সুরমা-কুশিয়ারা পারের সংস্কৃতি ও নাট্যচর্চার ইতিহাস – এক নির্বাসিত সময়ের ইতিকথা

সুরমা-কুশিয়ারা-পারের-সংস্কৃতি-ও-নাট্যচর্চার-ইতিহাস-–---এক-নির্বাসিত-সময়ের-ইতিকথা
মঞ্জরী ভট্টাচার্য

বরাক আর কুশিয়ারা – আমার চেতনা জুড়ে আজো হানা দেয় শৈশবের এই দুটি নদীর স্মৃতি । বরাক আমার ভিটে-মাটি নিয়ে বেড়ে ওঠা আবাল্যের সহচর আর কুশিয়ারার তীর সংলগ্ন করিমগঞ্জের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার জন্মের পরিচয় । মনে পড়ে, ছেলেবেলায় বাবার হাত ধরে যখন দেখতে যেতাম কুশিয়ারা নদীর এপারে দাঁড়িয়ে ওপারের সীমান্ত তীরবর্তী   বাংলাদেশ, বাড়ি ফিরে এসে আমার ছবির খাতায় সেই বাংলাদেশ ধরা দিত কোনো এক অচেনা  আরশিনগর হয়ে । বড়ো হয়েও বহুবার দেখতে গেছি, আর অনুভব করেছি নিস্তব্ধ নদীর প্রান্তে  দাঁড়িয়ে এক অভিশপ্ত সময়কে ; বিভাজনকামী রাজনৈতিক শক্তির শাণিত অস্ত্রাঘাতে শ্রীহট্ট- কাছাড়ের অঙ্গচ্ছেদের সাক্ষীও বটে এই সময় । আমার কাছে কুশিয়ারা যেন সেই নিঃশব্দ নিথর   সময়ের প্রতীক । সন্ধ্যের আবছায়ায় গাঢ় নীলের সঙ্গে মিশে যায় যখন ধূসর কালো, এই নির্বাসিতা নদী তখন গল্প হয়ে ওঠে এক খণ্ডিত সময়ের ইতিহাসের । যে ইতিহাস বারবার   দেখেছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ক্রূর চক্রান্তে রাজনৈতিক বিভাজন আর ভাষিক আগ্রাসনকে । দেখেছে দেশভাগজনিত গ্লানি, রাষ্ট্র পরিবর্তন, উদবাস্তু জীবন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ, বন্যা আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রতিকূল পরিবেশে বারবার ব্যাহত হয়ে যাওয়া সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার নিদারুন সংগ্রামকে । 

