটে পড়লে পাশে কাউকে পাওয়া যায় না। এক রিক্ততা বোধ ক্রমাগত এক অতল গহ্বরে ঠেলে ফেলে দিতে থাকে। সুশান্তের মতো প্রতিভা অকালে ঝরে যায়।