            আমার বাবা জ্যাঠাদের মুখে যে ইতিহাস শুনে বড়ো হয়েছি, সেখানে যেমন কুশিয়ারাকে পাই, তেমনি পাই বরাকের আরেক কন্যা সুরমাকে । আর পাই ১৯৪৭ এর পূর্বে গণভোটের মাধ্যমে দ্বিখণ্ডিত বাংলার বুক থেকে হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য নদ-নদী ,জনবসতি  বেষ্টিত এক অখণ্ড বাংলাদেশকে । একদিকে সুবৃহৎ শ্রীহট্ট জেলা আর অন্যদিকে সমবৃহৎ   কাছাড় জেলা, আর উভয়ের যোগাযোগ স্থাপনের মধ্যসেতু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে শহর  করিমগঞ্জ, তারই কোল ঘেঁষে বয়ে চলেছে কুশিয়ারা নদী । ইতিহাসের কাছে তথ্য প্রমাণ মেলে, সমগ্র উনবিংশ শতাব্দী কিংবা তারও পূর্ব থেকে লঙ্গাই, নিলামবাজার, পাথারকান্দি, কায়স্থগ্রাম, ভাঙ্গা, বদরপুর, লাতু, ব্রাহ্মণশাসন, কাঠলীতলীর দক্ষিণভাগ, জুরী, মকা ইত্যাদি অঞ্চল সংস্কৃতি চর্চায় এগিয়ে ছিল অনেকটাই । রাজস্ব আদায়ের জন্য বৃটিশ শাসকশ্রেণীর বহু অফিস-আদালত যেহেতু সেসব অঞ্চলে অবস্থিত ছিল, তাই অচিরেই গড়ে উঠেছিল সেখানে বৃটিশ উপনিবেশ । লাতুগ্রামের সরকারী আদালতকে কেন্দ্র করে বহু ফার্সী ও উর্দূভাষী পণ্ডিত ব্যাক্তিবর্গ থেকে শুরু করে বহু বিশিষ্ট ইংরাজ রাজকর্মচারীদেরও সমাগম হতো সেখানে । বৃটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির    পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা শিল্প-সংস্কৃতি চর্চায় ভারতীয়রা বরাবরই ছিল ব্রাত্য । তাই দেখা যায়, বৃটিশরা তাদের মনোরঞ্জনের জন্য এই অঞ্চলে যে নাচঘর প্রতিষ্ঠা করেন, তার ত্রিসীমানায় ভারতীয়দের প্রবেশের পথ ছিল অবরুদ্ধ । আর এই অপমানজনক পরিস্থিতিতে ঔপনিবেশিক  সংস্কৃতির বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ বৃটিশ বিরোধী মনোভাব থেকে এ অঞ্চলের মানুষ যখন প্রতিষ্ঠা করলেন ভারতীয় নাট্যমঞ্চ, তখন সেই মঞ্চকে কেন্দ্র করে শুধু স্থানীয় মানুষদের রচিত নানা ধরনের স্বদেশীগান, কবিগান, তর্জা, নাটক, যাত্রাগানের আসরই নয়, চারণকবি মুকুন্দদাস, নজরুল ইসলাম প্রমুখ জ্ঞানী-গুণী ব্যাক্তির পদার্পনে সৃষ্টি হয়ে উঠল নবচেতনার উন্মেষের এক ঐতিহাসিক অধ্যায় ।    

                       কিন্তু ইতিহাসেরও তো পূর্ব ইতিহাস থাকে । যে ইতিহাস তার সমাজ, দেশ, কাল পেরিয়ে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে হয়ে ওঠে অবিরত সংবাহন, লোকজীবনের পরতে পরতে যে ইতিহাস মিশে থাকে এক অনন্ত সময়ের স্রোতধারা হয়ে, আজ থেকে দেড়শ-দুশো বছর পূর্বের একটি অখণ্ড ভূখণ্ডের সাংস্কৃতিক গবেষনায় তাকে মুছে ফেলবো কোন স্পর্ধায় ? আজ যখন কুশিয়ারা-সুরমা পারের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের আলোচনায় আমরা উৎসুক হয়ে  উঠেছি, তখন খুব সচেতন ভাবেই প্রশ্ন জাগে, উনবিংশ শতকে বৃটিশ উপনিবেশ স্থাপনের পূর্বে এসব এলাকায় সংস্কৃতি বিকাশের ধারাটি ছিল আসলে কেমন ? কিংবা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এই উপত্যকার নাট্যচর্চার প্রস্তুতি পর্বে যারা প্রদীপ জ্বালার আগে সলতে পাকানোর কাজটুকু সেরে রেখেছিলেন, সময়ের অতল গর্ভে হারিয়ে যাওয়া সেই মানুষগুলোকে আজ আমরা খুঁজবো কোথায় ! যে মুখগুলো জাতিস্মরের মতোই প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে চেহারা বদলে বারবার চলে আসে অতীতের সেতু বেয়ে ভবিষ্যত প্রজন্মের সংবাহক হয়ে তারাই কি তবে বলে দেবে কোথায় রয়েছে সমুদ্রপারের রাজকন্যার সোনার জীয়নকাঠি ? কি জানি, তবে চলমান জীবনের প্রাণকেন্দ্রে অনুসন্ধান করলে বুঝতে পারি করিমগঞ্জকে কেন বলা হতো ‘লোক  উৎসবের দেশ’ । বর্ষাকালে ঝুলন উৎসবে শহরের আনাচে কানাচে কান পাতলে এখনো কোনো কোনো বাড়িতে শোনা যায় সুরমা উপত্যকার বাউল সুরে সমৃদ্ধ এক স্বতন্ত্র গায়নরীতি, যা বর্তমানে অনেক অঞ্চলেই লুপ্তপ্রায় । আজও মহরম উপলক্ষ্যে কোনো কোনো মুসলমান গ্রামে দেখা যায় ‘হায় হাসান, হায় হোসেন’ বলে বুক চাপড়ে পুরুষদের তাণ্ডব ভাবাশ্রয়ী করুন হৃদয় বিদারক নৃত্য - জারিনাচ । সুরমা, ধলেশ্বরী, কুশিয়ারা পারের ধামাইল গান ও নাচে আজও খুঁজে পাওয়া যায় জাতপাত-ভেদাভেদ মুক্ত এক সুস্থ সংহত জীবন গড়ে তোলার সামগ্রিক প্রয়াস ।   

             শোনা যায় স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে করিমগঞ্জ ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ব্যাপক আকারে আয়োজিত হতো নানা ধরনের মেলা ও লোক উৎসব । বর্তমানে করিমগঞ্জ কলেজ সংলগ্ন ভূমি - যা স্টেশন রোড থেকে দেউল টীলা হয়ে লঙ্গাই সেতু পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, সেই  অঞ্চল ধানের মাঠ ছিল একসময় । সেই মাঠে প্রতি বছর অগ্রহায়ন-পৌষ মাস ব্যাপী অনুষ্ঠিত হতো বিশাল মেলা । হস্তশিল্প সামগ্রী থেকে শুরু করে দেশ-বিদেশ থেকে নিয়ে আসা নানারকম পশুপাখি, এমন কি দাস-দাসীও বেচাকেনা হতো এই মেলা প্রাঙ্গনে । গার্হস্থ্য জীবনের প্রয়োজনীয় সামগ্রী তো বটেই, কেউ কেউ বলতেন বাঘের দুধ পর্যন্ত সংগ্রহ করা যেতো এইসব মেলায় গিয়ে হাজির হলে । তাছাড়া মেলার আরো এক বিশেষ আকর্ষণ ছিল টাট্টু দৌড় ও পোলো খেলা । দেউলটিলায় মেলা উপলক্ষ্যে দেশ-বিদেশ থেকে আগত বহু পীর, ফকীর, আউলিয়া, দরবেশ, বাউল-বৈষ্ণবদের সমাবেশে প্রচুর লোক যেমন আসতেন শুধুমাত্র তাদের মুখে ভক্তি সাধনমার্গের অপূর্ব সব গান শোনার জন্য, তেমনি আসতেন লাতু, ঢাকা, কুমিল্লা, হবিগঞ্জ প্রভৃতি অঞ্চল থেকে বিভিন্ন সব যাত্রাদল আসরের বায়না নিয়ে । আসতেন নামকরা বাইজী-নর্তকীরাও । আর এইসব ক্ষনিক অতিথিদের আদর-আপ্যায়নের সবরকম দায়ভার ভাগ করে নিতেন স্থানীয় হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের বিত্তবান ব্যাক্তিরা সাগ্রহে ও সম্মিলিতভাবে ।

                  করিমগঞ্জ জেলার নীলমনি হাইস্কুলের মাঠে দীর্ঘ প্রাচীন ‘রাখালিয়া উৎসব’ বা ‘গো-উৎসব’ চিরতরে হারিয়ে গেছে স্বাধীনতা পূর্ববর্তীকালেই, আর তারই সঙ্গে হারিয়ে গেছে বহু নৃত্য-গীত, ছড়া, লোককথা, লোকনাট্য যা এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল অঙ্গাঙ্গীভাবে ।  একইভাবে হারিয়ে গেছে লঙ্গাই রেলসেতু থেকে আরম্ভ করে কুশিয়ারা-নটীখাল সঙ্গমস্থল ব্যাপী জলস্রোতে অনুষ্ঠিত হওয়া বাইচখেলায় সারিগান প্রতিযোগিতা । আবার হারিয়ে গিয়েও হারিয়ে যায়নি ‘পাখাজ’ বা দেশি ভাষায় ‘পাকাজ’ (পাখোয়াজ নয়) পদ্মপুরাণ গানে ব্যবহৃত সুরমা-কাছাড়ের নিজস্ব বাদ্যযন্ত্র - যা তৈরি করার জন্য বিশেষ এক ধরনের মাটি পাওয়া যেত কুশিয়ারা অঞ্চলে । সম্ভবত এই কারণেই করিমগঞ্জ বাজারে যেমন প্রচুর পাখাজ পাওয়া যেত উৎকৃষ্ট মানের, তেমনি বহু পাখাজ বাদ্যশিল্পীরাও ছিলেন এই অঞ্চলভুক্ত । লক্ষ্যণীয়, মনসামঙ্গল বা পদ্মপুরাণ কাব্য নৃত্য-গীত-অভিনয়ের মাধ্যমে পরিবেশন করার পূর্ববঙ্গীয় রীতিটি কিন্তু বরাক- সুরমা উপত্যকাতেই একমাত্র প্রচলিত রয়েছে আজও । স্বাধীনতা পুর্ববর্তী সময়ে করিমগঞ্জ  অঞ্চলের সেরকমই একজন শ্রেষ্ঠ পাখাজ বাদক ও নৃত্যশিল্পীর সন্ধান পাওয়া যায়, যার নাম ছিল শ্রী নন্দলাল ওঝা । ১৯৪১  সালে বরদাকান্ত দাস মহাশয়ের সৌজন্যে উদয়শংকর তাঁর নৃত্য সম্প্রদায় নিয়ে শিলচর এলে, করিমগঞ্জের গ্রাম্য এই বাদক শিল্পীকে সুযোগ দেওয়া হয় তাঁর সামনে বাদ্য ও নৃত্য প্রদর্শন করার  । নন্দলাল ওঝার বাদ্য ও নৃত্য কলাকৌশল দেখে উদয়শংকর এতোটাই বিস্ময়ে মুগ্ধ হন যে তিনি নিজের হাতে ধুতি চাদর ও প্রশংসাপত্র লিখে শিল্পীকে শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করেন । সঙ্গে ছিল তাঁর স্বাক্ষরিত একটি পাঁচ টাকার নোট । শুধু এখানেই শেষ নয় উদয়শংকর আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এই শিল্পীকে তাঁর সম্প্রদায়ে যোগদান করার । যদিও যে কোনো কারণেই হোক নন্দলাল এই আহবানে সাড়া দিতে পারেননি, কিন্তু সমগ্র সুরমা-বরাক উপত্যকা জুড়ে তিনি তৈরি করেছিলেন বহু উপযুক্ত শিষ্য, যাদের মধ্যে   একজন যিনি পরবর্তীকালে এই অভিনয়-গীত সমন্বিত ওঝা নৃত্যকলাকে বৌদ্ধ জন সমক্ষে তুলে ধরে ঘটিয়েছিলেন লোকনৃত্য অহল্যার চিরমুক্তি - তিনি নৃত্যগুরু মুকুন্দ দাস ভট্টাচার্য ।   

            ১৮৭৬ সালে প্যারীচরণ দাস সম্পদিত “শ্রীহট্ট প্রকাশ” সাপ্তাহিক সংবাদপত্রের প্রত্যেকটি সংখ্যায় বিভিন্ন জেলার সংস্কৃতি চর্চার সংবাদে বৈশ্যসমাজের সঙ্গীত নৃত্য চর্চার যে তথ্য পাওয়া যায়, তার থেকে অনুমান করা যায় সুরমা কুশিয়ারা হয়ে বরাককূলের ভাঙ্গা পর্যন্ত  একসময় যথেষ্ট আনাগোনা ছিল ‘ঘাটুসঙ্গীত’ নামে একপ্রকারের গানের – যার পৃষ্ঠপোষক  ছিলেন সমাজের উচ্চবিত্ত ধনী জমিদার শ্রেণী । ঘাটুগান পরিবেশনের জন্য নাট্যমঞ্চের আকারে তৈরি মঞ্চ ‘ঘাটুঘর’ একসময় হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ অঞ্চলে ছিল খুবই প্রসিদ্ধ । আর এই ঘাটুঘর অধিকাংশ সময় তৈরি করা হতো জনসমাবেশের বাইরে, নদীর নির্জন তীরবর্তী স্থানে, যেখানে অভিজাত পরিবারের মহিলাদের প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ । রাধাকৃষ্ণের লীলা বিষয়ক এই ঘাটুসঙ্গীতের একাধিক উদ্ধৃতিও পাওয়া যায় দীনেশ চন্দ্র সেন এর “বঙ্গভাষা ও সাহিত্য” গ্রন্থে ।  এই গান সম্পর্কে বলা হয়েছে, - “ তখনকার দিনে ঘাটু নাচ-গান  শ্রীহট্ট শহরে প্রবলবেগে ছিল । ছোকরারা নর্তকীর সুবেশ ধারণ করিয়া নৃত্য গীত করিত । ...রাজমহলে রাজভোগ পাইত… এবং রাজকুমারের ন্যায় চলাফেরা করিত । রাজগিন্নীর অন্দর মহলে কিংবা রাজপ্রভুর শয়নকক্ষেও তাহাদের অবাধ গতায়াত ও প্রয়োজন থাকিত ……। ” ( ইতিহাসে সাহা ও বৈশ্য সমাজ ) আসলে নানা কু-প্রথা ও কু-রুচি পূর্ণ অভ্যাস যে এই শিল্পকলাকে গ্রাস করেছিল বলাই বাহুল্য,  কিন্তু তা সত্ত্বেও ঘাটুগানের প্রাচীনত্ব ও সাহিত্যিক মূল্য অস্বীকার করার নয় । 

                   অশ্লীলতার দায়ে ঘাটুগান ক্রমেই ভদ্র শিক্ষিত সমাজ থেকে হারিয়ে যায় ঠিকই কিন্তু হারিয়ে যায় না এ অঞ্চলের সংস্কৃতি প্রেমী মানুষদের নাট্য পিপাসা । উনবিংশ শতকে সুরমা-শ্রীহট্ট অঞ্চলে স্থায়ী নাট্যমঞ্চ স্থাপনের পূর্বে ঠাটকীর্তন, পদ্মপুরান গান, ভাটের গান, লাচাড়ী গান, পটের গান, ঝুলন সঙ্গীত, যাত্রা-পালা এগুলোই লোকসমাজকে সরবরাহ করেছে সংস্কৃতির রসদ । পরবর্তী সময়ে শ্রীহট্ট শহরের শেখঘাট মহল্লার বংক বিহারী দাস মহাশয়ের ব্যাক্তিগত প্রচেষ্ঠায় যখন ১৯০১ খৃস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় “শ্রীহট্ট সঙ্গীত সমাজ” তখন সেই মঞ্চ  হয়ে ওঠে সিলেট তথা সুরমা উপত্যকার সর্বপ্রথম শৌখিন নাট্যমঞ্চ । জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সরোজিনী’ নাট্যাভিনয়ের মাধ্যমে শুভ উদবোধন অনুষ্ঠিত হয় এই রঙ্গমঞ্চের  । জনশ্রুতি যে, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নিজে সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন । তথ্যের সত্যতা অবশ্য নির্ধারন করা যায়নি, তবে শ্রীহট্ট শহরে এই নাট্যমঞ্চ স্থাপনের পর পঞ্চখণ্ডের বিয়ানীবাজার, বানিয়াচোঙ, জলসুকা, ঢাকাদক্ষিণ প্রভৃতি অঞ্চলেও বেশকিছু নাট্যমঞ্চ সেসময় স্থাপিত হয় । বংক বিহারী মহাশয় নিজে যেমন একজন নাট্যপ্রেমী মানুষ ছিলেন, তেমনি ছিলেন তাঁর সময়ের একজন শ্রেষ্ঠ পাখোয়াজ ও খোলবাদক । এনায়েত খাঁ, আলাউদ্দিন খাঁ প্রমুখ শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর সঙ্গত চর্চা তখনকার দিনে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ও মর্যাদার সংবাদ ছিল । সুরমাভ্যালীর সংস্কৃতি চর্চার ইতিহাসে আরো একটি নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে, তিনি হলেন নাট্যকার কুমার গোপীকা রমন । রাজা গিরীশ চন্দ্র রায়ের মতো তাঁর বাড়ির নাট্যমঞ্চেও নিয়মিত ধারায় হতো নাট্যচর্চা । গোপীকা রমন সর্বপ্রথম ব্যাক্তি যিনি কলকাতার বাইরে একটি মফস্বল শহরে ঘূর্ণিয়মান রঙ্গমঞ্চ প্রতিষ্ঠা করে তাক লাগিয়ে দেন দর্শকদের । তাঁর সুসংগঠিত নাট্যদল বহুবার কলকাতার স্টার থিয়েটারে নাট্যাভিনয়ে অংশ গ্রহন করেছে । কুমার গোপীকা রমন এবং তাঁর স্ত্রী দুজনেই ছিলেন স্টার থিয়েটারের নিয়মিত শিল্পী । ভাবলে অবাক লাগে, আজ থেকে একশ কুড়ি বছর আগে এক অভিজাত পরিবারের একজন মহিলার পেশাদারী রঙ্গমঞ্চে আত্মপ্রকাশ সমাজে কতোটা বৈপ্লবিক ছিল আমরা অনুমান করতে পারি নিশ্চয়ই, কিন্তু ইতিহাস তাকে মনে রেখেছে কতটুকু !  ইতিহাস কতোটা মনে রেখেছে আমি জানি না, তবে সুরমা-বরাকের নাট্যচর্চার প্রাক পর্বে তিনি পথিকৃৎ ছিলেন অবশ্যই ।   

                  ১৯১০ সালে শিলচরে স্থাপিত হলো স্থায়ী রঙ্গমঞ্চ –আর ডি আই হল । করিমগঞ্জ ও  লাতুবাসীদের উদ্যোগে করিমগঞ্জেও একটি অস্থায়ী রঙ্গমঞ্চ স্থাপিত হয়েছিল, যার অস্তিত্ব ছিল ১৯২০ থেকে ১৯২৬ পর্যন্ত । শোনা যায়, গোপীকা রমন সস্ত্রীক এই নাট্যমঞ্চে অভিনয় করতে এসেছিলেন । তাছাড়া লাতুর জমিদারদের যাত্রাদল, রজনীমালীর যাত্রাদল এবং আরো বহু দলের আনাগোনাও এখানে ছিল । এই নাট্যমঞ্চে অভিনীত দুটি নাটকের নাম পাওয়া যায়, “বেহুলা-লক্ষ্মীন্দর” আর “মুক্তিযজ্ঞ” । নাট্যমঞ্চটি করিমগঞ্জ শহরের ঠিক কোন স্থানে অবস্থিত ছিল, সে  সম্পর্কে যদিও দ্বিমত রয়েছে, কেউ কেউ বলে থাকেন বর্তমানে নীলমণি রোড সংলগ্ন শ্রীমতি মিলন শশী মজুমদারের বাড়ির পাশে মঞ্চটি অবস্থিত ছিল, আবার অনেকে বলেন নটীখালের পারে ডাকবাংলোর পাশেই ছিল সেই মঞ্চের অবস্থান । কিন্তু স্থান যেখানেই হোক না কেন, সেখানে গান হতো, নাচ হতো, নাটকও হতো । একদিন এক ভয়ঙ্কর অগ্নি দুর্যোগের রাতে গোটা মঞ্চটাই ধ্বসে পড়ে আগুনে ভষ্মীভূত হয়ে যায় । করিমগঞ্জ শহরে রণেন্দ্রমোহন দাস  এবং মনোরঞ্জন রায়, এই দুই জমিদার বাড়িতেও তাদের নিজস্ব নাটমন্দিরে দুর্গোৎসব কিংবা অন্যান্য উৎসব পার্বন উপলক্ষ্যে বিভিন্ন যাত্রাপালার আসর অনুষ্ঠিত হতো । তবে ১৯৪২ সালে রথীন্দ্রনাথ সেন এবং হিমাংশু দাশগুপ্তের যৌথ প্রচেষ্ঠায় করিমগঞ্জে ‘ইভনিং ক্লাব’ নামে একটি যাত্রাদল প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজ ব্যাবস্থায় এসে লাগে বিশাল পরিবর্তনের ঢেউ । শুধু সমাজ ব্যাবস্থায় নয়, মানুষের প্রচলিত মানসিকতায়ও দেখা দেয় ব্যাপক পরিবর্তন । তার কারণ,  ‘ইভিনিং ক্লাব’ করিমগঞ্জের প্রথম সেই সাংস্কৃতিক সংস্থা যার মাধ্যমে তৈরি হয়ে ওঠে সাধারণ  নাট্যপ্রেমী মানুষকে নাট্য পরিচালনা, মঞ্চসজ্জা, মঞ্চাভিনয়, নাট্য সংলাপ রচনা ইত্যাদি নানা বিষয়ে নাট্য প্রশিক্ষণ দেওয়ার এক গণমঞ্চ । ১৯৪১ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত এই সময়সীমায়  কয়েকজন বিশেষ নাট্যকুশীলবের নাম পাওয়া যায় যাদের উল্লেখ ছাড়া এই আলোচনা অসম্পূর্ণ,  তারা হলেন – রথীন্দ্রনাথ সেন, হিমাংশু দাসগুপ্ত, সিতাংশু দাশগুপ্ত, ভূপেন চৌধুরী, মুকুল ধর,  সুখময় দত্ত, আদি ঠাকুর, মুকুন্দদাস ভট্টাচার্য এবং আরো প্রমুখ । 

               ১৯৫০ সালে করিমগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত হয় রমনীমোহন ইনস্টিটিউট এবং ওই বছরেই করিমগঞ্জ কলেজেও প্রতিষ্ঠিত হয় একটি নাট্যমঞ্চ । করিমগঞ্জ শহরের কাছেই নয়াবাড়িতে শর্মা পরিবারে একটি নাটমন্দির ও নাট্যমঞ্চ ছিল যে মঞ্চকে কেন্দ্র করে সর্বপ্রথম প্রগতিশীল নাট্য ও সংস্কৃতি চর্চার সূত্রপাত ঘটে এ শহরে । এতদ অঞ্চলের গণনাট্য আন্দোলনের সূত্রপাতও ওই  নাট্যমঞ্চকে কেন্দ্র করেই । ১৯৫৩ সালে মুকুন্দদাস ভট্টাচার্যের পরিচালনায় নৃত্যালেখ্য ‘আর  দেব না রক্তে বুনা ধান’- দিয়ে প্রথম শুরু হয় করিমগঞ্জের মাটিতে ভারতীয় গণনাট্য আন্দোলনের শুভযাত্রা । ১৯৫৪ সালে রাসবিহারী দাসের পরিচালনায় প্রথম সহ-অভিনয় প্রথায়  মঞ্চস্থ হয় অপেশাদারী নাটক ‘টীপু সুলতান’ । পঞ্চাশের দশকের পর থেকে করিমগঞ্জ শহরের নাট্যচর্চার ইতিহাসে এরকম আরো বহু অসাধারণ নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে বিভিন্ন মঞ্চে, সমাজ  বিবর্তনের ধারায় যেগুলোর মূল্য আজ অপরিসীম । কিন্তু আমরা সেই আলোচনা আপাতত অন্য বৃত্তান্তের জন্য তুলে রাখলাম পরিসরের স্বল্পতার কথা ভেবে । ইতিহাসের ধারায় সময় বদলায়,  দেশ বদলায়, রাষ্ট্র বদলায় –  বদলায় না শুধু মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয় । ইতিহাস বলতে যদি আমরা শুধু মানুষের ইতিহাসকেই বুঝি, রাজনৈতিক পালা বদল যদি সেখানে নিতান্তই একটা তথ্যমাত্র হয়, তাহলে জীবনধারনের নানা দুরূহ প্রচেষ্ঠা ও অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়েও যখন দেখি অবহেলায় বঞ্চিত এ অঞ্চলের মানুষ নিয়ত সৃষ্টি করে গেছেন নিজেদের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়, তখন বুঝতে পারি এর মধ্য দিয়েই আসলে গড়ে উঠতে চলেছে এক অনাগত ভবিষ্যতের বৃহৎ দূর্গ তোরণ । যে দূর্গ বিভেদকামী শক্তির প্রতিস্পর্ধী বলিষ্ঠ গণপ্রতিরোধও বটে । 

               অতএব, আমরা সেই প্রবেশদ্বারের সম্মুখে এসে আলোচনায় ইতি টানবো যেখান থেকে শুরু হয়ে যায় ইতিহাসের এক অজানা যাত্রাপথের নতুন নতুন উৎসমুখ । এ যেন মশালের আলোয় হাত বদল হতে হতে পৌঁছে যাওয়া নতুন উৎসমুখে । উত্তরপ্রজন্মের একজন সংস্কৃতিযোদ্ধা হয়ে রাজনৈতিক মানচিত্রের ভ্রূকুটিকে অস্বীকার করে যদি পেরোতে না পারি সমস্ত সাংস্কৃতিক বিরোধ, তাহলে হয়তো চিরকাল অধরাই থেকে যাবে সেই বিশল্যকরণী ।  কোনো তথ্য দিয়ে নয়, কোনো তত্ত্ব দিয়েও নয়, সবরকম ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক অবিচ্ছিন্নতা আর সংবেদনশীলতা দিয়ে দুটো ভিন্ন রাষ্ট্রের দুটো ভিন্ন খণ্ডকে একই অখণ্ড ইতিহাসের পরিসরে যদি বিচার করতে পারি, তাহলে হয়তো জ্বলে উঠবে একদিন অনালোকিত ইতিহাসের নতুন আলোকবর্তিকা । কিন্তু ততদিন অস্তিত্বের শেকড়ের অনুসন্ধানে আমাদের ছুটে বেড়াতে হবে আরো বহুদুর ।



Bartalipi Digital Desk

Bartalipi Digital Desk

Bartalipi Digital Desk

Total 29 Posts. View Posts


About us

প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার যুগে খবরের সত্যতাটির পক্ষপাতদামুক্ত উদ্যোগ / দীক্ষা প্রয়োজন। ক্লান্তিকর সংবাদগুলি আর সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে না। অভ্যন্তরীণ খবরে বৈশ্বিক কোণ থেকে বর্ণিত করার লক্ষ্যে, "বার্তালাপি ডিজিটাল" ডিজিটাল সাংবাদিকতার মাঠে প্রবেশ করেছে। শিরোনামের মিশ্রণটি তার লক্ষ্য এবং লক্ষ্যটির স্ব-ব্যাখ্যামূলক। বৈশিষ্ট্যগুলি, নিউজফ্ল্যাশগুলি এর মাধ্যমে একটি প্ল্যাটফর্মে সমস্ত সিঙ্ক করা হয়, এটি বারাকের নেটিজেনদের একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আভা দেয়। বার্তালাপি ডিজিটাল তাই ডিজিটাল ভারসাম্য পূরণের প্রতিশ্রুতি দেয় যা এটি ডিজিটাল বিবর্তনের যুগে একটি সংবাদ সংস্থা হিসাবে চিহ্নিত করবে




Follow Us